সত্যটা আমি জানি, আমি বিচার পাব না – আলফা আরজু

  •  
  •  
  •  
  •  

সত্যকে মোকাবেলা করার শক্তি সবার একরকম থাকে না। আমারও নেই। আমি সত্যিটা জানি যে – আমার নয় মাসের কিংবা চতুর্থ-শ্রেণীতে পড়া কন্যা শিশুটি কিংবা আট বছরের পুত্রটি মাদ্রাসা/মন্দিরে/চার্চে/ঘরের কোণে- তাঁদেরই খুব কাছের-শ্রদ্ধার-প্রিয় মানুষদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হতে পারে।

এই সত্য আমি মেনেছি অনেক আগেই। কিন্তু এটা মোকাবেলা করার সাহস আমার নেই।

আমি কোনোভাবেই গতকালকের ধর্ষিত সেই নয় মাসের শিশুর (চাচা কর্তৃক ধর্ষণের শিকার শিশু – ২৭ জুনের The Daily Star এ প্রকাশিত খবর) মা’র জায়গায় নিজেকে ভাবতে পারি না। আমি দেখতে চাই না যে – আমারই পরিবারের কেউ না কেউ ধর্ষক ‘চাচা’কে বাঁচানোর জন্য – আমার শিশু সন্তানের পোষাককে দায়ী করছে। আমার নয় মাসের শিশু সন্তান যেহেতু “ন্যাংটা” ছিলো তাই তার চাচা “provoked” হয়েছে ও সেই শিশুকে ধর্ষণ করেছে। এই বলে পরিবারেরই একদল মানুষ “শিশু ধর্ষণ”-কে জায়েজ করার চেষ্টা করবে ও আমার শিশুকে ও আমাকে “কুলটা/বেশি বুঝে” খেতাব দিবে। আমাকে রাত-দিন অপদস্ত  করবে।

দুঃখিত, আমার এই অবস্থা মোকাবেলার সাহস নেই।

আসলেই আমার এই সাহসও নেই যে – আমি আমার আট বছরের কন্যাকে ঈদের দিন নতুন জামা পড়িয়ে-সাজিয়ে-গুজিয়ে পুতুল বানিয়ে আত্মীয়-প্রতিবেশীর বাড়িতে বেড়াতে পাঠিয়েছি (শেরপুরে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী ঈদের দিন ধর্ষিত- গুগলে সার্চ দিলেই – এই খবরও পেয়ে যাবেন)। আর আমার সেই শিশু পাশের ঘর থেকে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে আমার আঁচলের নিচে এসে বলবে “মা গো আমার পেশাবের রাস্তায় জ্বালাপোড়া করে। মাগো আমি মরে যাচ্ছি আর চিৎকার করতে করতে বলবে “মা, ওই মামায় আমার নীচে ব্যথা দিছে। তারপর সেই দৃশ্য দেখার সাহস আমার নেই।”

সত্যি বলছি, আমার সেই সাহস নেই যে আমি আমার সন্তানকে খুব বিশ্বাস করে – বেহেস্তের দরজা খোলার চাবিকাঠি হিসেবে পুত্র সন্তানকে মাদ্রাসা/মসজিদে/মন্দিরে/চার্চে পাঠাবো ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য। আর আমার সন্তানকে তারই শ্রদ্ধার “হুজুর/ফাদার/স্যার” যৌন নির্যাতন করবে, ধর্ষণ করবে (বিগত কয়েক দিনের দৈনিক পত্রিকাগুলো খুঁজলেই দেখতে পাবেন – ডজন খানেক খবর মাদ্রাসায়/স্কুলের শিক্ষক দ্বারা ধর্ষণের শিকার”)। আমার ছোট্ট সন্তান কুঁকড়ে যাবে। তাঁর ভিতর-বাহিরের দুনিয়া এক হয়ে যাবে। তাঁর মুখ বন্ধ রাখার জন্য – আশেপাশের মুরুব্বীরা বিভিন্ন তরিকা নিয়ে হাজির হবেন। “সসুসশোস….শোষ…সো….চুপ থাক। এইসব কাউকে বলবি না। তোকে সবাই খারাপ বলবে।” দুঃখিত, যে শিশুকে তার শ্রদ্ধেয় “শিক্ষক/হুজুর/ফাদার/মামা/চাচা/স্যার” ধর্ষণ করলেন, যৌন নিপীড়ন করছেন- আপনি সেই নিপীড়ককে না শাসিয়ে আমার শিশু সন্তান যেই কিনা “ভিক্টিম” তাকেই চুপ থাকতে বলছেন!

সত্যি, আমি এটাও নিতে পারবো না।

আমার সন্তানের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া প্রতিটা অন্যায়-অবিচারের-নির্যাতন-নিপীড়ণের বিচার আমি চাইবো। কিন্তু, সত্যিটা আমি জানি। আমি বিচার পাবো না।

নুসরাতের মতো আমাকে সন্তানদের সহ কেরোসিন ঢেলে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারা হবে। সমাজ ও পরিবার আমাকে এক দিনও বাঁচতে দিবে না।

তাই আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। সত্যকে মেনে নিয়েছি কিন্তু সত্যকে মোকাবেলা করার সাহস ও শক্তি আমার নেই। আমার মতো আরও কেউ  থাকলে চলেন সবাই সত্য থেকে পালিয়ে যাই।

সত্য থেকে পালিয়ে হুলিয়ার জীবন বয়ে বেড়াই।

২৭ জুন, ২০১৯।

আলফা আরজু
সাংবাদিক, লেখক।
ক্যানবেরা, অস্ট্রেলিয়া।