সিডনির এক বছর-আরিফুর রহমান

  •  
  •  
  •  
  •  

আরিফুর রহমান তরুন ঔপন্যাসিক। ইতোমধ্যে তার দুটি উপন্যাস ‘স্বপ্নজাল’ এবং ‘সন্ধ্যারাগ’ পাঠক সমাদৃত হয়েছে। প্রশান্তিকায় তিনি কাজ করছেন বার্তা সম্পাদক হিসেবে। অভিলাষী মন তার জীবন প্রবাহ নিয়েই লেখা। তিনি প্রশান্তিকায় এই শিরোনামেই ধারাবাহিকটি লিখছেন। 

সিডনির এক বছর

নীড় ছেড়ে চলে আসা, বহুদূরের নগরে
আর ফিরে না আসার ভয়ংকর বাসনা, পূর্ণিমার এই জ্বলে ওঠে, রৌদ্রের ছায়ায় এসে মিলায়। সারারাত বুকের মাঝে ধ্বুক করে উঠা নিস্তব্ধ মন বহুদূরে চলে যায়।

ভালোই যাচ্ছিল আমার সকাল, দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল, সন্ধ্যা পেড়িয়ে শেষ রাত। তবুও বিরামহীন শুণ্যতা। বেকারত্বের শুন্যতার বোঝা এক সময় আরও বেশী ভারি হতে থাকে। শেষের দিকে অকুলান হয়ে ওঠে, যতনা নিজের সমস্যা তারচেয়ে ঢের বেশি অন্যদের সমালোচনা।তাদের চোখ আমার দিকে কটমট হতে থাকে। আমি তাদের চোখের দিকে তাঁকাতে পারিনা।নানান মানুষের চোখে মুখে নানান কথাবার্তায় আমি ক্রমশই ক্লান্ত হতে থাকি।অথচ আমার কোন সমস্যা নেই, তাদেরই হাজার রকমের সমস্যা। আমি না পারতাম তাদের উপদেশের ব্যাখ্যা করতে না পারতাম সহস্র সহস্র ভালোলাগা ভালোবাসার কথা শুনাতে, কালোমেঘে আকাশ ভরিয়ে অথবা প্রকৃতির চোখে কবিতার কাজল পরিয়ে।

আমার মন প্রাণ যে কেবলি উড়ন্ত মেঘের আঁচলে লুকিয়ে থাকতো, হাজারও সুখের মুখ, আমার দীর্ঘতম বেলা জুড়ে।
অবশেষে বুকের ভেতরে মায়া,মমতা,ভালোবাসা  উপেক্ষা করে পাড়ি জমানার জন্য উড়াল দিলাম দক্ষিণ গোলার্ধের উড়ন্ত এই আকাশে।

২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর সমস্ত ক্ষোভ, দ্বিধা, অনুকম্পা নিয়ে প্রাণের শহর ঢাকা ছাড়লাম। উন্নত,পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল,নিরাপদ শহর সিডনি এয়ারপোর্টে নামলাম। তখন কেবলি মনে হচ্ছিল,এ আমি কোথায় আসলাম?কি জন্য আসলাম? কেনইবা এতোদুর?
প্রায় এক ঘন্টা এয়ারপোর্টের নিয়ম তান্ত্রিক  কাজ সমপন্ন করে বের হয়েই দেখি বড়ভাই এবং সৌমিরা ।ওদের দেখে আমার অনন্ত অস্থির চোখে বেদনার মেঘ দূর হয়েছিল ক্ষনিক সময়।তারপর বড়ভাইয়ের পিছে পিছে গাড়ি অবদি যাওয়া। ফাঁকা রাস্তা, নেই কোন গাড়ি,আমি রাস্তা পাড় হওয়ার জন্য পা বাড়ালাম,কিন্তু বড়ভাই আটকে দিয়ে বলল…
থাম।
আমি থামলাম।
পথ পাড়াপাড়ের সিগনাল ব্যতিত রাস্তা পাড় হওয়া যাবেনা।এক মাত্র প্যাডেসটাইন ছাড়া।বড়ভাইয়ের কথায় আমি খানিক লজ্জা ও কিছুটা অবাক হয়েই বললাম,কোন গাড়ি নেই তো, তাছাড়া রাস্তা একদম ফাঁকা।
বড়ভাই মিটমিট করে হেসে বলে এটা ঢাকা নয়, এটা সিডনি ।

সিডনির একটি বীচে লেখক

শুরু হলো আমার নতুন করে শেখা,নতুন কোন শহরকে জানা এবং নতুন রুপে জীবনকে বুঝবার। বড়ভাই ড্রাইভ করছে আর দেশের সকলের কথা জিজ্ঞেস করছে। অমুকের খবর কি,অমুক কেমন আছে, মার শরীর কেমন। হাজারও প্রশ্নের মাঝে আমার বুক হাহাকার হচ্ছিল, বুকের ভেতরে বেদনার ঝড় প্লাবিত হচ্ছিল । চোখ ভিজে আসছিল বার বার। বাসার সবার মুখ মনে পড়ছিল ভীষন ভাবে। আর খালি মনে হচ্ছিল এ আমি কোথায় আসলাম? ল্যাম্পপোস্টের আলো থেকে যেন খসে পড়ছিল বিষাদের আলো, সমস্ত শহর জুড়ে নেমে আসছিল বিষন্ন ঝিঁঝির ডাক। আমি কোন জীবনের শিল্প, ভালোবাসার নির্মল শব্দ,গন্ধ অথবা স্বাদ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। যেন এখানে নেই কোন প্রাণের সংসার। আমি আমার প্রিয় শহর কে অন্ধকার করে চলে এসেছি বিষাদময় নগরে।

সেই রাত শুধু নয় কমপক্ষে সাত সাতটি রাত আমার চোখের জলে বালিশ ভিজিয়েছিলাম, নিজেকে আহত মানুষের ক্ষোভ বুকে নিয়ে লেপটে থেকেছি নি:সঙ্গ বিছানায়। যে রাতে নেই কোন কোলাহল ,নেই কোন ঘেসাঘেসি ভাবে মানুষের বসবাস, নেই কোন জোরে জোরে প্রানবন্ত হাসির শব্দ অথবা নেই কোন ভালবাসার গল্প ।

সপ্তাহের দুদিন বড়ভাইয়ের সঙ্গে ঘুরতে বের হওয়া। ২০০০ সালের সিডনি অলিম্পিক থেকে দেখা পরিচিত অপেরা হাউজ, হারবার ব্রিজ সহ সকল আকর্ষণীয় সৌন্দর্যময় জিনিস গুলো যেন একটু একটু করে মনের ভেতরের যন্ত্রনা দুর করতে থাকে। তবুও যেন শুন্যতা ভর করে সারাক্ষন। দিনের শেষে কষ্ট গুলো ক্রমশই আরও ঘনিভূত হয়। সন্ধ্যা হলেই বুকের মাঝে এক ধরনের হাহাকার করতে থাকে। মনে পড়তে থাকে ঢাকার সন্ধ্যার আড্ডা। তরুন,সারওয়ার, মুস্তাফিজ ভাই, কল্লোল ওরা ছিলো আমার চিরকালের আড্ডার সঙ্গী। প্রতি সন্ধ্যায় এদের ফোন দেই বেশ কান্নার মতো করে কথা বলি। চলে যাওয়ার জন্য বলি ওদের কে। ওরা আমাকে বুঝায় আর বলে, এতো ভালো উন্নত দেশে গিয়েও এমন করিস কেন, কজনের ভাগ্যে জোটে বল।
আমার ওদের কথা তখন আর ভালো লাগেনা, আমি ফোন কেটে দেই। আমি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদি আর খালি নিস্তব্ধ ফুটপাত দিয়ে হাঁটি।আর সিগারেট ফুকাতে থাকি। তখন বেশ অভ্যেস ছিলো জিনিসটির প্রতি। আমার অতি আপন লাগতো আমার নি:সঙ্গ দুর করত। যদিও বুকে পেইন হওয়ায় ডাক্তারের বারনে আর খাওয়া হয়না।

এভাবেই চলতে থাকে সকাল, দুপুর, রাত অবধি। সিডনির রাস্তাঘাটে কিছু কিছু ঘটনা দারুন ভাবে আমাকে চমকে দিয়েছিলো। তন্মধ্যে একটি ঘটনা আমি এখনও ভুলতে পারিনি। ঘটনাটা ছিলো এরকম..
বড়ভাইয়ের বাসার পাশেই ছোট্ট একটা পার্ক।একদম নিরিবিলি নিস্তব্ধ জায়গাটা।আমি একটু বেলা করেই ঘুম থেকে উঠতাম। নাস্তা করেই ঐ পার্কে গিয়ে বসে থাকতাম।ধীরে ধীরে জায়গাটা আমার কাছে ভীষন আপন হতে শুরু করল।আর মনে লাগলো পার্কটা আমারই। আমার জন্যই এতো এতো সবুজে সবুজময়। কোনদিন আমি ছাড়া অন্য কাউকে দেখিনাই ঐ পার্কে ।একদিন কোন এক দুপুরে হয়ত দুপুর একটার মতো বাজে। আমি পার্কের বেঞ্চে বসে সিগারেট টানছি তখনই দুটি মেয়ে আসে আমার বেঞ্চ বরাবর। আমি বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াই,মেয়ে দুটি ধবধবে সাদা, দেখতেও বেশ সুন্দরী ।তারা আমার কাছাকাছি আসতে থাকে আমি আরও একটু পিছু সরে আসি। তারা আরও কাছে অগ্রসর হয় আমি তখন ভয় পেতে থাকি। বুকের ভেতরে ধুক ধুক করতে থাকে। মেয়ে দুটি আমার সামনে দাঁড়ায়। আমি দরদর করে ঘামতে থাকি।তারা আমাকে কি যেন জিজ্ঞেস করে। আমি বুঝিনা, আমার মাথা কাজ করছিলনা।তাছাড়া তখন পর্যন্ত অজি এ্যাকসেন্টে ইংরেজী বুঝতে আমার খুউব কষ্ট হতো এখনও যে সব বুঝি তা নয়। আমি কান খাড়া করি এবং ওরা কি বলতে চাইছে শোনার চেষ্টা করি। আমি বুঝতে পারি ওরা আমার কাছে সিগারেট চাচ্ছে। আমি তখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচি। আমার বুকের শ্বাস আগের মতো বেগবান হতে না হতেই তারা আমাকে অবাক করে দিয়ে,সিগারেট দুটো আমারই থেকে নেওয়া লাইটার নিয়ে ধরায়।আমি কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই আমকে চমকে দিয়ে,আমার দুগালে চুম্বনের রেখা আঁকিয়ে দিয়ে ,থ্যাংকস দিয়ে ঝরঝরে প্রানবন্ত হাসিতে হেঁটে হেঁটে চলে যেতে থাকে। আমি ওদের চলে যাবার দিকে হাবার মতো তাকিয়ে থাকি।বেশ কিছুক্ষন থমকে দাঁড়িয়ে থাকি।
বন্ধু তরুন কে ফোন করে বর্ননা করি সকল কিছু। তরুন গল্পটা শুনে হা হা হা করে হেসে বলে, ‘আহা সিগারেট’।

মাস খানেক পর আমি কাজে ঢুকি। বড়ভাইয়ের বাড়ি থেকে কাজের জায়গা দূর হওয়াতেএবং স্টেশন থেকে বেশ খানিক হাটতে হয় বলে আমি লাকেম্বা ওয়ালি পার্কে বাসা ভাড়া নিই। এই পাড়াতে বেশির ভাগ বাংলাদেশি মানুষদের বসবাস। অনেকের সঙ্গে পরিচয় হতে থাকে।সিডনি এসে নোমান শামিম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়। যদিও তার সঙ্গে পরিচয় বাংলাদেশে থাকতেই ছিলো, এখানে এসে সখ্যতা আরও ঘনিভূত হয়। তিনি আমার বাসা ব্যবস্হা করা থেকে শুরু করে সকল রকমের কাজে সাহায্য করতে থাকেন। সত্যিই ভোলার নয়। ভাইয়ের বন্ধু কচি ভাই একটা কাজের ব্যবস্হা করে দেন।

ভোরে উঠার অভ্যেস কোনকালেই ছিলোনা আরো যদি হয় শীতের সকাল। প্রতি ভোরে কাজে যাই অধিকাংশ সকালেই না খেয়ে। কাজের মাঝে ক্ষুধা লাগতো ভয়াবহ। ভীষন ক্লান্ত হয়ে যেতাম। মাঝে মাঝে মাথা ঘুরে যাবার উপক্রম হতো। তবুও মালিক Tony কে বুঝতে দিতাম না কারন যদি কাল থেকে আবার কাজ না দেয় এই ভয়ে। কাজের শেষে বাসায় ফেরা নিজের রান্না নিজেই সম্পাদন করা। মাঝে মাঝে বড়ভাই এসে শিখিয়ে দিয়ে যেত। সন্ধ্যা হলেই শামিম ভাইকে ফোন করতাম। রীতিমতো শামিম ভাইয়ের সঙ্গে সিডনি আকাশ বাতাস বুঝতে শুরু করলাম।

নোমান শামিম ভাই সিডনির একুশে একাডেমি, মেলা, কবিতা বিকেল সহ নানান রকমের সংগঠনের সঙ্গে আমাকে লেখক, কবি, সাহিত্যিক হিসাবে পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করলেন। আমিও তখন পুলকিত হতাম।  লজ্জায় মাঝে মাঝে শামিম ভাইকে বারণ করতাম ওমন করে পরিচয় না করে দিতে। সেই সঙ্গে আমাকে বেশ কিছু মানুষ চিনতে শুরু করল এবং অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। তাদের মধ্যে উল্লেখ করার মতো, নামিদ ফারহান, হাসান তারিক, ফাহাত আসমার,গ্রামীন চটপটির আশরাফ ভাই, মিরাজ ভাই,শান্তুনু এবং আমাদের রুবেল তো আছেই। আরো যে কত কত মানুষের সান্নিধ্য  পেয়েছি এক বছরে সত্যি আজ আমি ভীষন মুগ্ধ ।
এদের সান্নিধ্য পেয়ে আমি যেন আমার ঢাকাকে ফিরে পেতে থাকি। ক্রমশই আমার ভাললাগা শুরু হতে থাকে। পথে প্রান্তরে একরূপ ছোট্ট একটা বাংলাদেশ খুঁজে পাই এবং আমি যেন নতুন করে নব রুপে আমার সেই আমিকে খুঁজে পাই।


সিডনির ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে স্থাপিত বঙ্গবন্ধুর আবক্ষমূর্তিতে লেখকের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন

ভোর ছ’টা পনের ট্রেন। প্রতিদিন একই কামড়ায় বসে কাজে যাওয়া। বগিতে আমি সহ মোট তের জন। এর ভেতরে নয় জনই মেয়ে মানুষ। আমি সহ আরও একজন ওয়ালি পার্ক স্টেশন থেকে উঠি বাকিগুলো অন্যান্য স্টেশন থেকে। আমার সিটের পাশের জন ব্রাজিলের থেকে আসা একজন মেয়ে। বয়স তার ২৮ বছর। যেতে যেতে তার কাছে নেইমারের গল্প শুনতে চাই একদিন।মেয়েটি বেশ উচ্ছসিত হয় এবং অবাক হয় আমি নেইমার কে চিনি বলে। ফুটবলের গল্প করতে করতে একদিন মেয়েটি তার ভাইয়ের গল্প করতে করতে কেঁদে ফেলে। কারন তার ভাইও ভালো ফুটবল খেলতো। জাতীয় দলে একবার খেলার সৌভাগ্য জুটেছিল কিন্তু কয়েকমাস যেতে না যেতেই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। ওর কান্না দেখে আমারও খুব কষ্ট হয়েছিলো ও আমাকে আরিফ বলতে পারেনা,ডাকে এ্যারিফ বলে। মেয়েটির নামও আমি ক্যামিলা ডাকিনা। আমি ডাকি ক্যামিলিয়া। আমি তাকে ক্যামেলিয়া ফুলের গল্প করি এবং রবীন্দ্রনাথের ক্যামেলিয়া কবিতা শুনাই। একদিন বড়ভাইয়ের বাগান থেকে তোলা ক্যামেলিয়া ফুলের ছবি তাকে দেখাই। সে দারুন খুশি হয়। সেই সঙ্গে একদিন আমি তাকে ক্যামেলিয়া কবিতাটা পড়ে শুনাই। সে প্রতিদিনই শুনতে চায়। আমিও তাই প্রতিদিন শুনাতে থাকি। প্রতিবারই মেয়েটি মুগ্ধ হয়।আমি লেখালেখি করি শুনে সে নিজেকে সৌভাগ্যমান মনে করে আমার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে। আমিও যেন দিন দিন ভাবতে থাকি এ যে সত্যি রবীন্দ্রনাথের ক্যামেলিয়া ।কোন কোন দিন ঘুম থেকে উঠতে না পারাতে যেদিন কাজে যাওয়া হয়না,কিন্তু ক্যামেলিয়ার মন খারাপ হয়ে যায় এবং সেই মন খারাপের ক্ষন ফোন করে শেয়ার করে। আমি ভীষন ভাবে অবাক হই। আর ভাবতে থাকি এই দূর দেশে এসেও কোন একজন আমার জন্য মন খারাপ করে বসে থাকে।

অনেক কিছু দেখতে দেখতে এবং বুঝতে বুঝতে ঢাকার ভালোবাসার স্মৃতি বুকে নিয়ে একটি বছর অতিবাহিত হলো আমার সিডনির বসবাস।

আরিফুর রহমান
ঔপন্যাসিক, গল্পকার
বার্তা সম্পাদক, প্রশান্তিকা
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments