লালচাঁন আর কুসুমীর প্রেম কাহিনী। রম্য । পিয়ারা বেগম

  •  
  •  
  •  
  •  

 441 views

আমি কুসুমী। ফুলের মতো সুন্দর অইছিলাম বইলা মায় নাম থুইছে কুসুমী ? তয়, আমি আফনেগো মত মানুষ না। মুরগী। ওম্মা হাসতাছেন! হাইসেন না। মুরগী অইলেও আমাগো শখ-আহ্লাদ আছে। ভালোবাসা আছে। সুখ-দুঃখ আছে। আছে কষ্ট! হৃদয় ভাঙ্গার গল্পও আছে। হ, আইজ হেই ভাঙ্গা মনের গল্পই কমু।
একুশডা ভাই-বোন লইয়া আমার মায় কোরছত্থনে বাইর অইছে। গিন্নি মা পলোর তলে আমাগো খুঁদ দিছে। খুঁদ ঠোঁডে লইয়া মায়  টুকটুক করে। তহন বুঝি মায় আমগো খাওনের লইগ্যা ডাহে। বিপদ-আপদ থাইক্যা বাঁচনের সংকেতও হিকাইছে। গলা উঁচু কইরা কু-কু-কু করলে বুঝমু বিপদ সংকেত! তহন খাওন থুইয়া ছটর-বটর কইরা ঝোপঝাড়ে লুকামু। আর মায় যদি গলা ফাডাইয়া চিক্কার দেয়, পাখনা ঝাপটাইয়া কট কট  করে তহন বুঝমু মহাবিপদ সংকেত!! এমনি বিপদকালে মরার চিলে ছোঁ মাইরা আমারে লইয়া গেল। আমার মায় পাখনা ঝাপটাইয়াও চিলের লগে পারে নাই। আমি টিও টিও কইরা ডাকতাছি। এদিকে চিলের সামনে পড়ল আরেক চিল। মরার দুই চিলে লাগছে কাড়াকাড়ি। কোন ফাঁকে টুপ কইরা আমি বোরো ক্ষেতে পইড়া গেলাম। মাটিতে পইড়া বেহুশ অইয়া রইলাম কতক্ষণ জানি না। চোখ মেইল্যা দেহি বুড়ি দাদী খালে ওযু করতাছে। আমি নইড়া-চইরা ওঠলাম। দেহি চিলের নখের আঁচড়ে আমার পেটের কিছু অংশ জখম অইছে। রক্ত ঝরছে। ভাবছি, সন্ধ্যা অইলে বেজির পেটে যাইতে অইব। তাই টিও টিও কইরা ডাকছি। দাদী আমারে খুঁজতাছে। আমি ইচ্ছা কইরাই আবার টিও টিও করলাম। দাদী গপ কইরা ধরল। বাড়ি নিয়া জখমের জায়গায় হলুদবাটা গরম কইরা লাগাইল। একটু আরাম লাগতাছে। পলোতে আটকাইয়া খুঁদ দিছে, পানিও দিছে। খাওন ভেতরে যায় না। মা, ভাই-বইনের লাইগ্যা পরাণটা পুড়ছে।

দাদীর যত্ন-আত্তিতে আমি গায়-গতরে বড় অইলাম। সুন্দরীও ছিলাম। তাই মোরগের দল আমার চারপাশে ঘুরঘুর করত। দাদী টের পাইছে। আমারে আকারে ইঙ্গিতে সাবধান করছে। যেন কোন মোরগের প্রেমে না পড়ি।
দিন দিন আমার রূপ-সৌন্দর্যের খবর পাঁচকান অইল। মোরগরা দেওয়ানা হইল। প্রত্যেক দিন কোন না কোন মোরগ প্রেম নিবেদন করতাছেই।এক মোরগেরে আরেক মোরগে দৌঁড়ায়। প্রতিযোগিতা শুরু অইছে আমারে লইয়া। মোরগে পাখনা ঝাপটায় আর ঠোঁটে খাওন নিয়া কুট কুট কইরা ডাহে। আমি পাত্তা দিইনা। দাদী রাতে কইল, আমারে এখানে রাহন যাইব না। ঢাকা নিয়া জবাই কইরা খাইব। দাদী পোলামাইয়া ঢাকায় থাহে। এই কথা হুইন্না আমি অঝোরে কাঁদলাম। কইলাম, পোড়া কপাল! চিলের পেডে গেলেই ভালো অইত। পরের দিন ঠিকই রওয়ানা দিল। রাস্তায় দাদীর বোনের বাইতে ওঠল। দুই দিন থাকব, তয় ঢাকা যাইব। আমারে বাইরে পলোর মধ্যে পায়ে দড়ি বাইন্দা আটকাইলো। ওম্মা দেহি, একটা লাল টুকটুইক্কা মোরগ! গায়-গতরে সুন্দর। এক্কেবারে টগবগে জোয়ান! আমার পলোর চারপাশে কুটকুট কইরা পাখনা ঝাপটাইতাছে। প্রেম নিবেদন করতাছে। আর আড়ে আড়ে চায়। এত্ত হ্যান্ডসাম! ইস-সি রে! চোখ ফিরাইতে পারি নাইক্যা। আমিও আড়েআড়ে চাইতাম। পুলকিত হইতাম। ভেতরে শিহরণ জাগত! কী আর কমু, শরম লাগে যে! আসলে আমারও তানির মনে ধরছে। আমার নাম জানতে চাইল।

কইলাম কুসুমী। আমিও মুখ টিইপা-টিইপা হাসতে হাসতে তানির নাম জানতে চাইলাম। উনি কইলেন, লালচাঁন। কী সুন্দর নামডা! আমি লালচাঁনের প্রেমে মইজা গেলাম। আমারে যে জবাই করতে ঢাকা লইয়া যাইব এইডা গোপন রাখলাম। দাদী, চারপাঁচ দিন রইল। আমাগো প্রেমও এখন তুঙ্গে। লালচাঁন পলোর বাইরে। আমি ওর কাছে গেলেই শিহরিত হই। ভাবছি, এইডারেই বুঝি ভালেবাসা কয়? তয় মরার পলোর লাইগ্যা আমগো দুই জনে কাছাকাছি অইতে পারি নাই। এতে কষ্ট অইত। মনডা উথাল-পাতাল করত। কন তো, কত্ত কষ্ট কাটত আমাগো রোমান্টিক সময়গুলা। জীবনের প্রথম ভালোবাসা! এমনি মনোমোহন মুহূর্ত! আমারে যে জবাই করণের লাইগ্যা ঢাকা লইয়া যাইব হেই কথাডা কেমনে কই? জানি, হুনলে লালচাঁনে পাগল অইয়া যাইব। হায় রে পোড়া কপাল! জন্ম থাইক্যাই জ্বলছি! তাই ধিকিধিক আগুন বুকে লইয়া কষ্টটা পাথরচাপা দিলাম। লালচাঁনের লগে রংতামাশা ঠিকই করতাছি। ভালোবাসার এত্ত সুখ আমার কপালে সইবে তো? কিন্তু জবাই করণের কথা মনে অইলে বুকটা ধড়াস কইরা ওডে। তয়, মায় কইত, ডরাইছ না রে মা! জবাই অওনের ভয়-ডরের আশংকা মাথায় লইয়াই আমরা সন্ধ্যায় খোয়ারে ঢুকি। এইডাই আমাগো নিয়তি! আমাগো জন্মডাই মানষের খাওনের লইগ্যা। বাইরে থাকলে হয় চিলের পেডে নইলে বেজির পেডে। আর খোয়ারে ঢুকলে মাইনষের পেডে। কেউ তো বুকে টাইন্যা নেয় না। দুত্তরি ছাই! কষ্টের কথা আর মনে করতাম না। লালচাঁনের লগে এমন মেলামেশার আনন্দটুকু কষ্টে ভরাডুবি হোক এইডা চাইনা। মরমুই যহন তয় ভোগ কইরাই যাই।

ওম্মা! রাতে হুনি দাদীর বইনে আমারে পালব। এর বদলে লালচাঁনের দিব। হায়! হায়! কয় কী, কয় কী!! পরাণডা ছ্যাঁত কইরা ওঠল! আমার বদলে লালচাঁন জবাই অইব? দেখছুনি কারবারডা? মাইনষের কেমন মতলবি কাম। রাইতে এক খোয়ারে থাকতে দিত না দুইজনেরে! ও খোয়ারে! আমি পলোর নিচে বাইরে। ছটফট করতাম রাইতভর। শেষ রাইতটুকুন আমার আর কাটতে চায় না। বিরহের রাইত বড্ড দীর্ঘ!
হাছা-হাছাই লালচাঁনের ভোরে আটকাইল। পিছমোড়া বাইন্দা লইয়া রওয়ানা দিল।  লালচাঁনে ছোডনের লইগ্যা দাবড়াইতাছে। গলা ফাডাইয়া গোৎ গোৎ করতাছে। কষ্টে বুকটা ফাইট্যা যাইতাছে। আমি পিছেপিছে যাইতাছি। করুণ দৃষ্টিতে চাইয়া রইলাম। কইলাম, আল্লাহ! আমাগো মুখে কেন বাক্যি দেও নাই। না পারছি কিছু কইতে, না পারছি সইতে। ভালোবাসার মোরগডারে কাইড়া লইয়া গেল। বুকচাপড়াইয়া কানতাছি। ভেতরডা ফানাফানা অইয়া যাইতাছে। হায় রে জীবন! মনে পইড়া গেল সন্ধ্যা মুখার্জীর সেই গানের কলিঃ

চেয়ে চেয়ে দেখলাম, তুমি চলে গেলে
চেয়ে চেয়ে দেখলাম,
আমার বলার কিছু ছিল না,
না গো, আমার বলার কিছু ছিল না।

 ১৮ / ০৭/ ২০২১।

পিয়ারা বেগম
নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, বাংলাদেশ।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments