শিল্প সারথী সুজিত মোস্তফা ও মুনমুন আহমেদ -দীপংকর গৌতম

  •  
  •  
  •  
  •  
সাক্ষাৎকার গ্রহনে দীপংকর গৌতম

গৌরচন্দ্রিকা:
সংগীতের সংজ্ঞা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়,কারণ আমরা যে ধরণের গানই করিনা কেন তা সংগীত বিষয়ের আওতাভুক্ত ,এর একটা নির্দ্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকতেই হবে এবং তা আছেও। গীত,বাদ্য ও নৃত্যূ – এই তিনটিকে একত্রে সংগীত বলে। সংস্কৃত ভাষায় প্রণীত গ্রন্থাদি থেকে পাওয়া যে সংজ্ঞাটি অনুবাদ করে বাংলাটি দাঁড় করানো হয়েছে সেটি হলো গীতং বাদ্যং তথা নৃত্যং ত্রয়ং সঙ্গীতমুচ্যতে।ভাষার সামান্য হের ফের করে এর অন্যবিধ রূপও আছে,যেমন”গীতং বাদ্যং তথা নৃত্যং ত্রিভি: সঙ্গীত মুচ্যতে”। গীতং বাদ্যং তথা নৃত্যং সঙ্গীতমুচতেএবং গীতবাদিত্র নৃত্যানাং ত্রয়ং সঙ্গীতমুচ্যতে এই রকম আরও।তবে অর্থবিচারে সবগুলোই অভিন্ন।
নৃত্য,গীত এবং বাদ্যের সমন্বয়কে সঙ্গীত বলে। তার মানে সঙ্গীত নৃত্য থেকে দূরের কেউ নয়। দূরের কিছু নয়। একদম আপন খুব কাছের । দেবরাজ ইন্দ্র নিজেই নৃত্যচর্চা করতেন। অথর্ববেদে কণ্ঠ, যন্ত্রসংগীত ও নৃত্যের উল্লেখ রয়েছে। প্রাচ্য নৃত্যকলায় ‘মার্গীয়’ ও ‘লোক’ধারার সূত্রপাত ঘটে সামবেদ থেকে। সামবেদে নৃত্যকে ‘মার্গীয়’ ও ‘দেশী’ দুই ভাগে বিভক্তের পাশাপাশি গানের কথাও বলা হয়েছে। প্রাচ্যনৃত্যের লিখিত ইতিহাস হিসেবে ভারতীয় পুরাণ বাল্মীকি প্রণীত ‘রামায়ণ’ ও ব্যাসবেদ সংকলিত ‘মহাভারত’কে বিবেচনা করা যেতে পারে। উভয় পুরাণে উপমহাদেশে নৃত্যচর্চার ধারা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে শাস্ত্রীয় ও লোকনৃত্যকে। ‘মহাভারত’-এ বিশ্বামিত্রের জন্য স্বর্গ থেকে উর্বশী ও মেনকা পৃথিবীতে আসেন। এমনকি অর্জুনের জন্য ঘৃতাচি, মেনকা, রম্ভা, স্বয়মপ্রভা, উর্বশী ও মিশ্রকেশী নৃত্য পরিবেশন করতেন। অপ্সরাদের নৃত্য পরিবেশনের জন্য সুনির্দিষ্ট নর্তনশালা ছিল। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে পাণিনী রচিত অষ্টাধ্যায়ীতে ‘পারাশর্যশিলালিভ্যাং ভিক্ষানটসূত্রয়োঃ’-এ প্রাচীন নৃত্যগীতির প্রমাণ মেলে। একইভাবে নট ও নটীর শরীরী অভিনয়, সংগীত ও নৃত্যের কথা বলা হয়েছে কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ এ।

আর বাৎসায়নের ‘কামসূত্র’-এ প্রাচীন ভারতীয় নৃত্য, গীত ও বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখসহ ৬৪টি কলার কথা বলা হয়েছে, এর মধ্যে কমপক্ষে আটটি কলা সংগীত ও নৃত্যের সঙ্গে যুক্ত। আর আদিবাসী সাঁওতাল ও মনিপুরীদের বিশ্বাস নৃত্যের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর জন্ম। সঙ্গীত নৃত্যের এই জন্মগত সম্পর্কের আলোচনায় আমরা এবারে এক শিল্পী দম্পতির জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের কথা শুনেছি তারা দু’জনই আমাদের দেশবরেন্য শিল্পী। একজন সঙ্গীত শিল্পী সুজিত মোস্তফা অন্যজন নৃত্যশিল্পী মুনমুন আহমেদ।

ভুতের গলির ৬৫ নম্বর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ফোন দেই। ভরাট কণ্ঠের মোহনীয় আওয়াজ ভেসে আসে কানে। ঠিক ১১ টায় আসবে কিন্তু। তখনও তিনি জানেননি আমি তার বাসার সামনে। ঠিক সময়ে গিয়ে দেখলাম বাসার দরোজা খোলা। দরোজার সাথে বিশাল একটা ছবি শ্রদ্ধেয় শিক্ষক,কবি ,গীতিকার প্রয়াত আবু হেনা মোস্তফা কামালের। দেখতে দেখতে তার ছবি কবিতা সহ অনেক গান কবিতা মগজের কোষে ভিড় করতে থাকে। আর একটু এগিয়ে যেতে গান ঘর। সেখানে আরো একটা ছবি। গানর ঘরে দাঁড়িয়ে ছবিটা দেখতে দেখতে ঘরে ঢুকলেন দেশবরেন্য শিল্পী দম্পতি। সুজিত মোস্তফা,মুনমুন আহমেদ আসলেন। জমে উঠলো আড্ডা ও শিল্পের বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে আলোচনা।

সুজিত মোস্তফা:
আপাদমস্তক শিল্পী। শুধু গানই গান তা নয়। গান, ভোকাল টিউনিং সব বিষয় নিয়ে তিনি অনেক পড়াশুনা করেন। তার গান ঘরে বসেই ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা দেন তিনি। তার বসার আসনের সামনে একটা সুন্দর হারমোনিয়াম, পাশে ল্যাপটপ নিয়ে স্বয়ং সম্পূর্ণ থাকেন তিনি। তার কাছে তার গানের রাজ্যে ঢোকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, খুব ছোট বেলার কথা। আমরা যখন পাবনা শহরে, বাবা লন্ডনে পড়াশোনায় মগ্ন আমি মাত্র ক্লাস ওয়ানের ছাত্র পাবনা পুলিশ লাইন স্কুলের, তখন আমাদের বাসার অদূরে বাণী সিনেমা হলে বাজতো চলচ্চিত্রের নানান ধরনের গান। কথা বুঝতাম না, বোঝার কথাও না তবে সুর আমাকে পাগল করে দিতো। সে এক রুচি বিকাশের পর্যায় ছিল। এসব সুর যে আমাকে শিল্পী বানিয়েছে তা নয়। তবে মানুষের অনুপ্রেরণা পর্বের একটা বিষয়তো থাকে। এছাড়াও জীবনের বহু বাঁক বদল , নীরিক্ষা আমার শিল্প সত্তাকে জোরালো করেছে বলা যায়। যেন আমি আমার ৬ বছর বয়সের কথা যদি বলি তখোন আমি বাসায় গীতবিতান দেখে তা পড়ে নিজের মতো করে গেতাম। এটাও জীবনের একটি অধ্যায়।এরপর আরেরকটি অধ্যায় হলো আমার মা’ছোট দু’ভাই বোনকে নিয়ে চলে গেলেন লন্ডনে বাবার কাছে। আমাকে রেখে গেলেন দেশে। বড় দু’বোন গেল পাবনাতেই নানীর বাসায়। আমি রাজশাহীতে চাচার বাসায়। আমার চাচা ছিলেন অত্যন্ত গুণীজন আবুল হায়াত মোহাম্মদ কামাল। তিনি ছিলেন রাজশাহী বেতারের প্রোগ্রাম প্রোডিউসার, চাচীও সেখানে চাকুরীরত। ফলে বেতার ভবনে আমার ঘন ঘন যাওয়া আসা হতো। রাজশাহী বেতারের ভেতরটা দেখতে ছিলো অপার সুন্দর। ওখানকার যন্ত্র-যন্ত্রী-গীতিকার-সুরকার-শিল্পী-সংগীত পরিচালক-কর্মকর্তা সবাই আমাকে আদর করতো। আমিও দেখলাম কি দারুন স্টুডিও,রেকডিং চলছে গান বাজছে। বাসায় চাচার গানের খাতা দেখে ইচ্ছেমতো সুর মেলাতাম। সব মিলিয়ে বলা যায় বিষয়গুলো আমাকে নানানভাবে প্রভাবিত করলো। তাদের কর্মপ্রক্রিয়া এবং আদরে আমিও প্রভাবিত হলাম।এখানেও আমার সংগীত রুচি তৈরীর আরেক পর্যায় চললো। তবে প্রথাগত সঙ্গীত শিক্ষার তালিম শুরু হয় ১৯৭২ সালে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা গানের স্কুল করা হলো। নাম ছিলো ‘সূর্য শিশু’ । শিক্ষক ছিলেন পন্ডিত হরিপদ দাস। এখানে রবীন্দ্রসংগীত গনসঙ্গীত শেখানো হতো।এরপর বন্ধু চয়ন ইসলামের বাসা থেকে হাতে ঘোরানো একটা রেকর্ডার নিয়েছিলাম। ফলে গান শোনা আরো সহজ হয়ে গেল। বয়সে ছোট হলেও আমি ১৯৭২ সাল থেকে বেতারে গান শুরু করি।মূখ্য বলার বিষয়টি হলো ভালো গান শোনার আবহ ছাড়াও বাসা থেকে চাপ ছিল রুচিশীল গান শুনবার। নবম-দশম শ্রেণীর ছাত্র হিসেবে যখন উচ্চাঙ্গ সংগীত ও নজরুল সংগীত নিয়ে পড়লাম আমি সংগীতে অন্যতর আনন্দের স্বাদ খুঁজে পেলাম। ১৯৭৪ সালে আমরা চলে এলাম চট্টগ্রামে। মা আমার গান শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন সঙ্গীতজ্ঞ মিহির লালার কাছে। বাবা লন্ডন থেকে ততোদিনে নিয়ে এসেছিলেন একটা স্টেরিওফোনিক গ্রামোফোন সেট এবং বেশ কিছু লং পে­ রেকর্ড। এর মধ্যে মনে আছে পেটুলা ক্লার্ক, টম জোনস আর ক্লিফ রিচার্ডের কথা।

শিল্পী দম্পতি সুজিত মোস্তফা ও মুনমুন আহমেদ

ইংরেজী ভাষায় গান, বিটস, মিউজিকের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা, কথা টথা কিছুই বুঝিনা কিন্তু পেটুলা ক্লার্কের দ্য আদার মেন’স গ্র্রাস ইজ অলওয়েজ গ্রীণার বা টম জোনসের ডেলায়লা আমার মাথা খারাপ করে দিতো। অর্থাৎ ঐ উচ্চাঙ্গ ও ভারতীয় সুগম সংগীত এবং নজরুল সংগীত রুচি তৈরী হওয়ার সময়ই আমি বুঝলাম ভালো কিছু ভালো লাগার কোন বিধিবদ্ধ নিয়ম বা আইন নেই। যাইহোক এরপর ১৯৭৮ সালে আসলাম ঢাকায়। ১৯৭৯ সালে ছায়ানটে ভর্তি হলাম। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে পেলাম মিথুন দে, ফুল মোহম্মদ, অঞ্জলী রায়, সোহরাব হোসেনকে। ছায়ানটে তখন দেশের কয়েকজন শ্রেষ্ঠ নজরুল সংগীত শিল্পীর পদচারণা। ১৯৮৬ সালে শান্তিনিকেতন। ১৯৮৭ সালে দিল্লীর শ্রীরাম ভারতীয় কলা কেন্দ্রে। এরপর ১৯৯৩-৯৪ সালে গন্ধর্ব্য মহাবিদ্যালয়ে পন্ডিত বিনোদ কুমারের কাছে খেয়াল – ঠুমরী। জীবনের প্রতি পরতে পরতে শিখতে চেয়েছি। এখনও শিখছি। বিশেষত আমরা সুজিত মোস্তফার সুরের প্রসঙ্গ আনলে একটা বিষয় পরিস্কার করে দেখি। প্রত্যেকটি অঞ্চলের নিজস্ব একটা ভাষা আছে এবং ভূপ্রকৃতিগত অবস্থান অনুযায়ী তার সুর আছে। সে সুরের প্রভাব বর্ননাকরলে আমরা রূপ বৈচিত্র্যের যে বিষয়টি পরিস্কার করে দেখতে পারি তার জীবনের অভিজ্ঞতা ও সুর বৈচিত্র্যের অবকাঠামো। যেমন তিনি পাবনায় সময় কাটিয়েছেন,একইভাবে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ঢাকা তারপরে শান্তিনিকেতন ,দিল্লী। অর্থাৎ এসব অঞ্চলের লোক ঐতিহ্য বা সুরের টানের কথা বাদ দিলেও ভুপ্রকৃতিগত অবস্থান অনুযায়ী ভাষার সুরের যে বৈচিত্র্য রসে তিনি নিষিক্ত সেটা একদম ভিন্ন। অনেক কথার পরে আমি আবার জিজ্ঞেস করি মূলত, শিল্প সম্বন্ধে আপনার দর্শনটা কেমন?
তিনি বলেন, শিল্প থেকে ব্যাকরন সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য শিল্পের প্রকাশকে সুন্দর ও প্রানবন্ত করে তোলা। শিল্প প্রকাশের মধ্য দিযে শিল্পী তার সৃষ্ট আনন্দকে ছড়িয়ে দিতে চায়। আপনি শিল্পকে বেশী ব্যাকরণ দিয়ে প্রকাশ করতে গেলে শিল্পের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। তাই শিল্পের প্রকাশ আমাদের সুন্দর ভাবনার ভেতরে থাকতে হবে। শিল্প সৃষ্টি না হরে মানুষের মনোজগতে প্রবেশ করা সম্ভব না। সুরের শুদ্ধতা নিয়ে কিছু বলুন, শুদ্ধ সুরের চেয়েও দরকার শিল্পের শুদ্ধতা। তা না থাকলে শিল্প অর্থহীন হয়ে যায়। আপনার গানে আপনি ফর্মের অনেক ভাঙচুর করেন, এটা কেন? তিনি হেসে জবাব দেন আসালে ফর্ম জানলে ফর্ম ভাঙা যায়। ফর্ম যদি নাই ভাঙা যাবে তাহলে একজন শিল্পী নিজস্বতা কি করে গড়ে উঠবে। আমার গান অন্ধকারেও সবাই বুঝবে-এটা কার গান। শিল্পে ফর্ম ভাঙার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। রীতিসিদ্ধ বিষয় ভাঙার মধ্যেই আপন সৃষ্টির মহিমার প্রকাশ ঘটে। শিল্পের ভেতরে তিনটি কবিতা থাকে, ১. দৃশ্য কবিতা ২. অন্তর্গত কবিতা ৩. তৃতীয় কবিতা। গানে এগুলো ধারন করতে পারলে শিল্প সৃষ্টি সহজ হবে শিল্পীও বড় হবে। তখন ফর্ম তার হাতেই তৈরি হবে। এটাইতে শিল্পের আনন্দ। আমি আবার জিজ্ঞেস করি, দেশ বা দেশের বাইরের বড় বড় ওস্তাদদের সংস্পর্শে আপনি গিয়েছেন, তাদের দীক্ষা নিয়েছেন তার পরও আমাদের দেশে বড় শিল্পী তৈরী হতে সংকটটা কোথায়? তিনি একথায় বলেন, আমাদের দেশের গানের পরিবেশ, শিক্ষা,ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এ দেশে শিল্পী তৈরী হয় না।

সব কথার শেষে তার সঙ্গীত সাধনে মুনমুন আহমেদের ভুমিকা জানতে চাই। তিনি বলেন নিজে যেমন সমসাময়িক কালের বড় শিল্পী তেমনি আমাকেও তিনি প্রভাবিত করেন প্রবল ভাবে। এত সহায়ক সঙ্গী না থাকলে বড় কাজ হয়? আমার কাজে তার সাপোর্ট বিশাল। শুধু সাপোর্ট কেন? নিয়মিত রেয়াজের তাড়া, এ্যালবাম বের করতে চাপ, সবকিছু মিলিয়ে বলা যায় মুনমুন চায়, আমি অনেক বড় হই। অনেক বড় কাজ করি।
ঢাকায় আমরা যারা নজরুল গাই প্রত্যেকের তখন চেষ্টা কে কতভাবে অন্যজনকে ছাড়িয়ে যাবো। তখন এত শুদ্ধতা, অশুদ্ধতা বা আদি রেকর্ড বা স্বরলিপির প্রশ্ন আসেনি। একই গানের হয়তো ভিন্ন সুর বা ভেরিয়েশনের কমবেশি পাচ্ছি সেগুলো নিয়েও আমাদের মাথাব্যথা ছিলনা। কারণ আমরা ব্যস্ত ছিলাম অসাধারণ সব শিল্পীর কণ্ঠে নজরুলের গানের অসাধারণ মনোমুগ্ধকর সব চিত্রায়ন শুনতে।
এরপর শুরু হলো বাংলাদেশে আদি রেকর্ড, স্বরলিপি এবং শুদ্ধ সুরে গাইবার জন্য এক ব্যাপক আন্দোলন। এই আন্দোলনের সময়ে সবচেয়ে যে বড় ভুলগুলো হলো সেগুলো হলো এইসমস্ত বড় শিল্পীকে আমরা স্বসম্মানে তাদের অবদানের স্বীকৃতি না দিয়ে এবং তাদের সবিনয় অনুরোধ করে হাতে মূল গানগুলো পৌঁছে না দিয়ে অত্যন্ত অসন্তোষে তাদের নজরুলের গান থেকে সরিয়ে দিতে তৎপর হলাম।

শিল্পী হচ্ছে শিল্প প্রকাশের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। শিল্পীদের যখন ভয় দেখানো হলো, অসম্মান করা হলো তাঁরা মান বাঁচাতে নজরুলের গান গাওয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিলেন ক্রমশ। আমি একদম সর্বশেষ উদাহরণটি দেই। অজয় চক্রবর্তী নজরুলের বেশ কয়েকটি গান গেয়েছেন, প্রতিটিই সুর মাধুর্য এবং হৃদয়হরণে অনবদ্য। অথচ ওঁর গাওয়া নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করায় উনি ঘোষণা দিয়েছেন যে উনি আর নজরুলের গান গাইবেন না।
এখন অজয় গাইবেন না কিন্তু অপারঙ্গম সুর ও প্রাণহীন শিল্পী শুধু স্বরলিপির দোহাই দিয়ে নজরুলের গান গেয়ে দেবেন, শ্রোতা নেবে? এইখানেই শুরু হল নজরুলের জনপ্রিয়তায় ভাটা। আমি কোনসময়ই আদি সুর বা রেকর্ডের বিরুদ্ধাচারণ করিনা কিন্তু কিছু পদ্ধতি আমার বিভিন্ন লেখায় এই সমস্যাগুলো সমাধানকল্পে উলে­খ করেছি। কারো ঘুম ভেঙেছে বলে মনে হয়না।
যারা নজরুল গাইছেন তারা প্রতি অনুষ্ঠান, আলোচনা, সেমিনার, সকল জায়গায় একই কথা বলে যাচ্ছেন- আদি সুর, আদি রেকর্ড, স্বরলিপি ইত্যাদি। আচ্ছা, আমরা কি এইসব কথা শুনতে গানের অনুষ্ঠানে কান পাতি না ভালো গান শুনে প্রাণ মন জুড়াতে চাই?
আমাদের উচিৎ এখনো সময় আছে একটি সর্বজন স্বীকৃত গ্রহণযোগ্য উদার নীতিমালা তৈরী করে সকল মানসম্পন্ন শিল্পীদের স্বসম্মানে নজরুলের গান গাইতে আবারো আহ্বান করা। নতুবা এই বিষয়টা কয়েকজন ব্যকরণবিদ, গবেষক, প্রশিক্ষক এবং অবুঝ কর্তাব্যক্তির নিজস্ব সম্পত্তির মত থেকে একসময় মৃদু একটি দীপশিখার মত হয়ে যাবে। এমনকি দীপশিখাটি নিভে যাওয়ার আশঙ্কা যদি করি সেটিও উড়িয়ে দেয়া যাবে না।

মুনমুন আহমেদ:
আমাদের দেশের নৃত্যাঙ্গনের হাতে গোনা যে কয়েকজন তাদের মেধা, শ্রম দিয়ে নিজস্ব জগত গড়ে তুলেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম মুনমুন আহমেদ। নৃত্যের বহু শাখা-প্রশাখায় তিনি বিচরণ করলেও,কথক নৃত্যে তার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচয় ছাপিয়ে গিয়েছে। দেশের প্রথিতযশা এই শিল্পী নৃত্যের প্রতিভাবান নৃত্যশিল্পী হিসাবে তার খ্যাতি অর্জন করেছে। মুনমুন আহমেদের জন্ম ঢাকার আজিমপুরে । তার বাবার নাম রফি আহমেদ বিদ্যুৎ, মা সালেহা বেগম।
অসাধারণ নান্দনিক চিন্তাভাবনা ও সৌন্দর্য্যরে অধিকারী মুনমুন আহমেদ তার নৃত্যশৈলীর মাধ্যমে দেশের শিল্পরসিকদের মধ্যে তার জায়গা করে নিয়েছেন। বহুমাত্রিক শিল্পী হিসাবে তার পরিচিতি একদম আলাদা। তিনি একাধারে নৃত্যশিল্পী, কোরিওগ্রাফার, নৃত্য নির্দেশক এবং শিক্ষক। মাঝেমধ্যে তাকে অভিনয় করতেও দেখা যায়।
মুনমুন আহমেদ বাংলা ভাষার খ্যাতিমান কবি, গীতিকার, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামালের পুত্রবধু; বিশিষ্ট নজরুল সংগীত শিল্পী সুজিত মোস্তফার স্ত্রী। তাদের একমাত্র কন্যা অপরাজিতা মোস্তফা একজন কত্থকশিল্পী। মুনমুন আহমেদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন তার নৃত্যশিল্পী হওয়ার পেছনের কথা। এর জন্য তার মায়ের ইচ্ছা ছিলো সবচে বেশী। তিনি বলেন, তার মা অত্যন্ত গুণী ব্যক্তি ছিলেন।ছিলেন সেলাই শিল্পী। সবচেয়ে বড়কথা হলো তার শিল্পিত একটা মন ছিলো। যেখান থেকে তিনি চাইতেন তার মেয়ে শিল্প জগতের সাথে যুক্ত থাক। তিনি সেলাইয়ের মাধ্যমে তার শিল্প চিন্তাকে তুলে ধরতেন। তার সূচি কর্মের শিল্পকলা এতোটাই মান সম্পন্ন ছিলো যে, আড়ং তখন তার কাছ থেকে কাজ নিয়ে আসতো। সেই শিল্পী মা তাকে নাচের স্কুলে দিলেও মুনমুন আহমেদের শিল্পী-জীবনের সূচনা হয়েছিল গান শেখার মাধ্যমে। কৈশোরে তিনি উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নিতেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট সংগীতগুরু আখতার সাদমানীর মতো বিশাল সঙ্গীতজ্ঞের কাছে। কিন্তু কিশোরী মুনমুন আহমেদ ছিলেন চঞ্চল স্বভাবের, মন বসত না হারমোনিয়ামে। তবু বাবা-মায়ের চেষ্টার কমতি ছিল না। তবে এখনও তার মনের গভীরের রেখাপাত করে আছে যে ঘটনাটি সেটাকে তিনি বললেন , একদিন সংগীতশিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদ তাকে বলেছিলেন ‘গান গাইতে গিয়ে এত ছটফট কর কেন? গান ভালো না লাগলে ওটা বাদ রেখে নাচ শিখলেই পার।’ নাচের এই কথাটি তার মগজে গেঁথে যায়।
এবং এ কথাটি যেন পুষ্পের মতো ফুটে যায়। বাঁক বদলে যায় তার জীবনের । তিনি নাচ শিখতে শুরু করেন। নাচে তার হাতেখড়ি হয় ওস্তাদ আজহার আলী সাহেবের কাছে। তার অধীনে কিছুদিন তালিম নেওয়ার পর চলে আসেন নৃত্যগুরু হাবিবুল চৌধুরী ও সালেহা চৌধুরীর অধীনে। তাদের কাছে নাচের করণ-কৌশলগুলো দ্রুত শিখে নিয়েছিলেন মুনমুন। এক পর্যায়ে একান্তভাবে মনোনিবেশ করেন নিবিড়ভাবে নৃত্যচর্চায়। শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী হিসেবে (১৯৭৩ এবং ১৯৭৫) দু বছরই অর্জন করেন তার সর্বোত্তম স্বীকৃতি । পুরস্কার লাভ করেন বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে। এরপর নাচ শেখার আগ্রহ বেড়ে যায় , তখন নৃত্যের বিষয়টি তার কাছে বিস্ময়ে পরিনত হয। ঘরে- বাইরে ছড়িয়ে পড়ে তার পরিচয়। তখন কত্থক নাচের তালিম নেন বিশিষ্ট নৃত্যগুরু সৈয়দ আবুল কালামের কাছে। তিনি মুনমুন আহমেদকে কত্থক শেখার প্রতি বিশেষ আগ্রহী করে তোলেন। ততোদিনে মুনমুন আহমেদ একজন চৌকস পারফর্মার হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। ঢাকার বিভিন্ন মঞ্চে মুনমুন তার আভা ছড়াতে থাকে । তার একক নৃত্য প্রদর্শনী প্রশংসা কুড়ায়। এবং তিনি যেন শিল্পাঙ্গনকে জানান দেন তার আগমন বার্তা।
মুনমুন আহমেদের বাবা-মা মিরপুর থাকার কারনে ওখানেই চলে তার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা। তাও এইচএসসি পর্যন্ত। পরে বিএসসি কোর্সে ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)। তবে স্নাতক শেষ করতে পারেননি। তার আগেই ১৯৮৭ সালে পাড়ি জমান ভারতে। ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে নাচ শিখতে তিনি দিলি­ চলে যান । ভর্তি হন খ্যাতনামা শিল্পাঙ্গন শ্রীরাম ভারতীয় কলা কেন্দ্রে। তারপরে ভারতের কত্থক কেন্দ্র থেকে ১৯৯০ সালে তিনি উচ্চাঙ্গ নৃত্যে (কত্থক) সম্মান সহ ডিপ্লামা ডিগ্রী অর্জন করেন মুনমুন আহমেদ। ১৯৯২ সালে তিনি একই প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চাঙ্গ নৃত্যে সম্মানোত্তর পোস্ট ডিপ্লামা ডিগ্রী ও ১৯৯৩-১৯৯৪ সালে ফেলোশিপ লাভ করেন। এসময় যেসব বরেণ্য শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভ করেন তিনি তারা হলেন -নৃত্যশিল্পের কিংবদন্তী মহান কত্থক নৃত্যগুরু পন্ডিত বিরজু মহারাজ, পন্ডিত রাজকুমার শর্মা ও পন্ডিত রামমোহন মহারাজ। এছাড়া আমেরিকান ড্যান্স ফেস্টিভ্যাল ওয়ার্কশপ, ইন্টারন্যাশনাল ড্যান্স ফেস্টিভ্যাল ওয়ার্কশপে তিনি প্রশিক্ষণ নেন। আলোচনার এক পর্যায়ে তাকে জিজ্ঞেস করি, আপনি কি চান না, আপনার মতো কেউ তৈরি হোক। তিনি বলেন,মূলত নৃত্যের বিস্তারের জন্য আমি ১৯৯৩ সালে গড়ে তুলেছি রেওয়াজ পারফরমার্স স্কুল। এখানে অনেক শিক্ষার্থী বিশুদ্ধ কত্থক নাচের তালিম নিচ্ছে । একাধিক শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এরা যদি কেউ আমার মতো হয় হবে। মডার্ন ড্যান্সের প্রশ্নেও তার কথা পরিস্কার। তিনি বলেন নাচের বহুমাত্রা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি, দেখছি,আমার আগের যারা তারাও দেখেছে। তবে মূল বিষয় গ্রহন করা । আমার মনে হয় যে কোন নৃত্য শৈলীতে তার প্র্যাকটিস হলো মূলকথা। আমি বিশুদ্ধ শিল্প চর্চার পক্ষে। কোন ধরনের কলা নিয়ে নাক টিকানো অভ্যেস আমার নেই, তবে মডার্ন ড্যান্স দেখে মনে হয়েছে এর মধ্যে শিক্ষিত শিল্পী সংখ্যা আনুপাতিক হারে কম। গ্রামের নৃত্যের কথায় তিনি মুগ্ধ হয়ে বলেন ওই নৃত্যের সরলতাই বলে দেয় আমাদের শিল্পচিন্তার মৌলিক বিভাটা গ্রামে। এই নৃত্যতা বাজার অর্থনীতির ডামাডোলে বা স্যাটেলাইট প্রভাবে যাতে হারিয়ে না যায় সেটা খেয়াল রাখতে হবে।

আপনার মনে হয় নৃত্যশিল্পের সংকট কোথায়? তিনি বলেন , নৃত্য মূলত আমাদের রক্তে জড়ায়ুতে মিশে আছে।এটাকে তৈরী করাটা হলো আসল । কিন্তু শিল্প করতে গেলে সাধন-ভজনের বিষয়টা সবচে জরুরি। শুধু মাত্র দ্রুত শিল্পী হওয়ার সংকটের জন্য প্রতিবছর বিভিন্ন স্কুলে ,বা শিক্ষালয়ে হাজার হাজার শিল্পী ভর্তি হয়। কি বাস্তবে শিল্পী হয় বড়জোর দশজন। এর পেছনে যেমন দায়ী শিল্পের পরিবেশ তেমনি পৃষ্ঠপোষকতা। যেমন আমি সম্প্রতি শিলিগুড়িতে প্রোগ্রাম করেছি নৃত্যগুরু বিরজু মহারাজের ৮০ তম জন্মদিবসে। এখান থেকে বহু ছাত্র-ছাত্রী চায় আমার কাছে নাচ শিখতে। ওরা বাংলাদেশে আসতে চায়। কিন্তু ওদের দায়ভার আমি কিভাবে নেব? এটা একটা মৌলিক সংকট।
নিজের জীবনসঙ্গী সুজিত মোস্তফা তাকে কেমন সহযোগিতা করে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার নৃত্যের প্রসারতায় তিনি খুব খুশী হন। তার সাহচর্য না পেলে এত দেশ ঘুরে বা দেশের ভেতরে যে বৃত্ত গড়েছি এটা সম্ভব হতোনা। আমরা দুজনেই দুজনের কাজের ব্যাপারে খুব হেল্পফুল। আমাদের একমাত্র মেয়ে সেও সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত আবার কথক শিল্পীও। এই আমাদের সুখের সংসার। আপনার পরিকল্পনাগুলো বলবেন? তিনি বলেন নৃত্য শিল্পকে মানুষের কাছে নিয়ে যেতে চাই। এজন্য নৃত্যনাট্য করতে চাই। গ্রাম্য জীবনের সহজ-সরল আখ্যানগুলি যেন মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারি।এস এ গেমেসর উদ্বোধনী দিনে নাচোলের রানী নৃত্যনাট্যে আমার নৃত্য পরিচালনা নিশ্চয়ই দেখেছেন। পাশাপাশি অভিনয় করেছি ইলা মিত্রের চরিত্রেও। ‘সাতভাই চম্পা’ আমি করেছি। আরো অনেক কাজ করার চেষ্টা করছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে যতে চাই। কাজ করতে চাই বাংলাদেশের নৃত্য ঐতিহ্য নিয়ে।