সিডনি এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের দূত – অজয় দাশগুপ্ত

  •  
  •  
  •  
  •  
মুক্তিযুদ্ধের জন্য তাঁর ভালোবাসা অকৃত্রিম। গুণী পরিবারের কৃতি সন্তান। মা নিজেও লিখতেন। বড় ভাই ছিলেন বাংলাদেশের কিংবদন্তীতূল্য লেখক। অসামান্য জনপ্রিয়তার অধিকারী অগ্রজকে ডিঙানো অসম্ভব হলেও ইনি কম কি সে? তাঁর মা আয়েশা ফয়েজ লিখেছিলেন বড় সন্তান হুমায়ূন আহমেদের জন্য তাঁর দুর্ভাবনা কম। কারণ হুমায়ূন আহমেদ ভারসাম্য বুঝতেন। তাঁর ভয় মেঝ ছেলেকে নিয়ে। যার লেখা ও কাজে অসন্তষ্ট মৌলবাদ নাখোশ। এবং তনি ধার না ধেরেই বলেন আর লেখেন। তার এই সতর্কবাণীর প্রতিফলন ও দেখেছি আমরা। তাঁর ওপর চড়াও হয়েছিল লেলানো যুবক। উদ্দেশ্য তাঁকে সরিয়ে দেয়া। সৌভাগ্যক্রমে তা সার্থক হয়নি। তিনি পরে এমন কান্ড করেছিলেন যা আমরা মহানুভব মানুষ ছাড়া আর কারো কাজে দেখতে পাই না।
সম্প্রতি সিডনি ঘুরে গেছেন তিনি। কত বিখ্যাত জনই তো আসেন। কিন্তু এত জনপ্রিয়তা চোখে পড়েনা কখনো। বিশেষত তারুন্যের ভেতর তাঁর যে প্রিয়তা তা যেন যাদুরকাঠির মতো। স্যার সম্বোধনে খ্যাত এই লেখক যদি চান তো দেশের শিশু কিশোর ও তারুণ্যকে নানা কাজে উদ্যোগী করে তুলতে পারেন। বিজ্ঞান মনস্ক মানুষ। গণিত শাস্ত্র তাঁর প্রিয়। এ দুই জায়গায় আমরা খুব একটা এগিয়ে বলা যাবেনা। ফলে এখানে তাঁকে আরো কাজ করতে দেয়া উচিৎ। সেটা না করে তিনি মাঝে মাঝে আমাদের মতো চলমান লেখা লেখেন। সে লেখাগুলোর প্রয়োজন আছে তবে কতটা? তাই আমার ধারণা জাফর ইকবালের সত্যিকার কাজের মুল্যায়ন বা তাঁর সীমানা এখনো অনির্ধারিত।
যে সন্ধ্যায় এখানে কথা বললেন তা নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। সচরাচর যেভাবে অনুষ্ঠান হয় তেমন একটি আয়োজন কাম্য ছিলোনা। কিন্তু যারা উদ্যেক্তা তারা বয়সে নবীন। তাদের মেধা ও প্রজ্ঞা নি:সন্দেহে প্রখর কিন্তু অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে। সেটাই প্রমাণিত হলো । কিছুদিন আগে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসেছিলেন সিডনি। সে কি অভূতপূর্ব উৎসাহ আর তোড়জোড়। কিন্তু মানুষের উৎসাহ ও  নাগরিক সমাবেশ ছিনতাই হয়ে গেছিলো প্রবাসে যারা রাজনৈতিক দল করেন তাদের হাতে। নামে নাগরিক সংবর্ধনা হলেও বাস্তবে সেটি ছিলো আওয়ামী লীগের সভা। যে কারনে সাধারণ মানুষ বা তাদের যারা নাগরিক মনে করেন তাদের কেউই কিছু বলতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রীও পারেন নি সবার কথা শুনতে। শুনতে পারলে সবার মঙ্গল হতো। আমরা ধরে নিয়েছিলাম রাজনীতি এমন করে। সংস্কৃতি করে না।
কিন্তু জাফর ইকবাল তো রাজনীতির মানুষ নন বরং তিনি তাঁর ভাষণে স্পষ্ট করে বললেন বিদেশে যুবকদের কেউ যেন আওয়ামী লীগ বা বিএনপির রাজনীতি না করে।তাঁর এই কথা আমরাও বিশ্বাস করি। মনে করি  তাই হওয়া উচিৎ। কিন্তু কিভাবে তা রোধ করা সম্ভব? আর রোধ করা কি বাস্তবসম্মত না যৌক্তিক এখন? সবাই বলেন ভারতের কোন রাজনৈতিক দলের শাখা নাই। নাই পাকিস্তানীদেরও । কংগ্রেস নাই মুসলিম লীগ নাই বিজেপি নাই তো আমাদের কেন দলাদলি? সত্য বটে। কিন্তু আমাদের দলাদলির কারণ কি? আমরা কি জাতি হিসেবে ভারতীয় বা পাকিস্তানীদের মত তিনটি মৌলিক বিষয়ে একমত? আমাদের পতাকা জাতীয় সঙ্গীত ও জাতির জনকের ধারণা বা বিষয়গুলো কি এখনো সর্বজনগ্রাহ্য? এই সিডনিতেও ওৎ পেতে আছে মৌলবাদের ভূত। বরং তা বাড়ছে। তারা সময় সুযোগ মত আসল চেহারায় বেরিয়ে আসে। আর সবুর করছে কখন আসল আঘাত হানবে। ঘরে ঘরে যেসব চর্চা আর অন্ধকার তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রগতিশীল বাঙালির আশ্রয় ও ভরসার দলগুলোকে এখনই বন্ধ করার সময় আসেনি । যে কথা বা কাজ প্রথম আলো ও ডেইলি ষ্টার বহুদিন থেকে করার চেষ্টা করছে তার আভাস কোথাও দেখলে ভয় লাগে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে বিদেশে দেশের রাজনৈতিক দল খোলা বা কাজের বিরুদ্ধে কিন্তু এখানে থাকি বলে জানি এখনই অন্ধ বন্ধ করোনা পাখা বলার বিকল্প নাই।
বলছিলাম অনুষ্ঠানের কথা। না সেদিনও যারা আয়োজক তারাই ঘিরে রেখেছিল মঞ। কেউ যদি কষ্ট করে অতিথিদের নিয়ে আসে তাদের টাকায় অনুষ্ঠান করে আর প্রবেশ মূল্য না নেয় সেখানে আমাদের বা কারো কিছু বলার থাকেনা। এখানেও নাই। আছে দু:খ। তারাও প্রচলিত ধারার বাইরে যেতে পারলো না। উল্টো ধরে বেঁধে মানুষকে এমন সব গানবাজনা শোনালো যা প্রলম্বিত করার বাইরে আর কোন অবদান রাখতে পারেনি। তারচেয়ে ক জন মানুষকে দিয়ে প্রশ্ন করানোর পরিবর্তে খোলা ময়দানে কথা বলার সুযোগ দিলে সবাই তাদের মতামত দিতে পারতেন। সেটি কেন করা হয়নি জানিনা।  আমার মত পক্ব দাড়িওয়ালা মানুষ কাউকে প্রশ্ন করছে এটাও কেমন হাস্যকর । তারচেয়ে জরুরী নতুন প্রজন্মের মতামত।  আশা রাখি ভবিষ্যতে এসব বিষয়ে নজর দেবেন তারা।
জাফর ইকবাল সাহেবের বড় গুণ তাঁর বিনয় ও সারল্য। সেটাই ভুগিয়েছে বৈকি। আমাদের মনে মনে ছবি তোলার এত শখ। আর চাওয়া মাত্র তোলা ও পোষ্ট করার ব্যাকুলতায় অনেক কিছুই পেছনে পড়ে যায়। তাঁকে বলবো তিনি নিশ্চয়ই জানেন সেলফি একটি অষ্ট্রেলিয়ান আবিষ্কৃত শব্দ। হয়তো সে কারণেই এর প্রকোপ অধিক এখানে। নিজ গুণে মাফ করার বিকল্প  নাই।
তাঁর পত্নী ড: ইয়াসমিন হকও প্রেরণামূলক বক্তব্য রাখেন। বিশেষত নারীশক্তির ভেতর তিনি নতুন করে শক্তি ও দেশপ্রেম জাগিয়ে গেছেন । তাঁকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। আর জাফর ইকবাল একাই ঢাল নিজেই তলোয়ার। যতদিন বাংলাদেশ যতদিন মুক্তিযুদ্ধ ততদিন তিনি উজ্জ্বল ও বহমান। তিনি এও জানিয়ে দিয়ে গেছেন যারা বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেনা তারা এক সময় নাই হয়ে যেতে বাধ্য। আর যারা তা করেন তারা শতবিপদেও মূলত আলোর উৎস আর চিরন্জীব। উদ্যেক্তাদের অভিনন্দন জানাই এমন দু জন গুণী মানুষের সান্নিধ্য লাভ করার সুযোগ করে দিয়েছেন বলে।
অজয় দাশগুপ্ত
কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক 
সিডনি,অস্ট্রেলিয়া।