শাপলা বিলে আমার যে শৈশব । পিয়ারা বেগম

  
    

এই তো মনে হচ্ছে সেদিন। আশ্বিনের মাঝামাঝি । তখন ভরাবর্ষার পানির স্রোতের তোড় কমতে শুরু করেছে। আমাদের গ্রাম ভাওরখোলা আর প্রতিবেশী গ্রাম হরিপুরের মাঝামাঝি  বিল। ঐ বিলে তখন শাপলা ফুলের মহাসমারোহ। ভরভরন্ত যৌবনা শাপলার ফুলফলের নান্দনিক দৃশ্যে মন কাড়ে নৌকাবাহী মানুষের।

আমরা দুষ্টুরাও কিন্তু বসে নেই। চাচাতো বোন, ভাইঝিদের নিয়ে কোষা নৌকা করে যেতাম শাপলা বিলে। ফুলের মুগ্ধতা আর শাপলার ভর্তা খাওয়ার লুদ্ধতা দুটোই ছিল উদ্দেশ্যের তালিকায়। মেয়ে হলেও নৌকা চালনায় আমরা ছিলাম সিদ্ধহস্ত। পিচ্চি ভাইপোদের সাথে রাখতাম, কারণ পরে বলছি।

মেয়েরা জোটবদ্ধ হয়ে নৌকায় শাপলা অভিযানে বের হওয়া! তখনকার সময়ে মূলত দৃষ্টিকটু। বাড়ির মান-সম্মানের একটা ব্যাপার-স্যাপার তো আছে। তাই পিচ্চি ভাইপোদের সাথে নিতাম। যাত্রীবাহী নৌকা আসতে দেখলেই চটজলদি পিচ্চিদের হাতে লগি-বৈঠা ধরিয়ে দিতাম। আমরা নৌকার মাঝে চুপটি করে নাকমুখ ঢেকে বসে থাকতাম। যেন ভাজা মাছটাও ওল্টে খেতে জানি না। অর্থাৎ যাতে কেউ বুঝতে না পারে আমরা মেয়েরা নৌকা বাইতাছি। আর বাড়িতেও কিন্তু নৌকা বাওনের ব্যাপারে বড়দের আপত্তি ছিল। নৌকা চালানো পুরুষের কাজ কী না, তাই। যাই হোক, সাথে নিতাম দুটো সিলভারের বড় বুল, ভিজিয়ে রাখা পাকা তেঁতুল কিংবা আমের হলি। পাঁচটা-ছয়টা ছোট বুলবাটি, একটা প্লেট। লবন, টকটকে লাল শুকনো পোড়া মরিচ। এক পিচ্চি নৌকা চালাতো আরেকটা বৈঠা। বড় দু’তিন জনে শাপলা ওঠাতো। আমি আর আরেক পিচ্চি মিলে শাপলা গুছাতাম।

ডুবো শাপলা! পানির প্রায় আধা হাত নীচে যে শাপলা এটাই ডুবো শাপলা। এর বৈশিষ্ট্য সাধারণ শাপলা থেকে মোটা, নরম, রসালো এবং মিষ্টি। তবে লম্বায় একটু কম। এই শাপলার ফুল অফুটন্ত থাকে। হাত দিয়ে টেনে তুলতে হতো। এতে একটু জোর বেশী লাগত। আমি গায়-গতরে ক্ষীণদেহী ছিলাম। তাই শক্তিশালী যারা তারাই এ কাজটুকু করত। তবে সমস্যাও কম ছিল না। শাপলা ধরে টান দিলে নৌকাও শাপলার দিকেই ছুটতো। কারণ, মাটি আঁকড়ে ধরা শাপলা সহজে ওঠানো যেত না। সে মুহূর্তে শরীরের ব্যালেন্স রাখতে না পেরে টুপ করে পানিতে পড়ে যেতো নৌকার হালধরা পিচ্চিটা। এতে বরং তার মজাই হতো। কারণ, আশ্বিনী রোদে পিঠের চামড়া পুড়ে যেত। ওর পড়ে যাওয়ার ধরনটা দেখে আমরা খিলখিল করে হাসতাম।  বলতাম – ওরে বিচ্ছু, তুই ইচ্ছে করেই পড়েছিস। ওর কানে বুঝি আর এ কথা ঢুকে। অবশ্য আমরা ক’জনে ওকে টেনেটুনে নৌকায় ওঠাতে সাহায্য করতাম। ওঠানোর সময় সবাই নৌকায় এককাতে আসায় নৌকায় পানি ওঠতো। নৌকা ডুবির ভয়ে তাই সবাইকে বলতাম, ঐ তোরা ক’জন নৌকার ঐ পাশে থাক। কে শুনে কার কথা! বিচ্ছুগুলো তো এ সুযোগের অপেক্ষাই ছিল। পানিরটা টেনে ওঠাতে গিয়ে নৌকায় পানি ওঠার অজুহাতে আরেক বিচ্ছুও পানিতে পড়ে টুপ করে দে ডুব। দুটো একসাথে শেওলা-দাম শরীরে পেঁচিয়ে নৌকার দু’গলুই ধরে ঝুলতো! তাদেরকে নৌকায় ওঠাতে যে কতটা পেরেশানি হয়েছে আমার! এটা মনে হলে এখনো আমার শরীরে জ্বর ওঠে। ওরা এখনকার ডিজিটাল বিচ্ছুর দাদার দাদা! ওরা সারাদিন পানিতে নেমে পানকৌড়ির মতো  ডুবাতো। চোখগুলো কোকিলের মতো রক্তরাঙা করত। এমনিতেই সাঁতার শেখা হয়ে যেত তাদের।

তারপর শাপলাগুলোর আঁশ ছিলে টুকরো-টুকরো করতাম। আরেকটা বড় বুলে নিতাম। প্রথমে লবন দিয়ে শাপলা হাতে চটকাতো। চটকানো শাপলার পানি ফেলে দিতো। আর অন্য বুলে তেঁতুল বা আমের হলিও চটকাতো। টক চটকানো দেখেই তো জিহ্বে পানি আসত। তখন ঘনঘন ঢোক গিলতাম। পরিমাণ মতো লবন, শুকনো মচমচে পোড়া মরিচ ভেঙ্গে একসাথে মিশাতো। এরপরে চটকানো শাপলা আর গুলাতেঁতুল আবারো একসাথে চটকায়ে লোভনীয় শাপলার ভর্তা তৈরি করতো। ভর্তা তৈরি হবার পর শুকনো মরিচের বিচিগুলো মাছের চোখের মতো ভেসে থাকত। তর সইতো না আমার। তাই ফাঁকতালে লবনটা ঠিক হয়েছে কী না এই অজুহাতে টেনেটুনে একটু খেতাম। পিচ্ছিদেরও একটু-আধটুকু দিতাম। ওরা বিচ্ছু হলেও উপকারী বন্ধু ! ভর্তা তৈরি হলে পিচ্চিদের আলাদা করে দিতাম। ওরা একসাথে খেত আর আমরা বড়রা খেতাম একসাথে। হায় রে ঝাল! ঝালের চোটে চোখ-নাকের পানি এক হয়ে যেতো। বাম হাতে নাক পরিষ্কার করতে গিয়ে অনেক সময় নাক, ঠোঁট জ্বলত মরিচের ঝালে। কিন্তু মাগার ভর্তার ভাগ ছাড়তাম না। খাওয়ার তালে তখন নৌকা-লগি যে, কোথায় আছে কেউ খেয়ালই করতাম না। খাওয়ার শেষটুকু আরও মজাদার আরো রসনা-স্বাদ-সমৃদ্ধ!! কথায় বলে না –

          টক-ঝাল, লবনকটায় চড়তা,

                    তার নাম ভর্তা!

তাই তো, ভর্তার শেষটুকু খেতে কাড়াকাড়ি লাগতাম। কারণ, চুমুকে চুমুকেই স্বাদ। খাওয়া শেষ। তেঁতুলগুলায় ভাসা মরিচের বিচি অবশিষ্ট থাকত। তা  ছোট ছোট বুলে ভাগ করে নিতাম।  কারণ, এগুলো একটু একটু করে ‘চু-চু’ আওয়াজ তুলে চোখ বুঁজে টান দিতাম। কাঁদুনে-ঝাল। তাই বেশি করে খেতে পারতাম না। তাছাড়া, তাড়াতাড়ি শেষ  হলে তো খাওয়ার মজাই শেষ। তাই একটু একটু ফুড়ুৎ-ফুড়ুৎ করে চুমুকে-চুমুকে স্বাদ নিতাম। সবশেষে হাত, হাতের আঙ্গুলের ফাঁকফোকর চেটেপুটে খেতাম। আজোও সে স্বাদ অনুভবে জিহ্বে পানি আসে। ইস্ সি রে!  টক-ঝালে আর লবনকটায় সে কী স্বাদ! এখনকার বিয়ের বোরহানীর স্বাদও তার কাছে তুচ্ছ!!!!?

.

খাওয়ার শেষ, তবুও কাটে না ঝালের রেশ। নাক-মুখ-চোখের পানিতে একাকার। হু, হা করছি। দেখি লগি হরিপুরের কাছে আর নৌকা ভাওরখোলার দিকে। কী আর করা! বিচ্ছুরা টুপ করে ডুব মেরে লগি এনে নৌকায় ওঠে। লগি হাতে নিতাম বড়রা। বাড়ির কাছাকাছি যেতেই পিচ্চিদের হাতে লগি-বৈঠা দিতাম। লক্ষিমন্ত মেয়ে হয়ে নৌকার মাঝে চুপটি করে বসতাম। কারণ, মাইয়া হয়ে নৌকা চালাতাম বলে বকাঝকা, মারধরও কম খাই নি।

আজো শাপলা আছে। ফুলও ফোটে। তবে আগের মতো নেই। আমরাও আছি, তবে শৈশবে-কৈশোরে নেই। একেক জায়গায় একেকজনে আছি। কেউ আর বেঁচে নেই। বার্ধক্যে এসে তাঁদের শোকাবহ স্মৃতি আর জ্যোতির্ময় মধুর শৈশবকে স্মৃতিচারণায় জীবন্ত করে তুলছি। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছি। একটা সময় আসে মানুষ ব্যর্থ প্রেমের বিরহ-যন্ত্রণা ভুলে যায়। স্বজন মৃত্যুর শোক ভুলে যায়।  কিন্তু শৈশব-কৈশোরকে, শৈশবের সাথীদের স্মৃতি কোনক্রমেই ভুলতে পারে না। শৈশবের সেই স্মৃতিগুলো আজো কাঁদায়-হাসায়। বুকের ভেতরে একটা চিকন সুতোর মতো করে সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম ব্যথা অনুভূত হয়। তবুও কেন জানি আরাধ্য মনে হয় ব্যথাটা। হোক ব্যথা! তবুও জীবন!

পিয়ারা বেগম : কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক। বাংলাদেশ। 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments