মেলবোর্নে যেভাবে উদ্ধার হলো নিখোঁজ অটিস্টিক কিশোর উইলিয়াম । মিতা চৌধুরী

  •  
  •  
  •  
  •  

 156 views

উইলিয়াম ক্যালাঘনের বয়স ১৪ বছর। মেলবোর্ন থেকে উত্তর দিকে গহীন জঙ্গল ডিসএপোয়েন্টমেন্ট মাউন্টেনে সে নিখোঁজ হয়ে যায়। শীতের রাত। সঙ্গে ছিলোনা গরম কোন কাপড়চোপড়। অন্য কিছু না হোক কেবল শীতের প্রকোপেই ছেলেটির বেঁচে থাকা নিয়ে আশঙ্কা ছিলো। তার ওপর ছেলেটি অটিস্টিক, কথা বলতে পারে না। তিনদিনের প্রচেষ্টায় অবশেষে তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

উইলিয়াম ক্যালাঘন গত ৮ জুন মাউন্ট ডিসএপোয়েন্টমেন্ট থেকে নিখোঁজ হয়। এরপর ভিক্টোরিয়ান পুলিশ নিখোঁজ উইলিয়ামকে উদ্ধার করতে এয়ার এবং গ্রাউন্ড সার্চ শুরু করে যা কিনা ভিক্টোরিয়ান পুলিশ বিভাগের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ও বৃহদাকার একটি উদ্ধারকার্য। যেহেতু উইলিয়াম অটিস্টিক ও কথা বলেনা তাই শুরুতেই তার পরিবার ও পুলিশ বিভাগ তার নিরাপত্তা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় পড়েছিলো। তাছাড়া এই চরম ঠান্ডা ও বৈরী আবহাওয়ায় সবাই শঙ্কিত ছিলেন। ভিক্টোরিয়ান পুলিশ উইলিয়ামের উদ্ধার কাজ সফল করার জন্য এব দ্রুততম সময়ে বিশেষ অভিযানের পরিকল্পনা করেন এবং সেই মতো এগুতে থাকেন।

অটিস্টিক কিশোর উইলিয়ামকে উদ্ধারের পরে তাকে খাবার ও পানীয় দেয়া হয়।

উল্লেখ্য, উইলিয়াম তার বাবার সঙ্গে পাহাড়ে হাইকিংএ যেয়ে হারিয়ে যায়। তাদের ওই পাহাড়ে রাত্রি যাপনের কোনো পরিকল্পনা ছিলোনা। তাই উইলিয়ামের সঙ্গে কোনো ভারী উষ্ণ পোষাক বা খাবারও ছিলোনা। যেহেতু উইলিয়াম খুবই লাজুক এবং কথা বলেনা তাই পুলিশ তাদের উদ্ধার অভিযানে নতুন কৌশল নেয়। পুলিশ উইলিয়ামকে খুঁজতে জঙ্গলে চিৎকারের পরিবর্তে গান গাইতে থাকে এবং এলাকাবাসীকে অনুরোধ করেন তারা যেন বাসায় তীব্র গন্ধযুক্ত খাবার যেমন বারবিকিউ বেকন তৈরী করেন এবং বাসার বাইরে খাবার ও পানীয় রেখেদেয়ার অনুরোধ করেন যেন উইলিয়াম ক্ষুধার্থ হলে ওই খাবারের গন্ধ পায়। পুলিশ এলাকাবাসীকে আরো অনুরোধ করেন যেন তারা বাসায় ট্যাংক  ইঞ্জিন থমাসের গান বাজায় কারণ উইলিয়াম এই গান পছন্দ করে।

এক্টিং ইন্সপেক্টর ক্রিস্টিয়ান লালোর এই অভিযানের মূল দায়িত্বে এবং এই অভিযানের মুখপাত্র ছিলেন। তিনি জানান, “সময় যত যেতে থাকে আমাদের উদ্বেগ ও আশংকা ততই বাড়তে থাকে যেহেতু প্রথম দুইদিন আমাদের এই নতুন কৌশলও কাজে আসছিলো না”। তিনি এটাও বলেন, “তারপরও আমরা আশাবাদী ছিলাম উইলিয়ামকে উদ্ধারের বিষয়ে এবং বুধবারে এসে আমার মনে হচ্ছিলো আজকেই আমরা উইলিয়ামকে খুঁজে পাবো।”

গহীন মাউন্টেন ডিসএপোয়েন্টমেন্টে উইলিয়ামকে উদ্ধারের অভিযান।

ইন্সপেক্টর ক্রিস্টিয়ান লালোর বলেন উইলিয়ামের বিষয়ে (তার অটিজম) জানার পর আমাদের জন্য তাকে খুঁজে বের করাটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা আমাদের কৌশলগুলো ঠিক করার আগে উইলিয়ামের পরিবারের সঙ্গে তার বিষয়ে ডিটেল আলোচনা করেছি এবং আমরা উইলিয়ামের শিক্ষকের সঙ্গেও আলোচনা করেছি উইলিয়ামের বিষয়ে আরো জানতে। যা আমাদের সাহায্য করেছে আমাদের উদ্ধার কৌশল নির্ধারণে।

যেদিন পাওয়া গেলো উইলিয়াম :
উইলিয়ামকে খুঁজে পাওয়ার প্রথম আশার সঞ্চার হয় যখন উইলিয়ামের জুতা পাওয়া যায়। এরপর পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল তাদের খোঁজার আয়তন ও সীমানা ছোট করে আনেন। এরপরেই উদ্ধারকারী ভলেন্টিয়ার বেন গীবস উইলিয়ামকে খুঁজে পান। গীবস জানান, তিনি একটি ঘন ঝোপের পাশ দিয়ে গান গাইতে গাইতে উইলিয়ামকে খুঁজছিলেন এবং ওই ঝোপের ঠিক ১৫ মিটার দূরেই উইলিয়ামকে খালি পায়ে তিনি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। তখন মিঃ গীবস উইলিয়ামকে একজোড়া মুজা ও জ্যাকেট দেন।

উদ্ধার অভিযান যে জায়গা থেকে শুরু হয়েছিল উইলিয়ামকে তার ঠিক ১.৫ কি:মি দূরেই দুইরাত পর উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারে সাহায্যকারী পুলিশ ও ভলেন্টিয়াররা মনে করেন, উইলিয়ামকে উদ্ধার কাজ পরিচালনা তাদের কর্ম জীবনের সবচেয়ে উল্ল্যেখযোগ্য অধ্যায়। উইলিয়ামের নিখোঁজের পুরো তিনদিন অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়া এবং ভিক্টোরিয়া সরকারের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো কিভাবে তাকে উদ্ধার করা সম্ভবপর হয়। ছেলেটি অটিস্টিক হওয়ায় সেই গুরুত্বও বেড়ে যায়। ছেলেটিকে পাওয়ার পরে তার মা বলেন, চোখে চোখে রাখার পরেও এক নিমিষে হারিয়ে যায়। হয়তো আবার হারাবে। এরপর বাইরে কোথাও গেলে আর হাতছাড়া করবোনা।

সোর্স : এবিসি নিউস , ভিক্টোরিয়ান পুলিশ ডিপার্টমেন্ট।  

মিতা চৌধুরী
ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট, লেখক ও সংগঠক।
মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments