শাড়ি নিয়ে লিখলেন কিন্তু লুঙ্গির গিঁটটা টাইট করলেন না -ফারিনা মাহমুদ

  •  
  •  
  •  
  •  
ফারিনা মাহমুদ

জীবনে প্রথম যেদিন শাড়ি পরি (কোনো এক বড় আপু পরিয়ে দিয়েছিলেন, স্কুলের অনুষ্ঠানে) সেদিনের মেমোরী – অনুষ্ঠান শেষে পোশাক বদল করতে গিয়ে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম বিভিন্ন জায়গায় মোট ১৯ টি সেফটিপিন দিয়ে শাড়িটিকে আটকানো হয়েছিল । সম্ভবত, কাঠের টুকরার মত আড়ষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমার অনভ্যস্ততার কারণে আপু সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন পরবর্তী যেকোনো ধরনের দুর্যোগ এড়ানোর প্রস্তুতি হিসাবে। কালক্রমে প্রবল নিষ্ঠা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠায় সেফটিপিনের সংখ্যা ২/ ৩ টিতে নামিয়ে এনে শাড়ি পরার ও রক্ষা করার কৌশল আমি রপ্ত করি এবং ইভেনচুয়ালি তা আমার অন্যতম প্রিয় পোশাকের স্থান দখল করে নেয় । এই রহস্যময় পোশাকের দিকে গভীর ভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মূলত এটা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের একটা আয়তাকার সমতল কাপড়ের টুকরা যা পরার কয়েক রকম স্টাইল রয়েছে । এই স্টাইল গুলো নির্ভর করে কিভাবে, কোন জায়গায়, কয়টি প্যাঁচ, কয়ভাবে দিয়ে তা পরা হবে তার উপরে । এমনকি, একটু বুঝে শুনে, ট্রিকস জেনে ও মেনে পরা হলে একটি শাড়ি একজন নারীর খুঁত ঢেকে তাকে আকর্ষনীয় করে তুলতে পারে অনায়াসে।

মাঝে মাঝে আমার জীবনটাকে শাড়ির মত মনে হয়। আপাতদৃষ্টিতে জীবন সরল ও সমান্তরাল, তবে মানুষ যখন জীবনকে ধারণ করে, শাড়ির মতই প্যাঁচ দিয়ে তাকে ধারণ করতে হয় । মিলের কাপড়ের রোল এর মত একটি কাঠের লাঠির চারপাশে ক্লকওয়াইস বা এন্টি ক্লকওয়াইস ঘুরিয়ে জীবনকে ধারণ করা যায়না । প্রপার প্লেইসে, প্রপার টাইমে এই প্যাঁচ, যে যত আর্টিস্টিক ও মানানসই ভাবে দিতে পারে, তার জীবন তত সুন্দর হয়। আর এই প্যাঁচের অংকে একবার গন্ডগোল হয়ে যদি আঁচলের জায়গায় কুঁচি আর কুঁচির জায়গায় আঁচল বসিয়ে দেয়া হয়, তো লাইফ শেষ। আর ইন ওর্স্ট কেইস, খোদা না খাস্তা , যদি ১৯ টা সেফটিপিনও মারা হয়ে যায় ….. তো আপনি কমপ্লিটলি ক্রুসিফাইড! তখন অমুক আপনাকে বেপ্যাঁচে শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে আর তমুক বেতালে সেফটিপিন গেঁথে দিয়েছে, এই “দোষারোপ” করে আপনি পার পাবেন না !

সম্প্রতি শাড়ি আবারো আলোচনায় এনে অধ্যাপক আবু সায়ীদ এসেছেন সমালোচনায়। ওনার লেখাটি শৈল্পিক মানদণ্ডের বিচারে কোন পর্যায়ে পরে আমি জানিনা, কারণ আমি শিল্প বিশ্লেষক নই। কলাম আকারে একটি প্রতিষ্ঠিত দৈনিক যেহেতু এটি ছেপেছে, ধরে নিচ্ছি আমার মতো আমজনতা পাঠকও এই কলামে চোখ বুলাবে।

সম্প্রতি প্রথম আলোয় শাড়ি বিষয়ক কলাম লিখে আলোচনার মুখে পড়েন অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ

কলামটি পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে শিরোনামের সাথে এর বিষয়বস্তুর মিল কম। ধরেন আপনি একটি কলাম লিখলেন গরুর শরীরের কোন অংশ দিয়ে কোন ধরণের স্টেক ভালো হয়, তার উপরে। এইখানে গরুর শরীরের বিভিন্ন অংশের মাংসের গঠন ও ধরণ সম্পর্কে বর্ণনা আছে, আছে চর্বি ও মাংসের অনুপাত এবং রান্নার সময় নিয়ে আলোচনা। এখন এর নাম যদি গরুর রচনা দেই, তাহলে চুপিচুপি একটা সূক্ষ কারচুপি হয় বলে আমার ধারণা। এর শিরোনাম হওয়া উচিত “বিফ স্টেক – মাংসের রকমফের” টাইপ কিছু।

ঠিক একইভাবে ওনার লেখার শিরোনাম হওয়া উচিত ছিলো – “শরীরের খাঁজে শাড়ির ভাঁজে” টাইপের কিছু। কারণ পুরো লেখাটি মূলত নোংরা পুরুষতান্ত্রিক চোখে নারীর শরীরের বিশ্লেষণ, যেখানে শাড়িকে ব্যবহার করা হয়েছে শৈল্পিকতার ঢাল হিসেবে। এই কাঁচা ভন্ডামির দরকার ছিলো না এই বয়সে!

জ্বি, যারা এর পক্ষে সাফাই গাইছেন, তারা জেনে রাখুন, পর্ন মুভি বা ন্যুড আর্টও শিল্প… মিলিয়ন ডলারের পুঁজিবাদী বাজারও আছে এর… কোন শিল্পের স্বাদ আপনি কোন প্ল্যাটফর্মে আস্বাদন বা আলোচনা করবেন, এটা আপনার রুচির ব্যাপার…

সায়ীদ সাহেব, শাড়ি নিয়ে লিখতে বসলেন অথচ লুঙ্গির গিঁটটা টাইট করলেন না, এ কেমন কথা! আপনার দেখি শাড়ির প্যাঁচে লুঙ্গি আঁটকে গিয়ে বেরা ছেড়া অবস্থা !

ফারিনা মাহমুদ
প্রদায়ক সম্পাদক, প্রশান্তিকা।
মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া।