পান্তা ভাতের ডিশটা অনেক রিস্কি ছিলো : কিশওয়ার চৌধুরী

  •  
  •  
  •  
  •  

বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা কামরুল ইসলাম চৌধুরী ও মা লায়লা চৌধুরী মেলবোর্নের বাংলা কমিউনিটির অতি পরিচিত ও প্রিয় মুখ। তাদেরই কন্যা কিশওয়ার চৌধুরী এই মুহূর্তে শুধু অস্ট্রেলিয়াতেই নয় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রতি বাঙালির ভালোবাসার মানুষটির নাম। ১৯৭১ সালে বাবা কামরুল চৌধুরী স্বদেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন, আর ২০২১-এ কন্যা কিশওয়ার সেই অর্জিত মানচিত্রকে বিশ্ব দরবারে নিয়ে গেলেন এক অনন্য উচ্চতায়। মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া ২০২১ খেতাবটি কিশওয়ার অল্পের জন্য ছুঁতে পারেননি সত্য কিন্তু ১৬ কোটির অধিক বাংলাদেশীর হৃদয়ে তিনিই বিজয়ী। অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো’তে তিনি হয়েছেন দ্বিতীয় রানার আপ। অবশ্য দর্শকের কাছে তিনি ছিলেন টপ ফেভারিট। গতকাল প্রশান্ত পারের বাংলা কাগজ প্রশান্তিকার পক্ষ থেকে কিশওয়ার চৌধুরীর মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রশান্তিকার মেলবোর্ন প্রধান মিতা চৌধুরী।

প্রশান্তিকা: কেমন আছেন কিশওয়ার? আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারছি। অবশেষে আমাদের স্বপ্ন সত্যি হলো।
কিশওয়ার: (হেসে) তাই ! ভালো আছি।
প্রশান্তিকা: সবার আগে জানতে চাই এইযে এত ভালোবাসা, আশীর্বাদ এবং প্রাপ্তি- কিভাবে উপভোগ করছেন?
কিশওয়ার: হ্যাঁ যখন অনুষ্ঠানটি শেষ হলো এবং সর্বোপরি এটি সবার সঙ্গে ভাগাভাগি হলো তখন বুঝতে পারলাম খুবই চমৎকার একটা জার্নি ছিলো ! আমার সাফল্য বা ভিক্টোরি যেটাই বলি, আমি বলতে পারি সবার সঙ্গে তা শেয়ার করাটা অনেক অনেককে অনুপ্রাণিত ও আনন্দিত করেছে। আমার মতো একজনকে এরকম একটি জায়গায় দেখে হাজার হাজার মানুষ এতে গর্বিত বোধ করছে। আমি খুব আপ্লুত।

কিশওয়ার চৌধুরী। ছবি: মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া ২০২১।

প্রশান্তিকা: সত্যিই তাই। তো সবাই বলছে যে, “আপনি হয়তো টাইটেল জিততে পারেননি কিন্তু আমাদের চোখে আপনি বিজয়ী ও আমাদের রানী”! এরকম ভালোবাসার বার্তা বা দোয়া, ও আপনাকে ঘিরে এইযে এত উচ্ছ্বাস এটাকে কিভাবে দেখছেন ?
কিশওয়ার: আমি সেখানে (মাস্টারশেফ ২০২১) অংশগ্রহণ করেছিলাম আসলে আমার নিজ স্বপ্নটা পূরণ করতে, আমি সত্যি যা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি সেটাই অনুসরণ করতে। এই অংশগ্রহণ সাউথ এশিয়াতে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষকে সংযুক্ত করেছে। তারপর নর্থ আমেরিকা, সমগ্র ইউরোপ, কানাডা সবখানেই এটা বিশাল সংখক মানুষকে আকৃষ্ট করেছে, এটা সবার মাঝে একটা দারুণ বন্ধন তৈরি করেছে এটা অব্যশই চমৎকার। সবার সঙ্গে আমার জার্নিটা শেয়ার করে আমি সত্যিই আনন্দিত।

প্রশান্তিকা: গ্রাফিক ডিজাইনার ও প্রিন্টিং ব্যবসা থেকে আজকের কোটি হৃদয়ের ভালোবাসার কিশওয়ার হয়ে ওঠার জার্নিটা কেমন ছিল?
কিশওয়ার: (হেসে) একটা ব্যবসায়িক পটভূমি থেকে এসে আমার বিশ্বাস আমার জন্য এই জার্নিটা দারুন ও সাফল্যজনক ছিলো। অবশ্যই গ্রাফিক ডিজাইন একটা সৃজনশীল কাজ, আর প্রিন্টিং ব্যবসাও একটা সৃজনশীল কাজ কিন্তু তারপর আপনাকে প্রতিদিনের গুরুত্ব সামাল দিতে হবে। তো সেই অবস্থান থেকে মাস্টারশেফ’এ আসাটা আমার মনে হয় আমার পরবর্তী একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল, যে বিষয়ে আমি খুবই আগ্রহী ও যা আমি খুবই উপভোগ করি।
প্রশান্তিকা: ঠিক, আমরা যারা আপনার পরিবারকে চিনি, যেমন আপনার বাবাও চমৎকার রান্না করেন। তাহলে কি বলবেন আপনার রান্নার প্রতি ভালোবাসাটা পারিবারিকভাবে পেয়েছেন?
কিশওয়ার: সত্যি তাই। এমনকি শো’তে বারবার আমি আমার রান্নার সকল কৃতিত্ব আমার মা আর বাবাকেই দিয়েছি যারা দুজনেই চমৎকার রান্না করেন। তবে তাদের রান্নাটা অবশ্যই ভিন্ন তাদের পটভূমিটাও ভিন্ন। আমার মা পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার আর আমার বাবা বাংলাদেশের ঢাকার। তাদের দুজনেরই আলাদা ধরণ আছে রান্নাতে। আমি সেক্ষেত্রে সৌভাগ্যবান যে আমি তাদের দুজনের রান্নার ধরণটা ধারণ করে সীমান্তের দুইপারের রান্নাই  তুলে আনতে পেরেছি আমার রান্নায়। যদিও এটা বাঙালি খাবার বা বাংলাদেশী খাবার বা ইন্ডিয়ান বাঙালি খাবার তারপর কিন্তু এটা আমার প্লেটে একটা বিস্তৃত বিষয় ছিল।

অনলাইন সাক্ষাৎকারে কিশওয়ার চৌধুরীর সাথে কথা বলছেন মিতা চৌধুরী।

প্রশান্তিকা: অবশ্যই! যদিও বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ কিন্তু এর রান্নার বৈচিত্র্য অনেক বেশি। তারপর যখন আপনি পশ্চিম ও পূর্ব বঙ্গের রান্নার সমন্বয় ঘটিয়েছেন, এটা সত্যিই অপূর্ব। শেফ হিসেবে নিজের একদশকের অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি কিচেন কতটা স্ট্রেসফুল। সেখানে আপনারা একটা অল্প সময়ে এত বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছেন, কিভাবে সম্ভব ছিলো?
কিশওয়ার: এই মুহূর্তে আমি আসলে এই প্রেসারটা খুব উপভোগ করছি। আমাদের ফিল্মিং কয়েক মাস আগে শেষ হয়েছে, আর আমি আসলে এখন মাস্টারশেফ কিচেনের সেই অভাবনীয় চাপটা মিস করছি, এই চাপের সঙ্গে আপনি নিশ্চই পরিচিত। এটা প্রচন্ড চাপের একটা পরিবেশ, আপনি কতটুকু উপভোগ করবেন। আমি একটা প্রেসার টেস্টে বলেছিলাম এটা অনেকটা এক্সট্রিম স্পোর্টস। তবে আমার বিশ্বাস আমি খুবই সৌভাগ্যবান যে, আমি সেখানেই রান্না করছি যেখানে আমি করতে চেয়েছিলাম। রান্নার জন্য আমার খুবই আগ্রহ কিন্তু আমি ভালো একটা পরিবেশেও আছি, শেফ ফিও মো ও এডাম ডি সিলভা এদের সঙ্গে কাজ করতে পারছি। আমি আমার পছন্দের ডিস রান্না করতে পারছি এবং সেটা অন্যের কাছে পৌঁছাচ্ছে, তো আমি এই মুহূর্তে কিচেনটা ও এর ইন্ট্যান্সড্ পরিবেশটা দারুণ উপভোগ করছি।

প্রশান্তিকা: মাস্টারশেফ চলাকালীন সময়ে দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়েছে বিষয়টা নিশ্চয়ই সহজ ছিল না। কেমন করে তখন নিজেকে স্ট্রং রেখেছেন।
কিশওয়ার: অবশ্যই, বিশেষকরে যেসকল প্রতিযোগীর ছোট সন্তান আছে তাদের জন্য এটা অনেক কঠিন একটা জার্নি ছিল। একটা বিশাল ত্যাগ ও মূল্যের বিনিময়ে করতে আমরা যা করতে চাই তা করতে পারাটা, বিশেষ করে মাস্টারশেফ একটি বিশাল প্ল্যাটফর্ম সেখানে আমি, পিট্, লিন্ডা, জেস আমরা পরবর্তী পর্যায়গুলোতে যেতে পারাটা একটা কঠিন মানসিক ব্যাপার ছিল।

মাস্টারশেফ কিচেনে কিশওয়ার। ছবি: মাস্টারশেফ ২০২১।

প্রশান্তিকা: পান বা বিটল লিফ’কে নিয়ে করা ডিশকে জাজরা বলেছেন ‘ আ্য লাভ লেটার টু বাংলাদেশ’ এটা ইমোশনালি আপনাকে কতটুকু নাড়া দিয়েছিলো?
কিশওয়ার: হ্যা, প্রকৃতপক্ষে আমি বিচারকদের কথা বা তারা কি বলছেন সেটা জানতে পারতাম না যখন প্রতিযোগিতাটা চলছিল, আমিও আসলে অন্য সকলের মতো টিভিতেই দেখেছি। আমি খুব আন্দোলিত হয়েছি।
প্রশান্তিকা: এই যে আমাদের এতো বছরের ঐতিহ্য পান্তা ভাত, আলু ভর্তা বা মরিচ পোড়া আপনি গ্লোবাল ফুড টেবিলে উপস্থাপন করলেন, এর পেছনের মূল প্রেরণাটা কি ছিলো ? এটা কি অনেক বড় একটা রিস্ক নেয়া হয়েছিলো?
কিশওয়ার: অবশ্যই, ওই মুহূর্তে এটা অনেকটা রিস্কি ছিল। এই ডিশ’টা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। অনেক অনেক আর্টিকেল এর ইতিহাস এর ঐতিহ্য। আবার আমাদের বঙ্গপোসাগরের চারপাশে বিভিন্ন এলাকায় এর যে বিভিন্ন উপস্থাপন যেমন ওড়িশা সেখানে একটা উৎসব আছে এটা নিয়ে যা কিনা বাংলাদেশ থেকেও উত্তরে। মূলত এই ডিশটা ঘিরে একটা উচ্চ পর্যায়ের ভাবপ্রবণতা বা আবেগ আছে। তারপর আরো উল্লেখযোগ্য হলো শুধু ভাত পানি আর ধোয়ার গন্ধ এত চমৎকার ও অসাধারণ একটা খাবার তৈরি করে। আসলেই এটা দারুণ একটা বিষয়।

মাস্টারশেফ বিজয়ী জাস্টিন, প্রথম রানার আপ পিট এবং দ্বিতীয় রানার আপ কিশওয়ার চৌধুরী।

প্রশান্তিকা: বাংলা খাবারের রেসিপি বুক লিখবেন আমরা জানি এমনকি জাজরাও বারবার বলেছেন এ প্রসঙ্গে। বইটি কবে আমরা পেতে যাচ্ছি?
কিশওয়ার: রান্নার রেসিপির বইটি আমি লিখছি। তবে ঠিক কবে আসবে এটা এখনো জানিনা।
প্রশান্তিকা: ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি? আর মেলবোর্নের বাঙালিরা অপেক্ষায় আছে কবে শেফ কিশওয়ার’এর রেস্টুরেন্টে যাবে, আসলেই কবে যেতে পারবো আমরা?
কিশওয়ার: মিতা আপনি যেহেতু মেলবোর্ন আছেন, আপনি অনলাইনে ‘হাঙরি হাংরি’ তে যেয়ে টংকা রেস্টুরেন্ট থেকে আমার রান্নার অর্ডার করতে পারেন। টংকাতে যুক্ত রয়েছি আমি। যারা মেলবোর্নে আছেন  তারাই টংকাতে আমার রান্নার অর্ডার দিতে পারবেন যা হোম ডেলিভারি দেয়া হচ্ছে।
প্রশান্তিকা: সব শেষে বলতে চাই, আমি এবং প্রতিটি বাঙালি আপনার জন্য গর্বিত। অনেক ধন্যবাদ ও শুভকামনা আগামীর জন্য।
কিশওয়ার: আপনাকেও ধন্যবাদ মিতা।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Sintu Kumer Chowdhury
Sintu Kumer Chowdhury
1 month ago

Live দেখা হয়নি। তবে যখন প্রথম আলো পড়তে পড়তে অবাক হচ্ছিলাম এই ভেবে আমাদের একান্ত নিজস্ব সংস্কৃতির এই খাবার বিচারকগণ কিভাবে নিবেন?