শারমিন পাপিয়া: বিরহ দহন লাগে । অজয় দাশগুপ্ত

  •  
  •  
  •  
  •  

 587 views

সাধরণত: ছোটরা বড়দের জন্য শোকগাঁথা লিখবে এটাই নিয়ম। কিন্তু জীবন মৃত্যুর মধ্যে একটা বড় তফাৎ পৃথিবীতে আগমনের সিরিয়াল বলে একটি বিষয় আমরা জানি। যেমন বড় মেঝো সেজো বা ছোট । কিন্তু যাবার বেলায় কোন নিয়ম নাই। সে অনিয়মকে নিয়ম মেনে লিখতে হচ্ছে এই বেদনার গল্প। আমি কখনো ভাবিনি তাকে এভাবে বিদায় জানাতে হতে পারে। সাধারণে অনন্য অসাধারণ এই ভদ্রমহিলা ছিলেন আমার পরিচিত রবীন্দ্রনাথের গান পাগল একজন নারী যার প্রতি রক্তবিন্দুতে মিশে ছিলেন কবিগুরু। এমন নিষ্ঠা এমন আকুলতাকে যদি প্রেম না বলি তো আর কাকে প্রেম বলবো?

সিডনি’র বাঙালিদের নিজস্ব একটা জগত  আছে। দূরদেশে দেশ ও সংস্কৃতির টান নাড়ীর টানে বাঁধা, অপ্রতিরোধ্য। সে সূত্রেই তার সাথে পরিচয়। প্রথম দেখা সম্ভবত একুশে বইমেলায়।সিডনির এই বইমেলাটি নতুন বইয়ের ঘ্রাণ পার্কের অসাধারণ ফুল পাতা ও কলকাকলি মুখর অনুষ্ঠানে জমজমাট। তাদের দলের হয়ে গান করতেন মঞ্চে।
টুকটাক  আলাপে বুঝে নিয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথ ভর করে আছে তার মগজে। সারাদিন বেলা অবেলায় নিজে নিজে গানের ভেলা ভাসিয়ে চলা প্রবাসী গৃহবধূ তখন রবীন্দ্রপ্রেমে নিমগ্ন।গানের যেটুকু ব্যাকরণ ও সুর তাল লয় তা শেখার জন্য ছিলো পাগল। বন্ধু ডঃ মনজুর হামিদ কচি ও  আমরা ততোদিনে গড়ে তুলেছি গানের দল “সুধা নির্ঝর”। নবীন প্রবীণে মিলে গড়ে ওঠা এই দলে যোগ দিলেন তিনি। গান শিখলেন গান গাইলেন। নিজে গাওয়ার পাশাপাশি অন্যদের দিয়ে গাওয়ানোর জন্য এমন ব্যাকুল গায়িকা কম দেখেছি আমি। কোথায় রিহার্সাল হবে কে জায়গা দেবে?  এসব তর্ক তুড়ি মেরে উড়িয়ে তাদের বাড়ীতেই হতো সব। দিনের পর দিন রাতের পর রাত চলতো গান কবিতা ও আড্ডা। বলাবাহুল্য গ্রন্থনা ও কবিতা পর্বের দায়িত্ব নিতে হতো আমাকে। সে বাড়ীর নীরিহ কর্তা বাবু ভাই কী গভীর ভালোবাসতেন তার এই গানপাগল পত্নীকে। ভোর রাতে কাজে বেরুবেন আর আমাদের রিহার্সাল শেষ হচ্ছে রাত একটায়, তারপরও হাসি মুখ।

ছবি: শান্তিনিকেতনে শারমিন পাপিয়া।

আমি যে চা পান না করলে কিছু করতে পারি না সেটা জানতেন বলে তার একমাত্র মেয়েটিকে ইশারা করতেন মাঝে মাঝে। সাথে সাথে চা হাজির হয়ে যেতো। কন্যাতুল্য তাশফিয়ার জন্য  আজ বারবার চোখ ভিজে যাচ্ছে আমার। এমন ঘরোয়া গানের আসর আর সিডনি ভিত্তিক অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে উনি কিন্তু তৈরী হচ্ছিলেন। তার মাথায় যে গানের জন্য রবীন্দ্রনাথকে জানার জন্য এমন সব পরিকল্পনা খেলছে বুঝে উঠতে পারি নি। একদিন সবাইকে চমকে দিয়ে জানালো রবীন্দ্রনাথকে জানতে রবীন্দ্র সঙ্গীত শিখতে শান্তি নিকেতনে যাবেন। অনেকে ভেবেছিলেন এ নিছক পাগলামি। বলছে বটে পারবে না। সত্যি সত্যি স্বামী ও কন্যাকে রেখে চলে গেলেন ঢাকায়।
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সাথে যোগাযোগ করে তাঁর কাছে গান শিখে সোজা শান্তিনিকেতনে। যে কয়েক বছর শান্তিনিকেতনে ছিলেন নিয়মিত যোগাযোগ ছিলো আমাদের। প্রতি মুহূর্তে টের পেতাম কেমন করে কতোটা নিমজ্জিত হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথে।

ফেরার পর পরিশীলিত এক গায়িকাকে পেলাম আমরা। ততোদিনে আমাদের বয়স বিদেশে বাঙালি মেধা ও তারুণ্যের বাংলা সংকটে সুধা নির্ঝর অদৃশ্য প্রায়। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। নিজেই গড়ে তুললেন গানের দল। সে দলেও ডাক পড়তো আমার। কথা বলা কবিতা পাঠ বললেও শেষ পর্যন্ত গান গাইতেই হতো। তার বদ্ধমূল ধারণা ছিলো, আমি গাইতে পারি, গাইতে জানি। অনেক সময় অপ্রস্তুত বোধ করলেও তাকে এড়াতে পারিনি।

রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কতো সব পরিকল্পনা কতো ধারণা। মাঝে মাঝে ভুলে যেতেন আমরা বসবাস করি বাংলাদেশ ও বাংলাভাষা থেকে অনেক দূরের এক ভিন দেশে।
ক’ দিন আগে জেনেছিলাম জরায়ুর রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আছেন, আই সি ইউ তে। করোনার কারণে যাওয়া হয় নি। দেখাও হয় নি। অচেতন থেকে চেতনায় ফিরে এক সকালে চির চৈতন্যের দেশে পাড়ি দিয়েছেন পাপিয়া ভাবী।

সৌজন্যবশতঃ ভাবী ডাকতাম বটে মূলত স্নেহ আর ভালোবাসায় এক ধরণের অসমবয়সী বন্ধু ছিলাম আমরা।
শারমিন পাপিয়া রবীন্দ্রনাথ কখনো আপনাকে ফেরাবে না। তিনি তাঁর সেই গানের মতো অপেক্ষা করছেন,
তুমি হবে চিরসাথী
লও লও হে ক্রোড় পাতি
সমুখের পথে জ্বলিবে জ্যোতি ধ্রুব তারকার..

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, জীবন বলে আমি তোমার মরণ তরী বাই। বাইতে বাইতে একদিন জীবন পৌঁছে যায়। তাঁর গুরুদেবের সেই অনন্তলোকে। হয়তো সেখানেই বিশ্বপিতার দরবারে তুচ্ছ মাটির মৃত্তিকা হয়ে গান শোনাবেন তিনি।
অনন্ত যাত্রায়  আপনাকে প্রণাম শারমিন পাপিয়া।

অজয় দাশগুপ্ত
কবি, কলামিস্ট
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments