সাদাত হোসাইনঃ চোখ সাহিত্য পুরস্কার -ড. শাখাওয়াৎ নয়ন

  •  
  •  
  •  
  •  

সাদাত হোসাইনঃ চোখ সাহিত্য পুরস্কার


ড. শাখাওয়াৎ নয়ন

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন এর ‘ চোখ সাহিত্য পুরস্কার ’ প্রাপ্তিতে, গত কয়েকদিন যাবৎ ফেইসবুক সমাজে তিনি অনেকেরই চক্ষুশূল হয়েছেন। বিশেষ করে যারা লেখালেখির সাথে যুক্ত কিন্তু অজনপ্রিয়, গতপ্রিয় (আগে জনপ্রিয় ছিল কিন্তু এখন নাই), তাদের অধিকাংশই নিন্দাবাদের উপাখ্যান রচনা করছেন। ভাবখানা এরকম যে, সাদাত হোসাইন পুরস্কার পেয়ে বিরাট অন্যায় করেছে। আমি একটুও অবাক হইনি। প্রতিবছর বাংলা একাডেমিসহ বিভিন্ন পুরস্কার প্রাপ্তদের নাম ঘোষিত হলেও, একই রকম সমালোচনার ঝড় বইতে দেখা যায়। এ বিষয়ে বলার আগে আরেকটি বিষয় মনে পড়ে গেল। কয়েক বছর আগে চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম, পনেরো-ষোল বছর বয়সী কয়েকজন ছেলে-মেয়ে কথা কাটাকাটি করতে করতে আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,
‘ভাইয়া, বাজারি লেখক মানে কি?’
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। ভাবছি, কী উত্তর দেয়া যায়? এরা নিশ্চয়ই এ বিষয়ে বড় ধরনের বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে আরেকজন বলল, ‘আপনি বলেন, যে লেখকরা নিজেদের বাজার নিজেরাই করে, তাদেরকে বাজারি লেখক বলে না?’
আমি বললাম, ‘না’। যাঁদের বাজারি লেখক বলা হয়, তাঁদের অনেক টাকা-পয়সা থাকে। তাঁদের বাজার করার লোক আছে। তাঁরা সেলিব্রেটি। বাজারে যাওয়ার সময় পান না।

কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা সাদাত হোসাইন

সাথে সাথে দু-তিনজন সমস্বরে বলে উঠল, ‘তাহলে বাজারি লেখকই ভাল। আমরা ওটাই হব’।
তাদের মধ্য থেকে একজন, যে সম্ভবত উক্ত বিতর্কে একটু চাপের মধ্যে আছে, সে বলল, ‘আমি ভাল লেখক হব। বাজারি লেখক হব না’।
চশমা পরা কাহিল মতো একজন বলল, ‘বাজারি লেখকই তো ভাল লেখক। এটাও বুঝিস না?’
‘ তুই বেশি জানোস?’
‘হ জানি’।
আরেকজন সবাইকে যাওয়ার তাড়া দিয়ে বলল, ‘এই চল চল, ও গুদামি লেখক হবে। বিরাট গুদামি লেখক। হা হা হি হি…’।
বাজারি লেখকের সমর্থকরা সবাই উচ্চ শব্দে হেসে দিল। হাসির শব্দ মিলিয়ে যেতে না যেতেই তাদের একজন ‘ভাল লেখক’ এর সমর্থককে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘গুদামি লেখক হবি? হ। বসে বসে মাছি মারবি আর ভাঙা কাপে ঠান্ডা চা খাবি। তোর বাজার করার টাকাও থাকবে না, লোক রাখা তো দূরের কথা। তোর লেখা পোকায় খাবে। দেখিস…পোকায়’।

আমি অবাকই হয়ে গেলাম। আজকালকার ছেলে-মেয়েরা তাহলে এসব বিষয়েও কথাবার্তা বলে। আমি ভাবতাম, এরা দিনে-রাতে শুধু মোবাইলে কথা বলে। কিন্তু না, এরাও অনেক বিষয়ে ভাবে, আলাপ-আলোচনা করে। নানা বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক করে, বাজি ধরে। কিন্তু আজকের বিষয়টি একটু অন্যরকম, তাই ওদের বোঝানো দরকার। সব ধরনের লেখকই ভাল লেখক হতে পারে। বই বিক্রি হওয়া না হওয়ার সাথে ভালো-মন্দের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই আলাপ শুরু করার জন্য গলাখাকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘গুদামি লেখক’ কথাটি কোথায় পেলে?’
তারা কোনো উত্তর দিচ্ছে না। একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘গুদামি লেখক’ মানে কি?
তাদের মধ্যে একজন পেছন থেকে নিচু স্বরে বলল, ‘যেসব লেখকের বই কেউ কিনে না, যাদের বই গুদামে পড়ে থাকে, তাদের আমরা গুদামি লেখক নাম দিয়েছি’।
তার কথা শেষ হতে না হতেই ভাল লেখকের পক্ষে একা হয়ে যাওয়া ছেলেটি আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আপনিই বলেন, বই বিক্রি না হলেও কি ভাল লেখক হতে পারে না?’
‘অবশ্যই পারেন। কেন পারবেন না?’
পৃথিবীতে এমন অনেক কবি-লেখক ছিলেন, যাঁদের বই খুব একটা বিক্রি হতো না, কিন্তু পরবর্তীতে তাদের বই সমাদৃত হয়েছে। মানুষ তাদের বইয়ের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে। আমি লক্ষ করলাম, বন্ধুদের কাছে প্রায় হেরে যাওয়া ছেলেটি চোখে-মুখে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে। তারপর তাদের সাথে আমার বিভিন্ন জায়গায় দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনাও হয়েছে। তাদেরকে উভয় শ্রেণীর লেখকের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলেছি। কিন্তু তারপরেও বাজারি লেখক বনাম গুদামি লেখকের বিতর্কটা আমার মাথা থেকে এখনো যায়নি। অনেক ভেবেছি এ বিষয়ে।

বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলায় সাদাত হোসাইনের বইয়ের স্টলে পাঠকের অপেক্ষার লাইন

প্রথমেই হুমায়ূন আহমেদের নামটি মাথায় চলে এল। বাংলাদেশের মিডিয়ায় হুমায়ূন আহমেদ নামটি লেখার আগে নন্দিত কিংবা জনপ্রিয় বিশেষণগুলো হরহামেশাই ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। প্রায় দেড়শো বছরের বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে এ ধরণের বিশেষণ ইতোপূর্বে শুধু শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাগ্যেই জুটেছিল। উভয় ক্ষেত্রে একটা বিষয়ে সাযুজ্যতা প্রতীয়মান। জনপ্রিয়তা তাঁদের যেমন গণমানুষের হৃদয়ে স্থায়ী ঠিকানা দিয়েছে; তেমনি সমালোচকদের হাতে ধারালো তরবারিও তুলে দিয়েছে। তাদের দুজনকেই ‘বাজারি লেখক’ এর কলংকে কলঙ্কিত করা হয়েছে। হাল-আমলে সাদাত হোসাইন সেই কলঙ্কের রোষানলে।
একসময় বলা হতো, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বই নাকি নারী পাঠকরাই বেশি পড়ে। কালের আবর্তে দেখা গেল, নারী পাঠকরাই বাংলা কথাসাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হয়ে গেছে। শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যের অভিভাবক নারী-পাঠকদের বালিশের পাশ অতিক্রম করে পাঠ্য পুস্তকে স্থান করে নিয়েছে। তেমনি হুমায়ুন আহমেদের সাহিত্য সম্পর্কে বহুভাবে বলা হয়েছে, এখনো বলা হয়-অল্পবয়সীরাই তাঁর বই বেশি পড়ে। এমনকি তাঁকে অপন্যাসিকও বলা হয়েছে। একই অভিযোগ কিংবা চিত্র সাদাত হোসাইনের বেলায়ও।
কেউ কি খেয়াল করেছেন? বাংলা কথাসাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক নারীরা কিন্তু এখন হিন্দি সিরিয়ালে মন দিয়েছে। বাঙালি সমাজে বৃদ্ধ নারী-পুরুষেরা সকাল-বিকাল ওষুধের নাম, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, প্যাথোলজি রিপোর্ট, ভালো হাসপাতাল-ডাক্তারের নাম জপে। এক সময়ের চিত্রকলার সমঝদার, শেষ বয়সে এক্স-রে প্লেটের জলছবি দেখার জন্য বসে বসে চশমার কাঁচ ঘষেন। তাঁদের সারাটা বছরই কাটে হতাশার আষাঢ় মাসে। এরা কেউ কোনো মহাকাব্য কিংবা মাস্টারপিস উপন্যাস পড়ে পড়ে দিনাতিপাত করেন না। খুলে বসেন এক জীবনের না পাওয়ার হালখাতা কিংবা নানা রকম ব্যথা-বেদনার রাগ-রাগিনী নির্ভর (কাশাকাশি, উহু, আহাঃ, পু…) উচ্চাঙ্গ-নিম্নাঙ্গ সঙ্গীতের স্বরলিপি।
অন্যদিকে অল্পবয়সীরাই বই পড়ে। তারাই এখন বাংলা কথাসাহিত্যের কাণ্ডারি। তাদের হাত ঘুরে ইতোমধ্যেই হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্ম পাঠ্যপুস্তকে স্থান পেয়েছে। কিন্তু তাতে কি? শরৎচন্দ্রকে এখনো কেউ কেউ আধা-রোমান্টিসিজমের দোষে দুষ্ট বলতে ছাড়েন না। হুমায়ূন আহমেদ এবং শরৎচন্দ্র উভয়ের ক্ষেত্রে ‘সস্তা জনপ্রিয়তা’ অর্জনের দায়ে সমালোচকরা জল্লাদের ভুমিকায় অবতীর্ন ছিলেন। জনপ্রিয়তার দোষে সাদাত হোসাইনকেও একইভাবে ধোলাই দেয়া হচ্ছে। এই চর্চা সম্ভবত আরো প্রকট হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ‘সস্তা জনপ্রিয়তা’ কাহাকে বলে? কিংবা জনপ্রিয়তা কখন দামি হয়? এসব কথা কে বা কারা বলেন? তারা কী করেন? তারা কি কবি, লেখক? তারা কি চান নি যে, তাদের লেখা বই বিক্রি হোক? এমন একজন কবি-লেখক কি খুঁজে পাওয়া যাবে, যার লেখা বই বিক্রি হলে তিনি খুশি হন না?

আমরা যদি জনপ্রিয়তাকে সঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করি, তাহলে কি দেখি? একজন জনপ্রিয় গায়ককে কি আমরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করি? বাজারি গায়ক বলি? সঙ্গীতের ক্ষেত্রে যেমন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রয়োজন আছে, আবার লোকসঙ্গীতেরও প্রয়োজন আছে। লেখালেখির ক্ষেত্রেও সব ধরনের লেখাই প্রয়োজন। অথচ একজন কবি, লেখক আরেকজন লেখকের লেখাকে ভাগাড়ে ফেলে দিতেও দ্বিধাবোধ করছেন না। একজন কবি, লেখক কেন এমন অবিমৃষ্যকারী হবেন? ব্যাপারটি হতাশাজনক।
যে কোনো দেশে জনপ্রিয় লেখকের সংখ্যা সবসময় কমই থাকে। অজনপ্রিয় লেখকই বেশি। তাই বলে জনপ্রিয় লেখকের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে হবে? একবার ভেবে দেখুন, বাংলাদেশে জনপ্রিয় লেখকদের বই না থাকলে, বইয়ের বাজার নোট, গাইড, পঞ্জিকা, মহাম্মদী-সোলেমানী খাবনামা-ফালনামা বই বিক্রিতে সীমাবদ্ধ থাকত। বর্ধমান হাউসের চত্বরে চিত্তরঞ্জন সাহার ছালার চট পেতে বসা বইমেলাটি আজ লাখো মানুষের মিলনমেলা হতো না। আমাদের সময়ের অন্যতম দুই জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ এবং কাজী আনোয়ার হোসেনদের যুগ প্রায় শেষ। এখন নতুনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। সেই শব্দ হয়তো কারো কারো ভাল লাগছে না। আপনি পছন্দ করুন আর না-ই করুন, সময় কিন্তু এখন সাদাত হোসাইন এর অনুকূলে।

ড. শাখাওয়াৎ নয়ন
অধ্যাপক, ব্যাবেস বইউই ইউনিভার্সিটি, রোমানিয়া।