শৈশব স্মৃতিচারণ: মাছ ধরার সুখস্মৃতি । পিয়ারা বেগম

  •  
  •  
  •  
  •  

 588 views

পিয়ারা বেগম

নিখাদ গ্রামীণ ধান্য সংস্কৃতির আদলে বেড়ে ওঠেছে আমার শৈশব। সবুজে-সবুজে ছাওয়া আমাদের মেঘনা অঞ্চল। গাছ-গাছালির মায়া-মমতায় জড়াজড়ি করে বেড়ে ওঠার মতোই আমিও প্রকৃতির আবহাওয়ায় বড় হয়েছি। বন-বাদাড়ে অবাধ্য শৈশব-কৈশোর মন টু টু করে ঘুরেফিরে এ গাছের বড়ই, ও গাছের বেতফল ইত্যাদি নিয়ে মহাব্যস্ত থাকতাম। আর মাছ ধরা? এটাও বাদ দিইনি। তাছাড়া, ধূলো-বালি, বৃষ্টিতে ভেজা, উঠোনে লুটোপুটি, আর কাদা-জলে মাখামাখিও কম করিনি। তার সাথে ছিল মায়ের মজাদার বকুনি! তবে হ্যাঁ, বকুনিঝকুনি যা পেতাম তার স্বাদ-আস্বাদন হার মানত এখনকার বিয়ের বোরহানিও। আরো ছিল ছোট ভাইজানের চোখ রাঙানো! সেটার স্বাদও ছিল লবন, টক-ঝালে চড়তা, স্বাদকারক ভর্তার মতো। যা এখন আর পাই না কোনটাই।
হ্যাঁ, আজ মাছ ধরার এমনি টানটান উত্তেজনার একটা ব্যতিক্রম অভিজ্ঞতার কথা লিখব।

তখন আমার বয়স সম্ভবত আট নয় বছর হবে হয়তো। আমাদের পুকুরে ভাদ্র মাসেই ঝাঁটাল গাছের ডালের,শাখা-প্রশাখা ফেলা হতো। যেমন তেতুলগাছ, শেওড়াগাছ, হিজলগাছের ডালপালা। এগুলোকে “জাক” বলা হতো। এতে পুকুরে তৈরি হতো মাছের অভয়াশ্রম। চারপাশ উঁচু পাড়ঘেরা পুকুর। পুকুরের চারপাড়েই আম গাছের পত্র-পল্লবের সুনিবিড় আচ্ছাদন ছিল মনোরম। আর ঘন দুর্বাঘাসও ছিল মখমলের বিছানার মতোই নরম। তাই পুকুরের গাছের সুশীতল ছায়ায় গ্রীষ্মের দাবদাহে অতিষ্ঠ মানুষ বিশ্রাম নিত।
পুকুরে বর্ষার পানি এবং মাছ ঢোকার জন্য নির্দিষ্ট পাড়ের কোন একটা স্থানে মাঝখানে কেটে নালা তৈরি করা হতো। এটা পুকুরের বাইরের পানি আর মাছ ঢোকার একমাত্র পথ ছিল। এটার এলাকাভিত্তিক নাম বিভিন্ন হতে পারে। তবে আমাদের মেঘনা অঞ্চলে “জান” বা “জোল” বলা হতো। যা জমিনের সাথে পুকুরের সংযোগ স্থাপন করেছে এই  “জান” বা জোল। এই কাটা অংশ দিয়ে বর্ষার শুরুতেই পানি ঢুকে পুকুরে। তবে ভরা বর্ষায় বা বন্যায় পুকুরের পাড় ডুবে যেত। আশ্বিন মাস থেকে বর্ষার পানি মরে যায়। আর পুকুরের পাড় জেগে ওঠে। ফলে মাছ নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে। তখনি “জান” দিয়ে মাছ পুকুরে ঢুকে ঝাঁটালো গাছের নীচে নিরাপদ আশ্রয় নেয়। সমস্ত চকের পানি নীচু অংশে এসে জমে। আর নানা পদের মাছও পানির সাথে “জানের” মুখে ডোবায় আশ্রয় নেয়। যেমন কই, শিং মাগুর, শোল, বোয়াল, রুই, কাতল, চিতল পাবদা, টেংরা, পুঁটি  মাছ। আর থাকত রকমারি গুড়া মাছ। “জান” – এ তখন প্রচুর পানি থাকে। চকের মাছ তাদের সুযোগ মত রাতে জান-এর পানির সাথে পুকুরে যেত। দিনেও যেত, মানুষের আনাগোনা কমে গেলে।
কার্তিকের এমনি দিনে পুকুরে কোপা বড়শি দিয়ে শোল মাছ ধরার একটা হিড়িক পড়ত। জীবিত বইচা মাছের পিঠে বড়শিগাঁথা ছিপ পুকুরে পানি সংলগ্ন মাটিতে কোপা হতো। বইচা মাছ পানিতে বড়শিগাঁথা অবস্থায় দৌঁড়াত। শোল মাছ তখন পুকুরে পাড়ঘেঁষে দলবেঁধে ভেসে বেড়াত। যেই না বইচা মাছের লাফালাফি দেখতে পেত, অমনি ক্ষুধার্ত শোল মাছ গপাগপ বইচাটাকে গিলে ফেলত। আর তখনি মাছের গলায় আটকে যেত বড়শি। শোলমাছের সে কী উথালপাতাল! আর ক্ষুদে মাছ শিকারীরাও ওৎ পেতে অপেক্ষায় থাকত। তারাও উথালপাতাল কম করেনি। রুদ্ধশ্বাসে দৌঁড়ে ফটাফট বড়শিগাঁথা ছিপে শোল মাছ উঠাত। পুকুর পাড়টা কাঁপিয়ে তুলত উল্লাস আর হৈ-হল্লোর করে! সে কী আনন্দ!
সমবয়সী চাচাত ভাই-বোন আর ভায়েস্তাদের সাথে কোপা বড়শিগাঁথা ছিপ দিয়ে শোল মাছ ধরার একটা শখ হলো আমারও।

কাঁটাওয়ালা কইমাছ।

এমনি একদিন বইচা মাছ দিয়ে কোপা বড়শিগাঁথা ছিপ পুকুরে ফেলেছি। আমি একা আম গাছের ছায়ায় বসে আছি। তখন পুকুরে মানুষ গোসল করছে। মানুষের আনাগোনায় শোল মাছ পাড়ের কাছাকাছি আসছে না। আমারও তর সইছিল না। প্রায় দুপুর হয়ে এল। শোল মাছও বড়শিতে ধরা পড়ছে না। মনটা খারাপ! তবে গাছের ছায়ায় শীতের ঈষদুষ্ণ আমেজটা একটু বেশি। তার ওপর শীতের হিমহিম বাতাস। ঘুমে আমার ঝিমুনি এসেছে। দুপুরের খাওয়ার কথা মনেই নেই। ঘুম কাটানোর জন্য আমি “জানের” কাছে গেলাম। সমস্ত জমিনে থিকথিক কাদাপানি। তবে কার্তিকের রোদও বেশ কড়া। শীতের আমেজ আর নেই। আমি জানের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে “জানের” পানিতে রকমারী মাছের সে কী দৌড়ঝাঁপ ! কার আগে কে যাবে? যেন প্রতিযোগিতা শুরু হলো। আর পানির ছিটাছিটির আওয়াজে আমি ভয়ে  “থ” মেরে দাঁড়িয়ে রইলাম। তখনো আমার নজরে পড়েনি জমিনের ওপরে কাদামাখা কইমাছের ছুটাছুটি। তবে মাছের চোখগুলোর লাল কর্ণিয়া তাক করে আমাকে দেখছে। যে আমি তাকালাম, অমনি দাঁড়টানা মাঝির মতো কইমাছগুলো কাখনা দিয়ে জোড়সে দৌঁড়াচ্ছে। তখনি এত্ত এত্ত কইমাছ একসাথে আমার নজরে এল। ইস্ সি রে, সে কী সৌভাগ্য! তা দেখে আমার চোখ তো ছানাবড়া! এত বড় বড় কইমাছ! আনন্দে আমার মাঝে আর আমি ছিলাম না। আবার হঠাৎ ভয়ও পেলাম। কারণ, গ্রামে প্রবাদ আছে, ভুতেরা মাছের রূপ ধরে আসে। মানুষ লোভে পড়ে মাছ ধরতে যায়। তখন ভুত ঘাড় মটকে রক্ত চুষে লাশ ফেলে চলে যায়। অমনি আমার বুকে ধুকপুকানি শুরু হলো। আমি চারদিকে ঘুমঘুম কুতকুতে চোখের কালো কর্ণিয়া ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকাচ্ছি। চারপাশে ভুতটুত আছে কী না? দেখি, ত্রিসীমানায় ভুতের ‘ভু’ও নেই, টুতের ‘টু’ও নেই। আছে কেবল বড় বড় বুকরাঙা কইমাছের একচেটিয়া রাজত্ব! কোথাও কাউকে দেখছি না। আমি একা। কী করব ভেবেও পাচ্ছি না। কইমাছ যে কাখনা দিয়ে কীভাবে দ্রুত দৌঁড়ায় এটা স্বচক্ষে না দেখলে বোঝো যেত না। আমি শেষ পর্যন্ত সাহস করে কাদামাখা কইমাছ ধরতে গেলাম। ও মা গো, কইমাছের সে কী দাপট? কাখনার কাটার এক ঝটকায় আমাকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ল! ঘাই খেয়ে, ও মাগো করে কেঁদে ওঠলাম! এই প্রথম কইমাছের কাটার ঘাই খেলাম! আর কইমাছ ধরা যে, এত কষ্ট, এটাও কোনদিন বুঝিনি। যতবার ধরতে যাই, আমার হাত কাখনার সূচাল কাটা দিয়ে ঝাপটায়ে সরিয়ে দেয়। ওরে বাপ রে! কইমাছের সে কী শক্তি! আমি কাঁটার ঝাপটার আঘাতে ‘ও’ “আহা” করছি বটে। তবে আবারো হাত দিয়ে ধরতে যাই। মনে হয় কই মাছের সর্বাঙ্গে কাটা। কিন্তু মন কী বোঝে? এবার দুহাত দিয়ে জাবরায়ে ধরছি। অমনি শিরদাঁড়ার শক্ত চোকা কাটার ঘাই লাগল আমার হাতের তালুতে! আমিও নাছোড়বান্দা। দুই হাত দিয়ে আবারো ঝাপটায়ে ধরছি। কাটার ঘাইকে ডেমকেয়ার। কিন্তু সমস্যা হলো, ধরা মাছ রাখি কোথায়? বুদ্ধি করে ফ্রকের কোরছে নিলাম। কই মাছ কী আর আমার আদর বোঝে? হায় রে কপাল! বেচারীরা ক’জনে মিলে বিদ্রোহ করছে। ফ্রক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে তোলপাড় করছে।
ফ্রকের ভারী কাপড় ছেদ করে কাঁটার ঘাই! ও মাগো! পেটে ঘাই ঢুকছে যেন ইনজেকশনে সিরিঞ্জের মত। যা হোক, হঠাৎ মাথায় আরেক বুদ্ধি এল। মাছগুলো একহাতে ফ্রক ধরে আমি একটু জায়গার কাদা সরায়ে গর্ত করলাম। ধরা মাছগুলো কোরছ থেকে গর্তে রাখলাম। কাদামাখা কইমাছ দৌঁড়ায়ে ধরছি আর গর্তে রাখছি। আবার ধরে নিয়ে এসে দেখি সাতটার মধ্যে পাঁচটাই নেই। কাখনা দিয়ে কানতায়ে গর্ত থেকে কোন দিকে যে গেল! আর এত তাড়াতাড়ি গেলই- বা  কীভাবে? ওগুলোকে খুঁজতে গিয়ে এসে দেখে গর্তে একটাও নেই!! আমার মাথায় হাত! ভয়ে বুকটা ধড়াস করে ওঠল! এ কী কান্ড!” ভুতের কবলেই পড়ছি না তো? ও বাবা গো! এগুলো মাছ নয়, এগুলো ভুতের রূপ ধরে ভূতের বিচ্ছু বাচ্চা! নতুবা কীভাবে কাখনায় ভর করে এত দ্রুত চলে যেতে পারল আরামসে? বুকে থুথু ছিটালাম। আল্লাহর নাম নিলাম! এতে একটু সাহস পেলাম। মাথায় এল নতুন বুদ্ধি। আমার পরনের ফ্রক খুলে ফেললাম। এখন মাছ ধরছি, আর ফ্রকের পুটলি তে  ঢুকাচ্ছি। বেশী হওয়াতে গিট দিয়ে বাঁধলাম। একহাতে ফ্রকের মাছের পোটলা ধরে রাখছি। আরেক হাতে মাছ ধরতে চেষ্টা করছি। দুই হাতেই পারি নাই, আর এক হাতে? মাছের চাইটানিতে আমার হাতে কাটার ঘায়ে রক্ত ভরে গেছে। আবার একটু পর পর মাথা ঘুরিয়ে দেখি। ভুত বেটা আমার ঘাড় মটকাতে আসছে কী না। ডানে-বামে চেয়ে শুরু করি আবার মাছ ধরা।
সেই মুহূর্তে আমার চাচাত ভাইয়ের ছেলে জজ এসে পড়েছে। ওকে দেখে  আমার ধরে যেন প্রাণ ফিরে এল। ও আমাকে মাছ ধরায় সব সময় সাহায্য করে! এত মাছ দেখে সে ফটাফট চোখের পলকে মাছগুলো লুঙ্গির কোরছে ভরে ফেলল। মাছ ধরায় সে পাক্কা। তবে, জজকে দেখেও ভয় পেয়েছিলাম। শুনেছি, ভুত তো মানুষের বেশ ধরেও আসে। তাই যাচাই করার জন্য বললাম, শোন না জজ। তুই আমাকে একটা চিমটি কাট। যদি ব্যথা পাই তবে বুঝব তুই  মানুষ। জজ একটু বিরক্ত হচ্ছে মনে হলো। কারণ, মাছ ধরায় ব্যাঘাত ঘটছে। এ সুযোগে কইমাছগুলো ছটরবটর করে জোলের পানিতে নেমে যাচ্ছে। তাই তাড়াহুড়োর মধ্যে চিমটিটা কেটে আবার মাছ ধরায় সে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। আর আমিও নিশ্চিন্ত হলাম। জজ আসলেই জজ ছিল, ভুত নয়।

মাছগুলো অধিকাংশই  ততোক্ষণে নিরাপদ জোনে চলে গেছে। আর আমরাও খোঁজাখুজি করে কয়েকটা টপাটপ ধরে নিলাম। অগত্যা ভায়েস্তা ফুফু মিলে মাছ নিয়ে পুকুরপাড় এলাম। আমি এক ঘন্টায় যা পেলাম জজ আধ ঘন্টায় তার দ্বিগুণ মাছ পেল। তবে আমি যা পেয়েছি তাতেই খুশি। ভাবছি, আগের মাছগুলো মনে হয় ভূতই ছিল। এ জন্যই চোখের পলকে উধাও হলো! জজকে দেখে হয় তো ভুত তার বিচ্ছু পোলাপানসহ পগারপার। যাক বাবা, ভুতের কবল থেকে বেঁচে এসেছি এটাই যথেষ্ট। (তখন ভুত আছে এটাই বিশ্বাস করতাম) ফ্রকে মাছের পোটলা নিয়ে বাড়িতে এলাম! সুপ্রিয় পাঠক! নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। তার ওপর হাফপ্যান্ট-ফ্রক কাদামাটিতে ল্যাপ্টে আছে। আর আমাকে?চেনার কোন উপায়ই ছিল না। চোখ দুটোই যা কাদামুক্ত ছিল। কইমাছের চাইট্যানিতে কাদাগোলা সমস্ত শরীর আমার ছ্যাঁড়াবেড়া অবস্থা ! বুঝতেই পারছেন। আমার মা তা দেখে! কী আর বলব? মায়ের বকুনি আর আদর একসাথে? আহা! সে মুহূর্তে কাটার আঘাতও ভুলে গেছি। মায়ের মায়া-মমতার কাছে কইমাছের কাটার ঘা তুচ্ছ!

মা গরম পানি দিয়ে ডলে-মলে সাবান দিয়ে কাদার দাগ ওঠাল বটে। ডলার চোটে কাটার ক্ষত স্থানের জ্বালাটা এখনো অনুভূতিকে নাড়া দেয়। তার চেয়ে আরো বেশি নাড়া দেয় মায়ের হাতের স্নেহের মায়াময় স্পর্শের যাদুকরী প্রলেপ! সেই স্মৃতি কী আর ভোলা যায়? স্মৃতিরা কখনো মরে না। যতক্ষণ না আমরা স্মৃতিভ্রষ্ট  হই। তাই আজ আমার জ্যোতির্ময় মধুর শৈশব স্মৃতির মাহেন্দ্রক্ষণের স্মৃতিচারণা আমার সুহৃদ পাঠকের সাথে শেয়ার করলাম। হয় তো আপনারাও কিছুক্ষণের জন্য অবচেতন মনে স্মৃতিরোমন্থনে আপ্লুত হচ্ছেন। ভালো থাকুন আপনারা। আর বেঁচে থাকুক আমাদের স্মৃতিরা। তবে আমার হৃদয়ের পলেস্তারাহীন ক্যানভাসে জমানো স্মৃতির ঢালি নিয়ে আবারো হাজির হবো! তাই আপনাদেরকেও নতুন স্মৃতিচারণায় শরীক হওয়ার সাদর আমন্ত্রণ জানিয়ে শেষ করছি। আসসালামু আলাইকুম।

পিয়ারা বেগম: কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments