মোহাম্মদ নাসিম: করোনা কালে করুণ বিদায় । অজয় দাশগুপ্ত

  •  
  •  
  •  
  •  

করোনা সময়ে চলে যাওয়া প্রত্যেকটি মানুষকে আমি হিরো বলে সম্বোধন করতে চাই। বলা দরকার পজিটিইভ হোক আর নেগেটিভ হোক করোনার আঘাত কেউ এড়াতে পারছেন না। আন্ডার লাইনিং নামে নতুন যে শব্দবন্দ তার মানে কি? খুব সহজ, যে আপনার যদি আর কোন সমস্যা থাকে করোনা আপনাকে কাবু করবেই। এটাই সারকথা। গতকাল আমাদের দেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ নেতা প্রাক্তন মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে। আওয়ামী লীগের এই নেতা আমাকে মনে করিয়ে দিতেন সৈয়দ অশরাফের কথা। ভবিষ্যতেও দেবেন । এরা দু জনই পিতা হারানো তরুণ। আমরা এখন দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের দাপট যতটা দেখি ততটা কি তখন ছিলো? মূলত পঁচাত্তর পরবর্তী যে আওয়ামী লীগ বা সরকার বিরোধী যে আওয়ামী লীগ তার তুলনা মেলা ভার। আমি মনে করি সে আওয়ামী লীগই শক্তিশালী।

মূল কথায় আসি, মোহাম্মাদ নাসিম বা তাঁদের মত পিতা বা পরিবারের স্বজন হারানোদের আমরা এখন দেখি পাওয়ার গ্লাস চোখে লাগিয়ে। পাওয়ার গ্লাস মানে তারা যেন সারাজীবন গাড়ীতে পতাকা উড়িয়ে দাপট দেখিয়ে ঘুরে বেড়াতে অভ্যস্ত ছিলেন। আমরা ইতিহাসের নীরব দর্শক। আওয়ামী লীগের দুর্দিন আমরা দেখেছি। যতটা সম্ভব শরীকও হয়েছি। এতোবড় রাজনৈতিক দলে সুযোগভোগী মাস্তান সন্ত্রাসী সহ সবাই ভীড় করবে এটাই স্বাভাবিক। আম সাপোর্টার বা সাধারণ ভক্তদের কথা দূরে থাক ত্যাগীদেরও জায়গা নাই আজ। সেখানে ভীড় করে আছে নব্য মোশতাক আর সুযোগ সন্ধানীরা। অথচ এই দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তির জন্য এঁদের পরিবারের ত্যাগ আস্তে আস্তে যেন ফিকে হয়ে আসছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি যৌবনের শুরুতে পিতা হারিয়ে এরা নিজদেশে কতটা নিগৃহীত হয়েছিলেন। বাংলাদেশকে পাকিস্তানে পরিণত করার চেষ্টা যখন ব্যর্থ তখন ষড়যন্ত্রকারীরা নতুন পথ বেছে নিয়েছিল। ছায়া পাকিস্তান বানানোর খেলায় তারা মুছে দিতে চেয়েছিল আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতার নাম নিশানা। যেন এঁরাই ছিলেন স্বাধীনতা আনায়নের দায়ে অপরাধী। সে সময় আওয়ামী লীগ করা ছিলো বিপজ্জনক। এই বিপদের আভাস পেয়ে বাধ্য হয়ে বা স্বেচ্ছায় দলত্যাগ করেছিল প্রচুর বড় ছোট মাঝারি নেতা। এমন কি বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে বা তেমন কোন আত্মীয় নামে পরিচিত শেখ শহীদও চলে গেলেন এরশাদের বগল তলে। কিন্তু চার নেতার কোন সন্তান তাদের পিতার রক্তের ওপর পা দিয়ে বেঈমানী করেননি। দল অনেক সময় তাঁদের ওপর সুবিচার না করলেও এই চার পরিবারের নামকরা কোন পুত্র বা নেতা আওয়ামী লীগ ছেড়ে যান নি। এই যে দলও রক্তধারার প্রতি আনুগত্য অন্তত সে কারণে আমি নাসিম কে জানাই অভিবাদন।

মোহাম্মাদ নাসিম

মোহাম্মাদ নাসিম সেই নেতা যিনি সংসদে দাঁড়িয়ে কিছুদিন আগেই বলেছিলেন, এখন দেশে সবাই আওয়ামী লীগ। যেদিকে তাকাই সেদিকে শুধু আওয়ামী লীগ। সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, আমরা আওয়ামী লীগার কি না সেটাই হয়তো প্রশ্ন হবে এখন। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে স্পীকারকে সম্বোধন করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন ওয়ান ইলেভেনের কোন কুশীলব এখন সাংসদ। মনে করিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর মতো অনেকেই আওয়ামী লীগ করার কারণে এদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছিলেন। নেতার সমানে এমন কথা বলতে যে ব্যক্তিত্ব আর ইমেজ লাগে সেটা তাঁর ছিলো। মনে আছে কান ধরা সেই টিচার সংখ্যালঘু টিচার শ্যামল কান্তির কথা। তখন মোহাম্মদ নাসিমই গিয়েছিলেন সেলিম ওসমানকে শাসাতে। ভিডিও দেখলেই বুঝবেন নারায়ণগঞ্জের গড ফাদার কেমন চুপসে ছিলেন তাঁর সামনে।

লেখার শুরুতেই বলেছিলাম তাঁর মৃত্যুর পেছনেও আছে করোনা। আমীর হোসেন আমুর কথাতেই তা স্পষ্ট। তিনি তাঁর মন্তব্যে বলেছেন,
“করোনাভাইরাসের সঙ্কটেও সে নিজের হাতে ত্রাণ দেওয়া এবং সমস্ত কাজে যুক্ত ছিলেন বলেই অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। নাসিমের মৃত্যু মেনে নেওয়া আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর।”

গত শতকের ষাটের দশকে ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করেন তিনি। ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী নাসিম স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন।বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর কারাগারে মনসুর আলীকেও হত্যা করা হলে আওয়ামী লীগে সক্রিয় হন নাসিম। তখন কারাগারেও যেতে হয়েছিল তাকে। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পরও বন্দি করা হয়েছিল তাকে।১/১১ এর সময় তাকে গ্রেপ্তার করলে জেলের মধ্যে তার স্ট্রোক হয়। শারীরিক এই অবস্থা নিয়ে সারা বাংলাদেশ সফর করে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেন। বর্ণিল রাজনৈতিক জীবনে ১৯৮৬ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নাসিম। তখন সংসদে বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপের দায়িত্বও পান তিনি। তখন তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক।শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করার পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান নাসিম। পরের বছর মার্চে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও তাকে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নাসিম এক সঙ্গে দুই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ১৯৯৯ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত। পরে তাকে করা হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি।২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর রাজপথে আন্দোলনে থাকা সদ্য সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাসিমের উপর পুলিশের নিপীড়ন দেশে আলোচিত ঘটনা হয়ে আছে। তখন পুলিশের লাঠিপেটায় নাসিমের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য মতিয়া চৌধুরীও রাজপথে লুটিয়ে পড়েছিলেন। তাদের সেই রুখে দাঁড়ানোর দৃশ্য পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের শক্তি যুগিয়েছে বলে মনে করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

সব মানুষের জীবনে নেগেটিভ কিছু দিক থাকে। তাঁরও ছিলো। তাঁর সময় মানুষের চাহিদামতো স্বাস্হ্য খাতের উন্নতি হয়নি। আজ যা অসংগতি বা অব্যবস্হা হয়তো তার কিছুটা তখন তৈরী। কিন্তু এটাও মনে রাখা দরকার একজন মানুষ বা নেতা চাইলেও অনেক কিছু পরিবর্তন করতে পারেন না। আমাদের দেশের মতো আরজনৈতিক বাস্তবতায় তা অলীক। এ এক মৌচাকের মতো মাকড়সার জালের মতো ব্যবস্হা। যে ঢুকেছে সেই বেরিয়েছে গায়ে কালো দাগ নিয়ে। এর থেকে কোন নিস্তার নাই। মোহাম্মদ নাসিম যত বলিষ্ঠ বা বড় নেতা ছিলেন না কেন তাঁর দ্বারা ও অনেক কাজ করে যাওয়া সম্ভব হয় নি।
সে জন্য কি পাগলের মতো কুৎসিত উগ্র কথা বলতে হবে? মোহাম্মদ নাসিমের আত্মার শান্তি কামনার সাথে সাথে একথা বলবো আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা এখনো নানা বিষয়ে ঠিক মানুষ হতে পারি নি। পরপারে চলে যাওয়া মানুষটি যেন তারই প্রমাণ।

অজয় দাশগুপ্ত
লেখক ও কলামিস্ট
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments