রবীন্দ্রনাথের ধর্ম । মো: আমির হোসেন

  •  
  •  
  •  
  •  

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষগণ বাংলাদেশের যশোর জেলার বারোপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। তাঁদের বংশগত উপাধি ছিল কুশারী। কুশারী বংশের একজন ছিলেন জয়রাম কুশারী। ব্যবসা-বাণিজ্য করে অঢেল টাকার মালিক হবার পর জয়রাম কুশারী দিল্লীর সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে, ভারতের গোবিন্দপুরে জমি কিনে নেন। সেখানে নীলমণি ও দর্পনারায়ণ নামে জয়রামের দুটো ছেলের জন্ম হয়। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি গোবিন্দপুর কিনে নিলে জয়রাম কুশারী কলিকাতার পাথুরিঘাটায় বসতি স্থাপন করেন। নীলমণি বড় হয়ে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির উড়িষ্যা এলাকার কালেক্টরের সেরেস্তাদারের চাকরি করে, প্রচুর অর্থের মালিক হন। উড়িষ্যা এলাকার মানুষেরা সম্মানিত ব্যক্তিগণকে ‘ঠাকুর’ সম্বোধন করত। সেই ধারাবাহিকতায় নীলমণিকে ‘ঠাকুর মহাশয়’, ‘ঠাকুর দাদা’, ‘ঠাকুর স্যার’ বলতে বলতে একদিন নীলমণি সাধারণ মানুষের কাছে সত্যি সত্যি ‘ঠাকুর’ হয়ে যান। রবীন্দ্রনাথের বংশ পরিবর্তিত হয় ঠাকুর বংশে। ঠাকুর বংশের প্রতিষ্ঠাতা নীলমণি ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে চাকরি শেষ করে ফিরে আসলে ভাই দর্পনারায়ণের সাথে সম্পদের হিসেব নিয়ে গোল বাধে। অবশেষে নীলমণি একলক্ষ টাকার বিনিময়ে পাথুরিঘাটার দাবি পরিত্যাগ করেন। নীলমণি ঠাকুর কলিকাতার জোড়া বাগান খালের ধারে বৈষ্ণব চরণ শেঠের কাছ থেকে এক বিঘা জমি কিনে নেন। সেখানে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে আটচালা ঘর বানিয়ে বসবাস শুরু করেন। লোকালয়ের সাথে যোগাযোগের জন্য খালের উপর বাঁশের সাঁকো তৈরি করেন। নীলমণির প্রতিবেশী হুগলি নিবাসী গিরীশচন্দ্র মজুমদারের পুত্র প্রতাপচন্দ্র মজুমদারও খালের উপর বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করলে, নাম হয় জোড়াসাঁকো মহল্লা। উভয় পরিবারই রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। নীলমণি ঠাকুরের তিন পুত্রের মধ্যে কনিষ্ঠ পুত্র রমানাথ ঠাকুর ইংরেজদের কাছ থেকে প্রথমে ‘রাজা’ এবং পরে ‘মহারাজ’ উপাধি লাভ করেছিলেন। নীলমণির জ্যেষ্ঠপুত্র রামলোচন ঠাকুর নিঃসন্তান বলে মধ্যম ভ্রাতা রামমণির পুত্র দ্বারকানাথ ঠাকুরকে দত্তক নিয়েছিলেন। ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় শিক্ষিত দ্বারকানাথ ঠাকুর নীল, রেশ এবং জাহাজের ব্যবসা করে কয়েকটি জমিদারি ক্রয় করেন। ইউরোপিয়ান চালচলনে অভ্যস্ত দ্বারকানাথকে ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই জুন ব্রিটিশ সম্র্রাজ্ঞী ‘মহারানী ভিক্টোরিয়া’ প্রিন্স খেতাবে ভূষিত করেন। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাব্বিশ বছর  বয়সে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন। তাঁর হাতে বাহ্মধর্মের যথেষ্ট বিকাশ ঘটেছিল। ব্রাহ্মধর্মের প্রাণপুরুষ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কনিষ্ঠপুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ৭ই মে মোতাবেক ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ শে বৈশাখ মঙ্গলবার জন্মগ্রহণ করেন।
জ্ঞান, মেধা, চিন্তা, কর্ম ও সাহিত্য সৃষ্টির মানদন্ডে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটপরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ব্রাহ্মধর্মের মানুষ ছিলেন। বাঙালিরা বিশেষ করে মুসলমানরা রবীন্দ্রনাথকে মূর্তিপূজারি হিন্দু বলে ভুল করে। রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর পরিবারের  পুরুষ সদস্যরা মূর্তিপূজা  করতেন না। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। তাঁর পোশাক এবং দাড়িতেও  সূফিবাদ দেখা যায়। তিনি জীবনের প্রথম দিকে বিশেষ উদ্যমে ব্রাহ্মধর্মের আদর্শ প্রচার করেছিলেন। এক সময় তিনি আদি ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদকের পদও গ্রহণ করেছিলেন। ধর্মের কাজে সময় ব্যয় করতে গিয়ে তিনি অনুভব করেছিলেন ধর্ম নয়, ধর্মের অনুষ্ঠানগত আনুগত্য দেখানোই সবার উদ্দেশ্য। সার্বজনীন মানব কল্যাণের জন্য কোন ধর্মীয় বিধি-বিধান করা হয় না। তাই ব্রাহ্মসমাজের শাস্ত্রীয় অনুশাসনের প্রথাসিদ্ধ পথ পরিত্যাগ করে তিনি মুক্ত জ্ঞানের মর্মানুসন্ধান শুরু করেন। তাঁর কাছে মানবতাই বড় মনে হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাসে কোন মন্দির ছিল না, কোন মসজিদ-গির্জা-প্যাগোডা ছিল না, কোন স্বর্গধাম ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম মোহ নয়; মোহ হতে মুক্তি। অথচ ধর্ম-ব্যবসায়ীরা মানুষকে ধর্মে মোহাবিষ্ট করে রাখে। চিন্তা চেতনায় মানুষকে বড় হতে দেয় না। সাধারণ মানুষ ভুল পথে চালিত হয়ে মানব সভ্যতাকে নষ্ট করে। মানুষের এই বিপথ গমনে কষ্ট পেয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
“ ধর্মের  বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।” (পরিশেষ/ ধর্মমোহ)

ধর্মের মোহ বিশেষ করে পরকালে সুখে থাকার লালসা মানুষকে স্বার্থকেন্দ্রিক করে ফেলে। পরকালে বিশেষ কিছু পাবার আশায়, মানুষ অন্ধ হয়ে হানাহানিতে লিপ্ত হয়। বিশ্বের প্রথাগত প্রচলিত ধর্মগুলোতে মানবতার বাণী থাকলেও ধর্মের মোহের কারণেই মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি হয়নি। বিশ্বায়নের যুগেও তাই পৃথিবীতে এত হানাহানি, এত মারামারি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর যুগেই অনুভব করেছিলেন বিশ্ব থেকে হানাহানি দূর করতে হলে সত্যিকার স্রষ্টাকে চিনে নিতে হবে। তিনি ‘মানুষের ধর্ম প্রবন্ধে উপলব্ধি করেছিলেন-
“মানুষের দেবতা মানুষের মনের মানুষ, জ্ঞানে কর্মে ভাবে যে পরিমাণে সত্য হই সেই পরিমাণেই সেই মনের মানুষ পাই। অন্তরে বিকার ঘটলে সেই আমার আপন মনের মানুষকে মনের মধ্যে দেখতে পাইনে।”
অর্থাৎ আমাদের মনের মানুষ রয়েছে আমাদের অন্তরে, কিন্তু বাইরের আকর্ষণে মানুষ সে কথা ভুলে যায়। স্বার্থান্ধ মানুষ নিজের ভেতরের অমূল্য সম্পদের সন্ধান না করে পার্থিব সম্পদের পেছনে ছুটে মরে। এ সত্যকে উপলব্ধি করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
“ আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে
দেখতে আমি পাইনি
বাহির পানে চোখ মেলেছি
হৃদয় পানে চাইনি।
আমার সকল ভালোবাসায়
সকল আঘাত, সকল আশায়
তুমি ছিলে আমার কাছে
তোমার কাছে যাইনি।” (গীতিমাল্য)

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, দেবালয় দেবতার আবাস নয়, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতাকে পাওয়া যায় না। দেবতাকে পাওয়ার জন্য নিজের অন্তরের ভেতর মানবতার আলো জ্বালাতে হয়। তাঁর মতে-
“ অন্ধকারে লুকিয়ে আপন মনে
কাহারে তুই পূজিস সংগোপনে,
নয়ন মেলে দেখ দেখি তুই চেয়ে
দেবতা নেই ঘরে।’ (গীতাঞ্জলি)

দেবতা অর্থাৎ স্রষ্টার ধর্মালয়ে নেই। স্রষ্টা আছেন প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। স্রষ্টাকে পাওয়ার জন্য বা স্রষ্টার আরাধনার জন্য মন্দিরে যাওয়া অর্থহীন। দেবতাকে পাওয়ার জন্য-
“ কাজ কি আমার মন্দিরেতে আনাগোনায়
পাতব আসন আপন মনের একটি কোণায়।” (গীতিমাল্য)

মনের কোণায় রবীন্দ্রনাথ আসন পেতে স্রষ্টারূপ সৃষ্টি তথা মানুষকে বসিয়ে ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিটি মানুষ যদি প্রথমে নিজেকে চিনতে পারত এবং নিজের মনের মাঝে দেবতারূপ মানুষকে শ্রদ্ধার আসনে বসাতে পারত তবে পৃথিবীতে ধর্মের জন্য হানাহানি হতো না। জন্মসূত্রে প্রাপ্ত ধর্ম নিয়ে এত মাতামাতি করত না। একই স্রষ্টার সৃষ্টি হিসেবে একে অপরকে ঘৃণা করত না। প্রতিটি ধর্মের প্রবর্তকগণ মানবতার জয়গান গেয়েছেন কিন্তু সময়ান্তরে সেগুলো ধর্ম ব্যবসায়ীদের হাতে পড়ে হারিয়ে গেছে। সেখানে ঠাঁই পেয়েছে কতিপয় কুসংস্কার। হিন্দু ধর্মের কুসংস্কারের জ্বালায় জ্বলে-পুড়ে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র বলেছিলেন,
“ অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।” (বিলাসী)

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, “পথ-পাশের্^র ধর্ম অট্টালিকা আজ পড় পড় হইয়াছে, তাহাকে ভাঙিয়া ফেলিয়া দেওয়াই আমাদের ধর্ম।’’ (যৌবনের গান) আর তাঁদের অগ্রজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন,
“ আচারীরা সামাজিক কৃত্রিম বিধির দ্বারা যখন খ-তার সৃষ্টি করে তখন কল্যাণকে হারায়, তার পরিবর্তে যে কাল্পনিক পদার্থ দিয়ে আপনাকে ভোলায় তার নাম দিয়েছে পুণ্য। সে পুণ্য আর যাই হোক সি শিব নয়। সেই সমাজবিধি আত্নার ধর্মকে পীড়িত করে।… আত্নার লক্ষণ হচ্ছে শুভবুদ্ধি, যে শুভবুদ্ধিতে সকলকে এক করে।” (মানুষের ধর্ম)।

রবীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছেন, পৌরাণিক যুগের কৃষ্ণ রাখালদের সাথে মিশে অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের জন্য যে ধর্ম প্রচার করেছিলেন সে ধর্ম পোরোহিত শাসিত শাস্ত্রসিদ্ধ বিধানের  অমোঘতা মেনে নেয়নি। ঐতিহাসিক যুগে গৌতম বুদ্ধ এবং মহাবীরও মানবকল্যাণমুখী ধর্ম প্রচার করতে চেষ্টা করেছেন। যিশুখৃস্ট সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,

“মানবপুত্র আচার ও শাস্ত্রকে মানুষের চেয়ে বড় হইতে দেন নাই।’’ (খৃস্ট/যিশুচরিত)।

বিশ্বকবির ধারণায়ও সাধারণ মানুষ দেবতার মর্যাদা পেয়েছিল। তিনি সাজাতপুর, পতিসর ও শিলাইদহের কুঠি বাড়িতে এসে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে সেই সত্যকে বাস্তবরূপ দিয়েছিলেন। অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষকে বুকে ধারণ করে, প্রথাগত ধর্মীয় বিধানকে অস্বীকার করে মানবতাকে উর্ধ্বে তুলে ধরতে গিয়ে ‘পুনশ্চ’ কাব্যের ‘শুচি’
কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
“ আমার ঠাকুরকে একদিন যেখানে হারিয়েছিলুম,
আজ তাঁকে সেখানে পেয়েছি খুঁজে।”

অর্থাৎ  স্রষ্টাকে মন্দির, মসজিদ, গির্জা এবং প্যাগোডার ভেতর পাওয়া যায় না। তাঁকে পাওয়া যায় সকল সৃষ্টির মাঝে। রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি-
“সবায় নিয়ে সবার মাঝে লুকিয়ে আছ তুমি
সেই তো আমার তুমি।” (গীতালি)

অতএব, রবীন্দ্রনাথের ধর্ম ছিল মানবধর্ম। তাঁর কাছে মানুষ ছিল বড়। আর সে জন্য তিনি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের মাধ্যমে নোবেল পুরস্কার হিসেবে প্রাপ্ত এক লক্ষ আশি হাজার টাকা গরীব কৃষকদের মাঝে বিনা সুদে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তারপরও প্রথাগত ধর্মের  শৃঙ্খলে বিচার করলে বলতে হয়; তিনি কখনও হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ব্রাহ্মধর্মের মানুষ।

তথ্যসূত্র :
১.বরেণ্য বাঙ্গালী- তোফায়েল।
২.গীতিমাল্য- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৩.যৌবনের গান –কাজী – নজরুল ইসলাম।
৪.শরৎরচনাবলী।
৫.রবীন্দ্রজীবনী।

প্রফেসর মো. আমির হোসেন
 : অধ্যক্ষ, ঘিওর সরকারি কলেজ, মানিকগঞ্জ
। কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও গীতিকার।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments