রহিমুদ্দীন.কম এবং আমার ডিজিটাল ভাবনা – মাসুদুর রহমান সায়েম

  •  
  •  
  •  
  •  

শুক্রবার রাত, ঘড়ির কাটা ১০টা ছুঁয়েছে মাত্র। সোফায় গা এলিয়ে netflix এ El Chapo দেখছি, হটাৎ মোবাইল ফোনের রিং বেজে উঠলো। অপরপ্রান্তে বন্ধুর উচ্ছাসিত গলা – “দোস্ত আমার দোকানের একটা ওয়েবসাইট বানাইসি। তুইতো IT তে, একটু দেখবি কেমন হইসে?” আমি নিঃশব্দে হাসলাম। গত ১৫ বছর ধরে আমি এই বিড়ম্বনাটা আনন্দের সাথে গ্রহণ করি। আমাদের সমাজে IT চাকরি করা আর General practitioner Doctor হওয়া একি কথা। IT profession ও যে অনেক ভাগ আছে সেটা কেও একসেপ্ট করতে চায়না, আপনি IT profession এ আছেন মানেই IT এর সব আপনি জানেন অথবা আপনি নকল করে পাস করেছেন।

যাইহোক আসল কথায় আসি। বন্ধু বলে কথা, সেই রাতেই তার ওয়েবসাইট নিয়ে বসলাম। গুগল ক্রোম এ ওয়েব এড্রেস এন্টার করে বসে আছি সেই দুই মিনিট ধরে, আর বন্ধুর সাইট এখনো লোড হচ্ছে। জিগেস করলাম এতো স্লো কেন, সে বলে “কই ঠিকই তো আসে, আর একটু ওয়েট কর – মাসে মাত্র ১০ ডলার দিতে হবে, সেই সাথে ১০ টা ইমেইল এড্রেস ফ্র্রি”। বন্ধু আমার ১০ ডলারে এতো কিসু পেয়ে মহা খুশি। আমি আবার তাকে জিগেশ করলাম – “আচ্ছা ধর তুই amazon.com থেকে কিছু কেনার জন্য গেলি আর দেখলি সাইট লোড হতে দুই মিনিট লাগছে, তুই কি করবি?” বন্ধু আমার কথা শুনেই বিরক্ত, বলে – “খালি কি জিনিস amazon এ পাওয়া যায়? আমি ebay তে ট্রাই করবো”। কথাটা বলার পর নিজেই টের পেলো কেন আমি এই প্রশ্ন করলাম। আমার এ যাবৎ কালে যত অভীজ্ঞতা হয়েছে, আমরা বাঙালিরা নিজের কোম্পানির ওয়েবসাইট বানাই যাতে, বিসনেস কার্ড এ নামের নিচে ওয়েব এড্রেসটা দিতে পারি, এইটা দেখতে ভালো দেখায়। কিন্তু কখনো এভাবে চিন্তা করিনা যে এটা আসলে আমার বিসনেস এরই অংশ। একটা কফি শপ এ ১৫ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে কোনো রেসপন্স না পেলে কাস্টমার এর যে ইম্প্রেশন হয় ওই কফি শপ নিয়ে , ঠিক সেই রকম ইম্প্রেশন হয় একটা কোম্পানি নিয়ে যখন একটা ওয়েবসাইট লোড হতে দুই মিনিট লাগে। আপনি হয়তো ভাবছেন, এই ওয়েবসাইট দিয়ে আমার কোনো ব্যবসা হবে না, জাস্ট একটা থাকতে হয় তাই নেয়া। এ যেন কাপড় না পরে এই যুগে চলা সম্ভব না, তাই কোনো রকমের একটা কাপড় পেচিয়ে অফিস এ আসা। এই কথা শুনে হয়তো সবাই নড়ে চড়ে বসবেন – তা কি আর হয় নাকি !! এইটা সভ্য যুগ , যুগের সাথেই তাল মেলাতে হয়। তো তাই যদি মনে করেন তাহলে আপনার কাস্টমার এর অনলাইন এক্সপেরিয়েন্স এর খেয়াল রাখাও এই যুগের ডাক। “আমি তো আর IT এর লোক না” – এই দোহাই দিয়ে কিছু করার চাইতে না করাই ভালো। কাস্টমার সেন্টিমেন্ট এর বড় চ্যালেঞ্জ হলো নেগেটিভ ইমপ্রেশন, একবার এই ইমপ্রেশন হলে পুনরায় বিশস্ততা অর্জন করা অনেক কঠিন।

যাইহোক, অবশেষে ওয়েবপেজ লোড হলো। দেখলাম হোম পেজ এ বিশাল এক রচনা লিখা, সাথে আবার বন্ধুর তেল চকচকে ফটো। সেই রচনায় নানান ভাবে লেখা কখন এই ব্যবসার শুরু, কি টাইপ এর সার্ভিস এই কোম্পানি দেয় ইত্যাদি। উদ্দ্যেশ্যটা খারাপ না, কিন্তু আপনি যদি কিছু সফল কোম্পানীর ওয়েবসাইট দেখেন তাহলে লক্ষ্য করবেন প্রথম পেজ এ (যাকে Home Page বলে) ওরা এমন কিছু ইনফরমেশন দেয় যা থেকে অতি সহজে একজন ভিসিটর আইডিয়া পায় সাইটটা সম্পর্কে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে আদতেই সে যা খুজছে এখানে পাবে কিনা। একটা ছোট্ট উদহারণ দিই – আমি সব সময় একটা নির্দিষ্ট বাঙালি দোকান থেকে বাজার করি, একদিন দোকানে ঢুকলাম – হাতে দু মুঠো লাউ শাক আগে কেনা, দোকানের মালিক আমাকে দেখে বললো “ভাই শাক তো আমার কাছেও ছিল “. আমি বললাম “কই দেখলাম নাতো” . উনি বললেন – “ওহ!! রোদে শুকায় যায় তো তাই কোল্ড স্টোরেজ এ রাখসি “. ওনার উদ্দেশ্য কিন্তু খারাপ না, কিন্তু যদি সামান্য একটা লেখাও থাকতো দোকানের সামনে তাহলে আমার সিদ্ধান্তটা অন্য রকম হতো। একই জিনিস প্রযোজ্য ওয়েবসাইট এর ক্ষেত্রেও। ওয়েবসাইট বানানো উচিত কাস্টমার ফোকাস করে। এই কন্সেপ্টার একটা সুন্দর নাম আছে “work backwards from the customer” – এর মূল উদ্দেশ্য হলো কাস্টমার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে চিন্তা করা – যে “আমি যদি কাস্টমার হতাম তাহলে আমি কি তথ্য খুঁজতে এই ওয়েবসাইট এ আসতাম”, “আমার টার্গেটেড কাস্টমাররা সাধারণত কি ধরণের সার্ভিস চায়”, “কিভাবে কাস্টমার এনগেজমেন্ট বাড়ানো যায়”।

এই ইন্টারনেট এর যুগে এখন সব ব্যবসাই গ্লোবাল। ভাবতে পারেন আমার বলা কথা গুলো ইমপ্লিমেন্ট করা খুব কঠিন। হয়তবা আপনার ধারণা সত্যি, কিন্তু এটা ভাবার কোনো কারণ নাই যে আপনাকে IT এক্সপার্ট হতে হবে এগুলো ইমপ্লিমেন্ট করার জন্য। আসলে যা দরকার তা হলো – “আপনার বিসনেস ডোমেইন এ অন্য সফল কোম্পানী গুলো কিভাবে ওদের অফারিং গুলো রিপ্রেজেন্ট করছে, এই ধারণা নেয়া “, “নিজের কাস্টমার এর পেইন পয়েন্ট আর চাহিদা বোঝা “, “শুধু স্বল্প মেয়াদি লাভের আশা না করে দীর্ঘ মেয়াদী চিন্তা করা” আর সঠিক রিসোর্স খুজে বের করা যে আপনার লক্ষ্য পূরণে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিবে।

লেখাটা শেষ করবো আমার নিজের কিছু lessons learned দিয়ে:
১. ওয়েবসাইট এড্রেসটা ছোট, শুনতে সহজ আর টাইপ করতে সহজ হওয়া জরুরি
২. একটা সুন্দর লোগো (দয়া করে শাপলা ফুল আর বাঘের ছবি দেয়া থেকে দুরে থাকুন। আমাদের আবার দেখানো দেশপ্রেম একটু বেশি ) – আজকাল অনলাইন অনেক কম টাকায় লোগো ডিজাইন করা যায়. দেখতে পারেন www.fiverr.com
৩. একটা ওয়েব হোস্টিং কোম্পানি খুজে বার করুন যে আপনার চাহিদা মেটাতে পারবে
৪. শুরু করুন স্বল্প পরিসরে কিন্তু পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করুন যে আপনার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা
৫. যে সময়টা মনে হবে আপনি আপনার পরিকল্পনা মতো এগুচ্ছেন কিন্তু আপনার IT সার্ভিস প্রোভাইডার তার সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছেনা , তাহলে বুঝবেন সময় এসেছে একজন বিশ্বস্ত বিসনেস পার্টনার এর যে টেকনোলজি বুঝবে আর আপনার লক্ষ্য পূরণে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিবে।

 

সিডনি, অস্ট্রেলিয়া