সাফল্য খুব বেশি দূরে নয় -আহমেদ শরীফ শুভ

  •  
  •  
  •  
  •  

 27 views

মেলবোর্ণের জাংশন ওভালে টি২০ বিশ্বকাপের খেলায় নিউজিল্যান্ডের মেয়েদের বিপক্ষে আমাদের মেয়েরা সফল হতে পারেনি। আমরা কষ্ট পেয়েছি, কিন্তু ওরা হতাশ করেনি। আমরা প্রত্যাশা (এক্সপেকটেশন) নিয়ে যাইনি, গিয়েছিলাম অঘটন ঘটানোর আশা (হোপ) নিয়ে। আমাদের সে আশা পূরণ হয়নি। কিন্তু আমাদের মেয়েদের পারফরমেন্সে, বিশেষতঃ বোলিং এবং ফিল্ডিং নৈপূণ্যে আমরা মাথা উঁচু করে মাঠ ছেড়েছি।

খেলায় হারলেও বেশ ক’টি উত্তেজনার মুহূর্তও তৈরি হয়।

বাংলাদেশের মেয়েরা প্রথমার্ধে যে নৈপূণ্য দেখিয়েছে তার কিছুটা দ্বিতীয়ার্ধে ধরে রাখতে পারলেই খেলার ফলাফল আমাদের অনুকূলে আসতে পারতো। প্রথম থেকেই তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল উদ্দীপিত। তাদের ফিল্ডিং, বোলিং সবকিছুই ছিল আক্রমনাত্মক এবং তীক্ষ্ণ। আমাদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপকে তারা শ্বাসরোধ করে ১৮.২ ওভারে মাত্র ৯১ রানে অল আউট করে দিয়েছিল। সে সময়ে মনে হচ্ছিল আমরা জিততে যাচ্ছি, আজ অঘটন অবধারিত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘এত কাছে তবু এত দূরে…’।

আমাদের মেয়েরা দেখে শুনে ঠান্ডা মাথায়ই ব্যাটিং শুরু করেছিল। কিন্তু আমাদের অন্যতম সেরা ব্যাটার নিগার সুলতানা জ্যোতি’র চোয়ালে প্যাটারসনের বলের আঘাত লাগার পরই সব সমীকরণ পাল্টে গেল। জ্যোতি মাঠের মধ্যে শুয়ে পড়েছিলেন। তারপর মেডিকেল টিম এসে তাকে সরিয়ে নেয়ার সময় তিনি মাঝ মাঠে আবার পড়ে যান। পরে তাকে মাঠের গাড়িতে করে মাঠ থেকে নিয়ে যেতে হয়। আমাদের ক্যাম্পের মনোযোগে তখনি চিড় ধরে। মেয়েরা তখন হয়তো জ্যোতির শারিরীক অবস্থা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। তিনি রিটায়ার্ড হার্ট হওয়ার পর নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে ভেবে তারা খেলায় পরিকল্পনার খেই হারিয়ে অস্থির হয়ে পড়ে এবং দু’টি অনাবশ্যক রান আউটের কারণ হয়। তাতেই আমাদের শিবিরে প্যানিকের সৃষ্টি হয়। সেই সুযোগে নিজিল্যান্ডের বোলাররা ব্যাটারদের শ্বাসরোধ করে এবং আস্কিং রান রেট আমাদের সামর্থ্যের বাইরে নিয়ে যায়। জ্যোতি ব্যাট করতে ফিরে এসেও সেই অসাধ্যকে আর নাগালের ভেতর আনতে পারেননি। তার রিটায়ার্ড হার্টের পরের খেলোয়াড়রা যদি অস্থির না হয়ে মাথা ঠান্ডা করে খেলতে পারতেন তাহলে ফলাফল আমাদের পক্ষে আসতে পারতো। এমন পরিস্থিতিতে ম্যাচ বের করে আনার অভিজ্ঞতার অভাবই এর কারণ হলে মনে হয়েছে। ব্যাটিংয়ের সময় সঠিক গেম প্ল্যানের অভাব এবং অস্থিরতাই আমাদের পরাজয়ের মূল কারণ। তবে আজকের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারলে সালমা’র দল দ্রুত উন্নতি করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।

বাংলাদেশ ক্রিকেট লিজেন্ড আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সাথে লেখক। মেলবোর্নের জাংশন ওভালে একসঙ্গে খেলা দেখার সময়ে তোলা ছবি।

এ পর্যন্ত টি২০ ওয়ার্ল্ড কাপে আমাদের যে তিনটি খেলা হয়েছে তার দু’টিতেই মেয়েরা লড়াই করেছে প্রবলভাবে। ভারতের বিরুদ্ধে তাদের লড়াইটা সবচেয়ে প্রবল মনে হয়েছে। তার কারণটিও সহজবোধ্য। ভারতের বিরুদ্ধে আমাদের মেয়েরা এ পর্যন্ত ১২টি ম্যাচ খেলেছে। তারা আমাদের কাছে পরিচিত টিম। তাই তাদের বিরুদ্ধে আমাদের দল নির্ভার হয়ে নির্ভয়ে খেলতে পারে। পক্ষান্তরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আমাদের খেলার অভিজ্ঞতা নেই। তাদের শক্তি, দূর্বলতা, কৌশল – সবকিছুই আমাদের অপরিচিত। বস্তুতঃ উপমহাদেশের বাইরের দলগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে। সুতরাং হুট করে এসব দলের বিরুদ্ধে জয়ের প্রত্যাশা বাহুল্য হয়ে যেতে পারে। বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে ভালো করতে হলে বেশি পরিমানে ম্যাচ খেলার বিকল্প নেই। আর ম্যাচগুলো যত বেশি দেশের বাইরে হবে ততই উন্নতির সম্ভাবনা বাড়বে। সম্প্রতি বাংলাদেশ অনুর্ধ ১৯ দলের বিশ্বকাপ জয় এই বার্তাই দেয়।

বিজয়ের উল্লাস নিউজিল্যান্ডের মেয়েদের।

সীমিত অভিজ্ঞতা এবং ততোধিক সীমিত প্রস্তুতি নিয়ে আমাদের মেয়েরা আজ জাংশন ওভালে যে আলোর ঝলকানি দেখালো সঠিক পরিকল্পনা ও পরিচর্যার মাধ্যমে তাকে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের আলোকবর্তিকায় রূপান্তরিত করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমার বিশ্বাস সেই সময় খুব দূরে নেই। আমাদের মেয়েদের লড়াকু মনোভাব আমাদের আশাবাদী করেছে। সাফল্য খুব বেশি দূরে নেই। সাফল্যের সবচেয়ে বড় সোপান সাফল্যের ক্ষুধা। মেয়েদের মধ্যে আমরা তা দেখেছি।

আহমেদ শরীফ শুভ
কবি, গল্পকার ও চিকিৎসক
মেলবোর্ন।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments