সিরাজুস সালেকীন-এর ‘গানের সুরের আসনখানি’ কথা ও গানে মুগ্ধকর সন্ধ্যা 

914
আতিকুর রহমান শুভ: গত ২৯ সেপ্টেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় প্রতীতি’র আয়োজনে নন্দিত শিল্পী সিরাজুস সালেকীন ‘গানের সুরের আসন খানি’ শীর্ষক একক সঙ্গীত পরিবেশনা করবেন। ঠিক সময়েই অনুষ্ঠান স্থল ওয়েন্টওয়ার্থভিলের রেডগাম অডিটোরিয়ামে পৌঁছালাম। কিন্তু একি বাইরে তো মানুষের আনাগোনা দেখছিনা।তবে কি অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে গিয়েছে ?
হলের দরজা ধাক্কা দিয়েই ভুল ভাঙ্গলো। ভেতরে হলভর্তি মানুষ গমগম করছে যেনো। রুমানা ইসলাম উপাস্থাপনা করছেন। একটু পরেই শিল্পীকে উত্তরীয় পড়ানো হলো।
রজনীকান্তের গান দিয়ে সন্ধ্যা শুরু করলেন সিরাজুস সালেকীন। গানের ফাঁকেফাঁকে তার অনুকথনগলো খুব উপভোগ্য ছিলো। এ যেনো শুধু শোনার সময়ই নয় শেখারও ছিলো অনেক। রজনীকান্ত পাবনার মানুষ। তার বিখ্যাত একটি গান, ‘আমি অকৃতি অধম, ভুলেও তো কিছু কম করে মোরে দাওনি’ গাইলেন।
১৯২৩ সালে আহমেদবাদে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘তোমায় গান শোনাব’, শোনালেন। এই শিলাইদহেই কবিগুরুর সঙ্গে প্রথম বাউলের সাক্ষাত হয়। পরবর্তীতে গগণ হরকরার ‘আমি কোথায় পাবো তারে’ শুনেই কবি লিখলেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। কবির আলখেল্লা পোষাকটাও তিনি বাউলদের কাছ থেকে  নিয়েছেন। আমাদের জানা হলো তথ্যটা।
‘তুমি এবার আমায় লহ হে নাথ লহ’ ১৯১০ সালে কবির বয়স যখন ৪৮ বছর তখন লিখেছেন গানটি। তিনি আরও গাইলেন ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণাধারায় এসো’।
প্রতীতির  সদস্য বাপ্পীর এক প্রশ্নের জবাবে শিল্পী বলেন, ‘প্রবাস জীবনকেই আপন ভেবে নিয়েছি। যদিও দেশের কথা আলাদা। দেশে থাকতেও সর্বক্ষন গান নিয়েই ছিলাম। প্রবাস জীবন আমার মোটেই খারাপ লাগেনা’। প্রতীতির বয়োজ্যোষ্ঠ অরুন মৈত্রকে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানালেন।
শিল্পী এরপর গাইলেন বিভাস রাগে একটি গান। এ গানটি সৃষ্টি প্রসঙ্গে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের ছাত্র প্রমথনাথ বিশী বলেছেন, কবিগুরু একদিন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হন্তদন্ত হয়ে যাচ্ছেন যদিও সঙ্গে ছাতা ছিলো। কোনভাবেই স্বরলিপি যেনো ভুলে না যান তার জন্যই এই তাড়া।  গানটি হলো ‘আমি কান পেতে রই’। সুর ও কথায় অদ্ভুত এক মিশ্রণ রয়েছে গানটিতে।
১৯২৬ সালে কবির ৬৫ বছর বয়সে লেখা। জার্মান এক করির আমন্ত্রণে ওই বাড়ির ছাতে গিয়ে প্রকৃতির শোভা দেখে ঘরে ফিরেই এই গানটা সৃস্টি করেন, ‘মধুর তোমার শেষ যেনা পাই প্রহর হলো শেষ’। শিল্পী আরও যোগ করলেন, দাঁড়াও আমার আঁখির আগে। কবিগুরু যেনো প্রভুকেই বলছেন, দাঁড়াও আমার চোখের সামনে। তিনি বলেন, কবিগুরুর মতো স্রস্টা অদ্বিতীয়।
শান্তিনিকেতনে কবির প্রিয় ছাত্রী ছিলেন অমলা দাস। পরবর্তীতে অমলাদাস সিনেমাতেও গান করেছেন। অমলাদাসকে দেয়া কবির গানটি ছিলো, ‘কে বসিলে আজি হৃদয়াসনে ভূবন ঈশ্বর হে প্রভু’। শিল্পী সিরাজুস সালেকীনের খুব প্রিয় একটি গান।
এ গানের প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ে, বছর তিনেক আগে জনপ্রিয় ও গুণী শিল্পী অদিতি মহসিন যখন সিডনি এসেছিলেন, তখন আমরা দেখেছি সিরাজুস সালেকীন তার শিষ্য অদিতিকে এ গানটি গাইতে বলেছিলেন। অদিতি সেদিন চমৎকার গেয়েছিলেন।
অনুষ্ঠানের প্রথমার্ধের শেষ গানটি ছিলো বাউল অঙ্গের গান, ‘নিত্য তোমার যে ফুল ফুটে ফুলবনে’। দর্শক মন্ত্রমুগ্ধের মতো শিল্পীর সব গান ও কথোপকথন শুনেছে।
সঙ্গীত পরিবেশন করছেন, শিল্পী সিরাজুস সালেকীন
গানের সুরের আসনখানি শীর্ষক অনুষ্ঠানের দ্বিতীয়াংশে শিল্পী প্রথমেই গাইলেন একটি ব্রহ্ম সঙ্গীত, ‘মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে’। রাজা রামমোহন রায়ের ওপর আলোচনা কালে গানটি গাওয়া হয়। দ্বিতীয় গানটি ছিলো, কমল দাশগুপ্তের সুরে ‘ চরণ ফেলিও ধীরে ধীরে প্রিয়’। গানটি ১৯৪২ সালে রেকর্ড হয়।
শিল্পী এরপর নজরুল, পুরনো দিনের বাংলা ও দেশের গান শোনান। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো, এই কি গো শেষ গান; পৃথিবী আমারে চায়; ও নদীরে একটি কথা সুধাই শুধু তোমারে; এই মেঘলা দিনে একলা; আমার দেশের মাটির গন্ধে; আমি ঝরের কাছে রেখে গেলাম প্রভৃতি গান।
সবশেষে শিল্পীর বাবা সঙ্গীতজ্ঞ আব্দুল লতিফের লেখা ও সুর দেয়া বিখ্যাত সেই গান,
‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারো দানে পাওয়া নয়’ গেয়ে শোনান।
রাত বাড়ছিলো। কিন্তু দর্শক শ্রোতা ও শিল্পীর সেতুবন্ধন যেনো আরো গভীর হচ্ছিল। একসময় জলসা শেষ হয়। প্রতীক্ষায় রইলাম আবার কবে বসবে এমন সুরের জলসা, সেই দিনের।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন আনিসুর রহমান নান্টু।