সিডনিতে ‘ও পলাশ ও শিমুল’ । মুহাম্মদ মিজানুর রহমান মুকুল

  •  
  •  
  •  
  •  

রক্ত শিমুল তপ্ত পলাশ দিল ডাক, সুনীল ভোরে’ কিংবা ‘ও শিমুল বন দাও রাঙ্গিয়ে মন’; ‘পলাশ ফুটেছে শিমুল ফুটেছে, এসেছে দারুন মাস..’
যে ফুল দেখলে নিজের অজান্তেই এই সব গান মনে পড়ে। যে ফুল ফুল নিয়ে অনেক অনেক গান কবিতা রচিত হয়ে বাংলার শোভাকে করেছে সমৃদ্ধ। যে ফুল সবুজ ঘাসের ওপর রাখলে বাংলাদেশের পতাকার মত মনে হয়। শীতের পরেই বসন্তের আগমন বার্তা বয়ে আনে যে ফুল। গাঢ় লাল রঙের পাপড়ি আর সবুজ রঙের বোঁটায় শোভিত এক অপরূপ ফুল- নাম তার শিমুল। গ্রাম বাংলার মানুষ বর্তমানে বাংলা কোন মাস চলছে তা বলতে না পারলে ও শিমুল গাছে ফুল এলেই বলে দিতে পারে এখন ফাল্গুন চলে এসেছে।

সিডনির ডার্লিং হার্বারে ফুটে আছে শিমুল। ছবিঃ লেখক

শিমুল ফুল দেখলে মনে পড়ে কনকনে শীতের সকালে মাটির চুলার পাশে বসে গরম গরম নানা রকম মজাদার পিঠা খাওয়ার মধুর স্মৃতি। কানে বেজে উঠে লাল আগুনঝরা শিমুল গাছে বসে কোকিলের কুহু কুহু ডাক। শীতের সকালে সবুজ ঘাসের ওপর ঝরে পড়া শিশির ভেঁজা এই ফুল দেখার অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম। যারা দেখেনি শীতের কুয়াশা ঘেরা বড় বড় গাছে লাল টকটকে শিমুল ফুল ও নানা রকম পাখির কলকাকলি, তাদের কে সেই মনোরম নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখার অনুভূতি এই বর্ননায় বুঝানো কঠিন।

শিমুল (Silk cotton tree) এর বৈজ্ঞানিক নাম Bombax ceiba পরিবার Bombaceae. বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ। বাংলাদেশ, ভারত, চীন সহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জন্মে থাকে লম্বায় প্রায় ২০-২৫ মিটার হয়। এই ফুল পাঁচটি প্রজাতিতে দেখা যায় তার মধ্যে রেশমি শিমুল, লাল শিমুল, কাপোক শিমুল, পাহাড়ি শিমুল, মোজাম্বিক শিমুল। এর মোচাকৃতি ফল হয় চৈত্র বৈশাখ মাসে ফল পাকে এবং ফল পেকে বীজ ও শিমুল তুলা বেড় হয়ে আসে। যা লেপ তোষক, বালিশ ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও মন খুঁজে বেড়ায় বাংলাদেশি ফুল । ছবিঃ লেখক

টকটকে লাল ফুল গন্ধ বিহীন এই ফুল প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তোলে তার নিজস্ব আগুনঝরা রং দিয়ে। পথচারিদের আকৃষ্ট করে নিজস্ব লাল ফুলে এবং গাছে বসে কোকিল বা অন্যান্য পাখির কলোকাকলিতে। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে দেখা যায়। বাংলার মাঠে ঘাটে রাস্তার পাশে কোন রকম যত্ন বা পরিচর্যা ছাড়া অনেকটা অবহেলায় বেড়ে উঠে শিমুল গাছ।

তাই হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও মন খুঁজে বেড়ায় বাংলাদেশি ফুল ।অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে গত ৭ বছরে শুধুমাত্র এক যায়গায়ই এই ফুল দেখেছি। যা তিন বছর পুর্বে সিডনিতে গাড়িতে করে কর্মক্ষেত্রে আসা যাওয়ার সময় দূর থেকে প্রথম চোখে পড়ে বড় গাছে কমলা লাল রংয়ের ফুল। পরে ট্রাফিক লাইটে গাড়ি থামলে ভালো করে তাকিয়ে দেখি এতো আমাদের দেশের শিমুল ফুল। যদিও রং টা একটু কমলা বা লাল কমলা রংয়ের। যা সিডনি সিটিতে ডারলিং হারবার এলাকায় চায়নিজ ফ্রেন্ডশিপ গার্ডেনে অবস্থিত।

পলাশের ডালে পাখি। ছবিঃ লেখক

একে তো প্রকৃতিপ্রেমী ফটোগ্রাফার তার উপর অনেক দিন পর পাওয়া দেশি ফুল। ছবি তোলার লোভ আর সামলাতে পারিনি। ব্যস্ত শহরের ওখানে আবার গাড়ি পার্কিং করা অনেক বড় সমস্যা। একে একে তিন দিনের প্রচেস্টায় কিছু ছবি তুলতে পেরেছি। প্রথমবার গিয়ে দেখি ফুল তখনো ভালো করে ফোটে নাই। দ্বিতীয় বার ছবি তুলতে গিয়ে হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজে গোসল হয়েছে ক্যামেরা ও আমার। তৃতীয় চেষ্টায় সফল হই এবং ফুল ও পাখি সহ কিছু ভালো ছবি তুলতে পারি। এ বছর দুইবার গিয়ে আরো কিছু ছবি তুলেছি। বাংলাদেশী ফুল বলে কথা।

অস্ট্রেলিয়া গ্রীষ্ম, শরত, শীত ও বসন্ত এই চার ঋতুর দেশ। এখানে গ্রীষ্মকাল ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, শরৎকাল মার্চ থেকে মে, শীতকাল জুন থেকে আগস্ট এবং বসন্তকাল সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর। এখানে আগস্ট মাসে শিমুল ফুলের ছোট ছোট কুঁড়ি আসে এবং সেপ্টেম্বর মাসের শেষে লাল কমলা রংয়ের ফুল ফোটে। পুরো পাতাবিহীন গাছে লাল ফুলে নানা রকম পাখি বসতে শুরু করে। ফুল শেষ হওয়ার পর সবুজ পাতা গজানো শুরু হয়। আহা, অনেক দূরের দেশে এসে দেশ মাতৃকার প্রিয় ফুল দেখে প্রাণ ভরে গেলো।

মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুকুল
আলোকচিত্রী, নিঃসর্গ প্রেমিক।
নর্থ সিডনি কাউন্সিলে চাকুরিরত।

বিজ্ঞাপন
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments