সবুজের সমারোহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস । শিউলি আফসার

  •  
  •  
  •  
  •  

[শিউলি আফছার পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, কর্মসূত্রে বাসও করছেন একই ক্যাম্পাসে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার। কাজের পাশাপাশি সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর বিচরণ। কবি, গল্পকার, লেখক এবং বিতার্কিক।
প্রকাশিত গ্রন্থ: তস্তুরি বেগম (উপন্যাস); জল জোছনার গল্প (কবিতা), জলপাপড়ি (কবিতা); ব্যস্ত ঘুড্ডি ভো কাট্রি (রম্য প্রবন্ধ); সোহাগী (গল্প)। আমরা আনন্দিত তিনি প্রশান্তিকায় নিয়মিত লিখবেন বলে কথা দিয়েছেন। প্রকৃতি, নিসর্গ বা মা ও মাটি নিয়ে তিনি মূলত: লিখবেন বলেই আমরা তাঁর কলামের নাম দিয়েছি ‘ঝরা পাতার গল্প…’।]

এতো লম্বা একটি সময় ক্যাম্পাসের সবুজেরা আর কখনো পায়নি। আমার জানালার কাঁচ ভেদ করে বড় কড়ই গাছটা সবুজে সবুজে ভরে উঠেছে। ওদিকে চারুকলা প্রাঙ্গন দেখে চেনাই যায় না। অচিন কোনো বনে এসে পড়েছি যেনো। সাদা সাদা ফড়িং গুলো মলচত্বর একাকী উড়ে বেড়াচ্ছে। কী যে ভালো লাগলো!
গাড়ির কালো ধোঁয়া নেই। আঁকাশের পেঁজা তুলোর মতো মেঘ যেনো পাখিদের নিত্য ঘর।এই ভরদুপুরেও কোকিলের কুহু কুহু ডাক শুনতে পাই। বাণিজ্য অনুষদের দেয়ালের ওপারে স্যার পি,জে, হারটগ ইন্টারন্যাশনাল হলের পেছনে কদম গাছটায় কতো কতো কদম! বৃষ্টি হওয়ায় কদম গুলো যেনো ভেজা শনপাপড়! কলাভবনের মধুর ক্যান্টিনে যাওয়ার পথে বিশাল আম গাছটায় কোনো সময় এতো পাঁকা পাঁকা আম ঝুলে থাকতে দেখি নাই এর আগে। বড় বড় ঘাসের ভেতরে পাঁকা কিছু অংশ পাখিতে খাওয়া আম পাওয়া গেলো। আহা! কতো বছর পরে পাখি খাওয়া আম দু’চোখে দেখলাম! ফরমালিনের জ্বালায় কতটা দিন কোনো কেনা ফল পঁচতে দেখিনি। আচ্ছা মানুষের মূল্যবোধ পঁচে কেনো! এতে ফরমালিন দিয়ে কিছু একটা অবক্ষয় রোধ করা যায় না!মানুষ বড়ই দ্রুত প্রিয়! কখন খাই! কখন পাই জাতীয় অস্থিরতা তাকে পাগল করে তুলেছিল। কাচা আমের বাচ্চা কেউ গাছে রাখেনা! পাখিতে খাওয়ার সুযোগ কই! কে কাকে খেতে দেয়! সব জায়গায় গ্রাস! কী এক প্রতিযোগিতা! নদী গ্রাস! খাল গ্রাস! আম! সেতো নস্যি!

করোনার কারণে স্তব্ধ ক্যাম্পাস। কিন্তু মহাসমারোহে বেড়ে চলেছে সবুজায়ন। ছবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা চত্বর ও বিভিন্ন এলাকার দৃশ্য।

জিয়া হলের এই পরিত্যক্ত জায়গায় সব্জি চাষ হতো। ছাত্রদের দরকারে বিজয় ৭১ হল মাথা উঁচু করে অহংকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।করোনার থাবায় এর পথটায় সবুজ ফ্লোরা ফনার দেখা মিলল। আহ! কতদিন ব্যাঙের ছাতা দেখিনা! এই খানে চাষ হতো ফুলকপি, লালশাক, ডাটাশাক! আরো কতকি! কবি জসীমউদ্দিন হলের পাশে পুকুরে কলমি শাক আমি নিজে খেয়েছি।মানুষ বেড়েছে, প্রয়োজনে আবাসের টানে জমি কমেছে। আগেতো মাথা গোঁজা, তারপর বাগান করার শখ! পলাশী মোড় হতে সলিমুল্লাহ হলের সামনে দিয়ে রাস্তাটা সব সময় অন্যরকম লাগে। দুই পাড়ে বড়ো কড়ই গাছের সারি! রিকশা দিয়ে যাওয়ার সময় আকাশের পানে তাকালে আকাশটা অসাধারণ সবুজ সবুজ লাগে।একবার চাঁদের রাতে ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় আমার মনে হয়েছিল, আমি চাঁদের রাজার দেশে এসে পড়েছি। কোভিডের থাবা অনেক কিছুই কাবু করেছে কিন্তু সবুজকে গলা টিপে ধরতে পারেনি। সবুজকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে এই করোনা।

সকাল হতে সন্ধ্যা অবিরত পাখিদের কিচির মিচির শব্দ। আমি কান পেতে সেই শব্দ শুনি।আমার পছন্দের নিবিড় জায়গা হলো চারুকলার পেছনে পাচিলঘেষে ব্যাচেলর কোয়ার্টার! আহ! কি চমৎকার ছাতিম গাছটা! গাছের উপরে প্রায়ই দেখি দুটি শালিক বসে থাকে।এই করোনার ফলে ক্যাম্পাসের ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকে আদ্রতা যেনো ক্রমাগত আত্মীয় পরিজনকে মহামারীতে হারানোর বেদনা মনে করিয়ে দেয়।

এই ক্যাম্পাসে অসংখ্য বকুল ফুল গাছ। সজনে ডাটার গাছ। মাঝে দাঁতের ব্যথার উপশম হিসেবে বুঝে না বুঝে টোটকা হিসেবে সবুজ সজনে পাতা চায়ের মতো ফুটিয়ে কুলকুচি করি।হিজল গাছের প্রতি খুব টান! কদিন ধরে হিজল ফুল খুঁজছি। হালকা গোলাপি হিজল ফুল! করোনা না হলে মানুষ বোধহয় এতো দীর্ঘ সময়ের জন্য জানালা খুলে ঘাসের দিকে চেয়ে থাকত না। সবুজ কারো চোখকে ক্লান্ত করেনা।কেউ জানে না, কবে, কখন এই রোগের ভ্যাক্সিন আবিষ্কার হবে! জানিনা! চেস্টা চলছে! চেস্টা চলবে! সবুজের পানে চেয়ে চেয়ে যদি মনের হলুদ আশংকা আর কস্ট মলিন হয়! মন্দ কি!

প্রশান্তির আশায় পৃথিবী জুড়ে মানসিক জিঘাংসার যদি কিছুটা হ্রাস হয়, সেটাই বা কম কি! সবুজ কেমন করে মনকে যেনো আচ্ছন্ন করে রাখে! ঢাকা শহরে এতো ছোট ছোট বুনো ফুল আছে, করোনা না হলে চোখে পড়তো না।এই যা! প্রেমকাটায় ওড়না জড়িয়ে গেছে! থাক! না ছুটাই! কিছু ক্ষণ ব্যস্ততা ভুলে একাকী দাঁড়িয়েই থাকি! আমি দাঁড়িয়েই আছি।

২৮/০৬/২০২০।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।