সীমান্তে সরল সত্যে-আসমা সুলতানা

  •  
  •  
  •  
  •  

 258 views

পুরনো পকেট থেকে উঠে এল কবেকার শুকনো গোলাপ |
কবেকার ? কার দেওয়া ? কোন্ মাসে ? বসন্তে না শীতে?
গোলাপের মৃতদেহে তার পাঠযোগ্য স্মৃতিচিহ্ন নেই |
-স্মৃতি বড় উচ্ছৃঙ্খল, পুর্ণেন্দু পত্রী

ফুলের মৃত্যু হয়, নক্ষত্রের মৃত্যু হয় এমনকি কবি বা শিণ্পীরও মৃত্যু হয়, কিন্তু তাদের সৃষ্টি হয় অমর। বন্ধু ও বন্ধুত্বেরও মৃত্যু হয় কিন্তু বন্ধুর স্মৃতি বেঁচে থাকে আজীবন।  ‘ইসমত  মনি’  ছিলো ওর পুরো নাম। জন্ম, ২৮ অক্টোবর,  ১৯৭৬ (সার্টিফিকেট) এবং মৃত্যু, ২৭ সেটেম্বর ১৯৯৮, মৃত্যুর কারণ: সড়ক দুর্ঘটনা, কিন্তু মূলত মনির মৃত্যু ঘটেছিলো রাষ্ট্রের অবহেলায়। খুন বললে হয়তো সত্যি বলা হবে। মনির মৃত্যু হয়েছে কিন্তু বেঁচে আছি আমরা, বন্ধুরা। জীবনের খেলায় মনি, নাকি আমরা জয়ী হলাম জানি না। তবে চিরকালের জন্যে আমরা মনিকে ছাড়াই বেঁচে থাকার অপরাধে অপরাধী হয়ে রইলাম।


১৯৯৮ থেকে ২০১৮, আজ ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে মনির চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার দিনটি।
৯৫ সালে  ইসমত ও আমি  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালিন  চারুকলা ইন্সটিটিউটে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্টস ফ্যাকাল্টি) সম্মানে,  অংকন ও চিত্রায়ন বিভাগে ভর্তি হই।  ক্লাসে সহপাঠীরা সবাই ওকে নীলঞ্জন বলে ডাকতো। যদিও ওর চোখের রঙ নীল নয় বরং ছিলো গভীর কালো। নীলাঞ্জন বলে ডাকার কারণটি আমার প্রথমে জানা ছিলো না। কারণটা  পরে জানতে পেরেছিলাম, যে কোলকাতায় ওর একজন ভালো বন্ধু থাকতো, তার গল্প ও নাকি সব সময় করতো, যার নাম ছিলো ‘নীলাঞ্জনা’। এবং সবাই ভাবতো নীলাঞ্জনার সঙ্গে মনির গভীর প্রেম চলছে, বলে মনি নীলাঞ্জনার গল্প বলে সারাক্ষণ। মোটেই তা নয়, মনি ছিলো এমনই বন্ধুসুলভ একজন খোলা মনের মানুষ, যে তার বন্ধুর জন্যে তার ভালোবাসা বা অনুভূতি প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করতো না। আমাদের দেশে যা অবশ্যই বিরল। আমরা ভালোবাসাকে সবকিছু দিয়ে চাপা দিয়ে রাখতে ভালোবাসি এবং ঘৃণাকে প্রকাশ করি অকপটে এবং ঘৃণার চর্চা করি জীবনের সর্বক্ষেত্রে।


সেই মনির শুধু চোখ কেনো, সারা শরীরই যে মৃত্যু যন্ত্রণায় একদিন সত্যিই নীল হয়ে যাবে কে জানতো? লাশ কাটা ঘরে সে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে মাত্র ২৪ বছর বয়সে, গলিত স্থবির ব্যাঙের মতো, মরা বেড়ালের মতো, কে জানতো? সেই সময় সেকি নিজেও তা বুঝতে পেরেছিলো, তাকে একদিন হাসপাতালের মর্গে অন্ধকারে শীতলতায় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে হবে মাত্র ২৪ বছর বয়সে? এখন যৌবন যার মৃত্যুর তার শ্রেষ্ঠ সময় নয় কোনোভাবেই। “অকাল মৃত্যুই মৃত্যুর শ্রেষ্ঠ অবস্থান”, বলেছিলেন ইতিহাসের মমতাজ কন্যা জাহানারা বেগম কিন্তু, সব ক্ষেত্রে সেটা ঠিক নয়। শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গো’রও হয়েছিলো অকাল ও অপমৃত্যু। এই পৃথিবী হারিয়েছে একজন মহান শিল্পীকে। পরিবার হারিয়েছে একজন প্রিয় মানুষকে। সুতরাং যে মানুষটির অনেক কিছু দেবার আছে এই পৃথিবীকে তার অকালে হারিয়ে যাবার অর্থ হলো, সেই মানুষটির মাতৃভূমি এবং সারা পৃথিবী বঞ্চিত হয় তার সেই অবদানগুলো থেকে।

শিল্প, সাহিত্য আর কবিতার স্থান ছিলো ইসমতের হৃদয়ের খুব গভীরে। ইসমত ছিলো বন্ধুসুলভ, সবার জন্য বন্ধুত্বের হাত সর্বদা বাড়িয়েই রাখতো সে। আর অসাধারণ একটি গুণ ছিল, সেটি হলো ওর হাসি। ভুবন ভোলানো হাসি ছিলো ওর। মুখে হাসি লেগেই থাকতো সারাক্ষণ। সে হাসি যেনো ম্লান হবার নয়, গা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসতো, কথা বলতো কম, বললেও অর্থবহ কথা, বাকীদের মতো অনাবশ্যক কথায় সময় নষ্ট করতো না। আমাদের সবার বন্ধু ইসমত মনি একদিন আমাদের সবার চোখের আড়ালে আমাদেরকে না বলে চলে গেলো, হারিয়ে গেলো, জানি না আজো কোথায় গেলো সে। যেনো গভীর কোনো অভিমানে হারিয়ে গেছে সে সৌরজগতের নক্ষত্রের দেশে। মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছা করে যেখানে সে গিয়েছে, সেখানে কি কমলা রঙের রোদ/আলো আছে অনেক? কারণ কমলা রঙ ছিলো মনির খুব প্রিয়। মনে হয় ধ্রুব তারা বা অরুন্ধতীর বন্ধু হয়েছে বুঝি আজ ও।

I’m not sure, I understand only a little, I can hardly see,
but it seems to me that its singing has the color of damp violets,
of violets that are at home in the earth,
because the face of death is green,
and the look death gives is green,
with the penetrating dampness of a violet leaf
and the somber color of embittered winter.
(Nothing But Death by Pablo Neruda)

মনির সঙ্গে তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত এক সঙ্গে পড়তে পেরেছিলাম। প্রথম বর্ষের ক্লাসের পরে আমাদের দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাসের জন্য অনেকগুলো মাস অপেক্ষা করতে হয়েছিলো। সেই সময়টার দিকে মনির সাথে আমার বন্ধুত্বের শুরু, একি ক্লাসে ৩ বছরের বেশী পড়ার পরেও মাত্র সাত মাস মতো ওর সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিলো । ‘ইসমত মনি’ এযাবৎ কাল পর্যন্ত আমার একমাত্র সবচেয়ে বেস্টফ্রেন্ড। মনি চলে গেছে রয়ে গেছে সময়, রয়ে গেছে চারুকলা, কবিতার বই, জল রঙের টিউবগুলো, আঁকার জন্য কেনা সাদা কাগজগুলো, রয়ে গেছি আমরা বন্ধুরা, আমাদের সবাইকে ও ভেঙ্চিয়ে একা করে চলে গেছে চিরতরে।

চারুকলার ঠিক উল্টো দিকে মোল্লার চায়ের দোকানে সবাই চা খেতে যেতাম আমরা। ১৯৯৫ থেকে ৯৮ সালের সময়গুলোতে, আমরা যখন চা খেতে যেতাম, সেই সময় ট্রাফিক এখনকার মতো এত ভয়াবহ না হলেও শাহবাগের ওই জায়গাটা ছিল সব সময়ই ব্যাস্ত। তখন ক্লাসের সবাই যখন মোল্লাতে যেতাম আমি খুব ভয় পেতাম রাস্তা পার হতে। আমার বয়স তখন ২১/২২, ইসমত খুব হাসতো আমাকে নিয়ে আর টিজ করতো, তবে ঠিকই নিজেকে দিয়ে আমাকে আড়াল করে, রাস্তা পার করিয়ে দিতো, আমার অন্য বন্ধুরা হঠাৎ করে আমাকে ভয় দেখাবার জন্য বলে উঠতো কোনো কিছু খুব শব্দ করে। মনি আমাকে রাস্তা পার করে দিতো আমি যাতে নিরাপদে চা  খেতে যেতে পারি ও ফিরে আসতে পারি ক্লাসে। কিন্তু মনি কি সেই নিরাপত্তা পেয়েছিলো? সে কি নিরাপদে ঘরে ফিরতে পেরেছিলো? না। সেই ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ সালে মনির মৃত্যু হয় ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনায়।

Goodbyes are only for those who love with their eyes. 
Because for those who love with heart and
soul there is no such thing as separation.
-Rumi

শিল্পীদের মৃত্যু হয় রাস্তায়, শিল্পীরা মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে লাশ কাটা ঘরে। আমার প্রিয় দেশের চিত্র আঁকলে  এর থেকে সুন্দর করে আমি কোনো চিত্র পারবো  না আঁকতে। আমার প্রিয়তম বন্ধু মারা গেলো সড়ক দুর্ঘটনায়, আমার বয়স তখন ২২, মৃত্যুর সাথে আমার প্রথম পরিচয়। যে তরুণটি আমার পাশে বসে স্টিল লাইফ আঁকতো, যে দাড়িয়ে ফিগার ড্রইং করতো, যে লাইব্রেরীতে বসে পড়তো, সে হঠাৎ করেই হারিয়ে গেলো। আমার ২২ বছরের তরুণ মন কোথায় যাবে, কার কাছে বলবে, কার সাহায্য নেবে? কেউ ছিলো না পাশে, কাউকে পাইনি যে আমার প্রশ্নের উত্তরগুলো দিতে পারবে। আজীবন খুঁজে বেড়িয়েছি উত্তরদাতাদেরকে, পাইনি। কেউ পারে না উত্তর দিতে। সবাই প্রশ্ন করতে জানে, সবাই পারে মন গড়া শব্দের সালাদ বানাতে। অথচ মনি আর আমি একসময়; দুজনে খুব তর্ক করেছি, আলোচনা করেছি, শিল্পচর্চা করেছি, সাহিত্য নিয়ে কথা বলেছি, কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছি, কবিতা আবৃত্তি করেছি। আমাদের আগ্রহের ক্ষেত্রগুলো ছিলো শিল্পকলা, সাহিত্য, সিনেমা, সঙ্গীত, ভাষা, প্রকৃতি, বাকস্বাধীনতার চিন্তা, সমাজ ও সংস্কৃতি, পৃথিবী, মানুষ আরও বহু কিছু, এবং আমরা অনেকের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করেছি।

দ্বিতীয় বর্ষে জল রঙের প্রশিক্ষণ শুরু হলো আমাদের। একবার, আমি তাড়াহুড়ো করে বাসায় ফিরতে গিয়ে, আমার জল রঙের ব্যাগটা ভুলে ফেলে আসি চারুকলার চত্বরে। ঘরে ফেরার সময় মাঝ পথে গিয়ে আমার মনে পড়ে, আমি রিক্সা ঘুরিয়ে নিয়ে ফিরে যাই চারুকলায়। তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে, মনি আমাকে ফিরতে দেখে খুব হাসলো, কারণটা না জেনেই। এমন করে আর কি কেউ হাসতে জানে? আমি তো দেখিনি। আমি কারণটা বলতেই মনি দৌড়ে গেলো ঠিক যেখানটাতে বসে আমি জলরঙ করছিলাম। সেখানে গিয়ে বৃষ্টির মধ্যে  মাটিতে বসেই হাসতে লাগলো। ওর হাসতে লাফিং গ্যাস লাগতো না। আমার আরেক সহপাঠী বলতো, “এই ছেলেটা একদিন হাসতে হাসতেই মারা যাবে”। তাই হবে কে জানতো? ওর হাসি থামানোর নয়, আরও যেনো সংক্রমক, ও হাসলে আমরাও হাসতাম ওর সাথে।  হারানো রঙও ফেরত পাওয়া যায় কিন্তু হারানো বন্ধুকে যায় না।

সেই বছরের শেষে আমাদের বার্ষিক প্রদর্শনীর বাছাই চলাকালে, শিক্ষকদের মধ্যে একজন সিনিয়র শিক্ষক ও আমাদের দেশের বিখ্যাত শিল্পী ওর কাজ নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করেছিলেন। এবং বলেন, জল রঙের একটি অংশ কেটে ফেলে দিতে। শিল্পীরা বুঝতে পারবেন তাদের কাজকে কেউ যদি আংশিক কেটে ফেলে দিতে বলে তাহলে কেমন অনুভূত হতে পারে; এবং সেই বিশেষ জায়গাটি যদি হয় শিল্পীর প্রিয়। মনি সেই সময় রাঙামাটি, বান্দরবন গিয়ে, বন জঙ্গল ও ঝর্ণার জলরঙ করে এনেছিলো কিন্তু তবুও শিক্ষকদের মনোপুত হয়নি। কিন্তু মনি ছিলো নিজের কাজে ও কথায় অনড়। কারণ মনি ও আমি কেউই তোষামদ করতে জানিনা, না জানি রাজনীতি করতে, আমাদের রক্তে শুধুই শিল্প প্রবাহিত হয়।

আমরা মানতেও পারতাম না এমন সব অনিয়ম, আমরা কোনো দিনো মাথা নত করিনি, না করেছি আপোষ। এই দেশটাকে মনি যতটুকু  ভালোবেসেছিলো সেটা ওই শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই বাসেননি। মনির খুব মন খারাপ হয়, ও বার্ষিকীতে ছবি জমা দেবে না বলে জানায় এবং সে বলে দেয় সে ছবি কাটবেও না।  আমাদের দেশে অনেকেই বলেন যে মৃত্যুর ৪০ দিন আগে থেকেই নাকি মানুষ বুঝতে পারে । মনি খুব মনোকষ্ট নিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলো।  আনমনা থাকতো শেষ দিনগুলোতে। আমাদের বললো ’তোমরা কাজ জমা দাও, আমি দেবো না’। মনি আমার দেখা প্রথম মুক্তমনা একজন মানুষ। যার বেড়ে ওঠার ক্ষেত্র বাংলাদেশে হতে পারেনি। হায়রে দেশ আমার!
মনির মৃত্যুর কিছুদিন আগে, একদিন চারুকলাতে এসে আমাকে ওর পকেট ডায়রিটা দেখালো। মনি ছিলো একদম ভিন্ন আর সবার থেকে, প্রতিভাবান নয় শুধু, এমন শিশু মন আর বন্ধুসুলভ মানুষ আমি কম দেখেছি। বন্ধু বান্ধব সবার জন্ম তারিখ ও লিখে রাখতো, মনে রাখতো এবং উপহার দিতো মনে করে। আমাকে দেখালো ডায়েরিটা  বৃষ্টিতে ভিজে সব লেখা মুছে গেছে। আমরাতো তখন সেল ফোন ব্যবহার করতাম না, না করেছি বল পয়েন্ট, সব ফাউন্টেন পেনে, কালিতে লেখা। সব লেখা ঝাপসা হয়ে গেছে বৃষ্টির পানিতে ভিজে । সব চিহ্ন মুছে গেছে, মনির মৃত্যুর আগেই।

For life and death are one, even as the river and the sea are one.
– Khalil Gibran

আমাকে একবার মনি বাঁচালো মৃত্যুর হাত থেকে। চারুকলাতে বাইরের ছেলে মেয়েরা ঢিল ছুড়ে কাঁচা আম পাড়ছে, একটা ঢিল এসে ঠিক পড়ে আমার পায়ের কাছে। কিন্তু আমি দেখিনি, মনি ও ওর বন্ধু মাহবুব ওরা দেখতে পাচ্ছিলো ছোড়া ঢিলটির গতিবিধি। ওরা আমাকে চিৎকার করে বলছে আমি যেনো না নড়ি। মনির চোখে মুখে আমি সেদিন দেখিছি আমার মৃত্যুর ছায়া। সেই মনিই চলে গেলো মৃত্যুর দেশে, দেখে যেতে পারেনি ওর বন্ধুদের চোখে ওর হারিয়ে যাবার বেদনা। আমি মনির কাছে নানা ভাবে ঋণী, ও আমাকে দেখিয়ে দিয়ে গেছে একজন প্রকৃত শিল্পী কেমন হওয়া উচিৎ, আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করবার মাধ্যমে ওর স্বপ্নগুলোকে স্পর্শ করার চেষ্টা করি মাত্র।
মনির স্বপ্ন ছিলো বড় মাপের শিল্পী হওয়ার, অনার্সের জন্য সাহিত্য ছিলো ওর প্রথম পছন্দ আর আমার দ্বিতীয়। শিল্পকলা ছিলো ওর দ্বিতীয় পছন্দ আর আমার প্রথম। তবে ও ছিলো ক্লাসে সেরা, আমি ছিলাম ওর কাছাকাছিই, মনি শুধু শিল্পীই নয়, কবিও। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার প্রতি ওর আগ্রহ ছিলো প্রবল। প্রকৃতিপ্রেমী বললে কম বলা হবে এবং যে কোনো মানুষের দুঃখ কষ্টে ও পাশে গিয়ে দাড়াতো। শিশুদের খুব ভালোবাসতো এবং শিশুদের জন্য বিভিন্ন চ্যারিটিতে ও ওর অল্প বিস্তর সামর্থ্য থেকে দান করবার চেষ্টা করতো। তবে ওর গুণ গুলো নিয়ে রাষ্ট্র করে বেড়াতো না। ওর মৃত্যুর পর, নানা লোকের মুখে শুনেছি এসব কথা। মনির এক সহোদরও সড়ক দুর্ঘনার শিকার হয়ে অসুস্থ হয়ে যায় সারা জীবনের জন্য। দ্বিতীয় বার মনি হয় শিকার, তবে সে আর ঘরে ফিরতে পারেনি। মনির ঘরের সামনে ছিলো একাটা কামরাঙা গাছ, সেটা মরে গেলো ঠিক ওর মৃত্যুর আগের বছর। বৃক্ষ হারানো কষ্ট ওকে ব্যাথিত করেছিলো খুব।

in city and in forest they smiled like me and you, 
but now it’s come to distances and both of us must try, 
your eyes are soft with sorrow, 
Hey, that’s no way to say goodbye. 
-Leonard Cohen

একটা দেশ তার এমন একজন কোমল মনের শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না, সেই দেশে শিল্পীরা কিভাবে বেঁচে থাকবে, নিরাপদ ভাবে শিল্পচর্চা করবে, দেশের নাম বিশ্বে ছড়াবে। শিল্পীর যদি মৃত্যুই হবে তবে জন্মের কি প্রয়োজন? ১৯৯৮ সালে আমরা একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করছিলাম, সেই প্রয়োজনে মনি তার ছোটো বোনের বাসা ইন্দিরা রোড থেকে রওনা দেয় ফার্ম গেইটের দিকে। সেই মনি আর ঘরে ফেরেনি, তাকে আর কেউ কোনো দিনো দেখেনি সেদিনের পর থেকে। মনির বাসা ছিলো বাসাবো, বন্যার কারণে বাসাবো থেকে শাহবাগ যাতায়াতে কষ্ট হবার কারণে বোনের বাসায় থাকতো ইন্দিরা রোডে। আমি চলে গিয়েছিলাম রাজবাড়ীতে আর ফিরতে পারিনি বন্যার কারণে। আমি মনিদের বাসায় ফোন করছি বার বার। মনির খোঁজকে নেবার জন্য, কিন্তু মনিকে কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। ঢাকাতে ওর পরিবার বন্ধুবান্ধব সবাই ওকে খুঁজছে। কিন্তু মনি আরো ২/৩ দিন আগেই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছে। পিতামাতা জানেন না তাদের সন্তান আর নেই এই পৃথিবীতে। তারা জানেন না তাদের সন্তান আর বাংলার বাতাস থেকে নিঃশ্বাস নিচ্ছে না।
সেই বছরে মনি আমাকে আমর জন্ম দিনে জয় গোস্বামীর সবগুলো বই উপহার দিয়োছিলো। কারণ কবিতার প্রতি প্রেম আমি ছাড়া বন্ধু মহলে আর কারো দেখেনি ও। যতগুলো জয় গোস্বামী সেই সময় পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিলো, সব গুলো কিনে জড়ো করে আমার হাতে দিলো। তার আগের বছরে ও আমাকে দিলো একটা ব্লকপ্রিন্টের শাড়ি। আমার জীবনের প্রথম শাড়ি। আমি ওকে দিয়েছিলাম সুনীল গঙ্গোপধ্যায়ের প্রথম আলো। পরের বার কিছু দিতে হলো না কারণ মনিতো চলেই গেলো ওর জন্মদিনের ঠিক একমাস আগে। তবে মনির মৃত্যুর কিছুদিন আগে খুব সংকোচে আমাকে  একটা কবিতার বই দিয়ে যায়। সেটা ও নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের দোকান  থেকে কিনেছিলো বলে আমাকে দিতে লজ্জা পাচ্ছিলো। আমি কবিতা ভালোবাসি বলে আমি ভেবেছি পড়তে দিচ্ছে। কিন্তু ও আমাকে বইটা দিয়েই দিতে চেয়েছিলো চিরতরে। তাহলে কি মনি বুঝতে পেরেছিলো কিছু? হৃদয়ের গভীরে কোথাও ওর হয়তো মনে হচ্ছিলো এ পৃথিবীর পর্ব ওর শেষ হতে চলেছে।

”সুধা তোমাকে ভোলেনি”- 
সুধা ভুলে গেছে। 
ভুলে যাওয়া তার কাজ।
নইলে একা সে বাঁচবে কেমন করে!
-জয় গোস্বামী

২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৮ দুপুর দুটোর দিকে, মনি যখন ফার্ম গেইটের দিকে হেটে যাচ্ছিলো তখন দ্রুতগামী একটি গাড়ি (কার) তাকে পেছন থেকে ধাক্কা মারে। সেই ধাক্কাতে মনি উঠে যায় অনেক উঁচুতে, শূন্যে। তারপরে গাড়িটি তাকে সেই অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায় আরো দ্রুত গতিতে। গাড়ীর চালক ছিলো প্রভাবশালী একজন রাজনীতিবিদ। তাকে কে ধরবে? বন্যার সেই সময়টাতে ঢাকা শহর বেশ খালিই ছিলো। এত তাড়াহুড়ো করবার কোনো কারণ নেই। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, চালক মাতাল ছিলো। জিগ জ্যাগের প্যার্টানে গাড়ী চালাচ্ছিলো। গাড়ীর নং ঢাকা মেট্রো ক-০৩- ৬৫৫৮। আশেপাশের পত্যক্ষদর্শীরা ভেবেছিলো এফ. ডি. সি‘র কোনো চলচ্চিত্রের কাজ হচ্ছে। কিন্তু আশেপাশে কোনো ক্যামেরা না দেখতে পেয়ে তারা সবাই ছুটে আসে মনিকে সাহায্য করতে। কর্মরত পুলিশ মনিকে হাসপাতালে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তার বদলির সময় হয়েছে বলে অজুহাত দেয় সে। এবং সে সাধারণ মানুষকেও মনিকে সাহায্য করা থেকে বাধা দেয়। দুর্ঘটনা বলে, অন্য পুলিশ কন্সটেবল আসাবার জন্য অপেক্ষা করতে বলে। আশেপাশের মানুষ দেখে মনির অনবরত রক্তক্ষরণ হচ্ছে মাথার ক্ষত থেকে। এমন সময় একজন মানবদরদী স্কুল ছাত্রী মনিকে একটি বেবীতে করে নিয়ে যায় ঢাকা মেডিকেলে। চালক একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মানুষ, যার দুটি সন্তান রয়েছে, আতাউর রহমান ঢালী যার নাম। তার সঙ্গে আরো একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মানুষ ছিলো দুর্ঘটনার সময়। তবুও সে গাড়ীটি থামিয়ে, মনির অবস্থা পরীক্ষা না করে কাপুরুষের মতো পালিয়ে গেলো। যেকোনো সভ্য দেশ হলে দুর্ঘটনা যতবড়ই হোক না কেনো দুর্ঘটনা যিনি ঘটায় তাকে গাড়ী থামিয়ে পুলিশের জন্য অপেক্ষা করতে হয় এবং দুর্ঘটনা কবলিত ব্যক্তিটির পাশে সে ততক্ষণ থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না ব্যক্তিটিকে কোনো প্যারামেডিকসের কাছে সর্মপণ করতে না পারে। কিন্তু আমরা তো অসভ্য, অমানবিক ও পশুরও অধম এক জাতি। যেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ রাস্তায় পড়ে মরছে প্রতিনিয়ত কারো কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।

যত কিছু ভালোমন্দ
যত কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব
কিছু আর নাই ।
বলো শান্তি , বলো শান্তি ,
দেহ-সাথে সব ক্লান্তি
হয়ে যাক ছাই ।
(মৃত্যুর পরে – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

ঢাকা মেডিকেলের বিছানায় মনিকে ফেলে রাখা হয় দুপুর ৩ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত। রাত ৯ টার দিকে মনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলে পরে জানা যায়। আমি তখনও রাজবাড়ীতে, প্রচণ্ড ঝড়ের পরে লোড শেডিং এ সারা রাজবাড়ী অন্ধকার। ঠিক রাত নয়টা দিকে, আমি টের পাই মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ, আমি শিউরে উঠি আমার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে, অজানা কারণে। আমি তখনও জানি না মনির কি হয়েছে বা কেউই জানে না। মানুষের নিষ্ঠুরতার কথা জানা যায়, কিন্তু এই নিষ্ঠুরতার যেন কোনো তুলনা  হয়না। আমরা খুব দোষারোপ করি পাকিস্তানিদের। কিন্তু কেউ কি ভেবে দেখেছে, একটি যুবকের জন্ম স্বাধীন বাংলাদেশে, বাংলাদেশের জন্মের ৪ বছর পরে যার জন্ম, সে ২৫ বছরও বাঁচতে পারলো না তার মাতৃভূমির মাটিতে। তার কি অপরাধ ছিলো? সে যখন রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় দুপুর থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত মৃত্যুর সাথে লগছিলো। স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারী হাসপাতালে, যেখানে কাজ করে দেশের সেরা চিকিৎসকরা, বা মেডিকেলের ছাত্ররা, যারা নিজেদেরকে সেরা ছাত্র বলে দাবী করে। সেখানে কাজ করে কত শত নার্স এবং অসংখ্য কর্মচারী কাজ করে। আশে পাশে অসংখ্য রোগী ও রোগীর আত্মীয়স্বজনরা । বাংলাদেশের মত একটি জনবহুল দেশে নিরিবিলি থাকা অসম্ভব, তাও হাসপাতালের মতো একটি জায়গাতে। তখন মোবাইল ফোন ছিলো না কিন্তু ছিলো এ্যানালগ ফোন বা কয়েন বক্সের  সুবিধা, কেউ কি একজন চিকিৎককে দিয়ে সঠিক পরিচর্যা করাতে পারেন নি। পারেনি, আর পারবেই বা কিভাবে, মানুষ মানুষের জন্য চিন্তা করে, মানুষ মানুষের বিপদে এগিয়ে আসে, মানুষ মানুষকে বাঁচিয়ে তোলে, আমরা হলাম সেই নার্সিসিস্টিক এক জাতি যাদের স্বার্থপরতা রোগের পর্যায়ে। কোনো মানুষকে মানুষ বলে যারা গণ্য করে না। বাইস্টান্ডার এফেক্টে সবাই হয়তো ভাবেন আমি না অন্য কেউ সেই কাজটি করুক, কিন্তু একই ভাবনার জড়তায় কেউই আসলে তাদের মানবিক কর্তব্যটি পালন করে না।

He dies, and makes no sign.
-William Shakespeare

মনির কোনো আত্মীয়স্বজন ছিলো না তারপাশে সেদিন বা কেউ থাকতে পারেনি, পারলে অবশ্যই থাকতো। যে কারণে কোনো চিকিৎসক বা হাসপাতাল কতৃপক্ষ তাকে কেউ দেখেনি, কিন্তু খুনী চালক ফিরে এসেছিলো । মনির কাছ থেকে তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র সহ বিভিন্ন কাগজপত্র সরিয়ে ফেলেছিল। যাতে তাকে কেউ শনাক্ত করতে না পারে। সে অন্ধকারে ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করতে থাকে, মনির মৃত্যুর জন্য। সে মনিকে বাঁচানোর চেষ্টাতো করেইনি বরং তার মৃত্যর জন্য অপেক্ষা করেছে। সাধারণত বেওয়ারিশ লাশ ৭২ ঘন্টা মর্গে রাখে, ‍কিন্তু খুনী চালক ৪৮ ঘন্টার মধ্যে মনিকে আজিমপুরের কবরস্থানে কবর দিতে বাধ্য করে, আরো বেশ কিছু বেওয়ারিশ লাশের সাথে। ভাবতেই গা শিউরে ওঠে এমন কত শত, কোটি, নিযুত, অযুত মনির অভিশাপের নিঃস্বাসে বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে আছে।
মনির পরিবারের সদস্যরা এবং ওর বন্ধু বান্ধব সবাই ওকে খুঁজতে থাকে, দু-তিন বাদে। তাদেরকে কেউ খবর দেয়নি যে তাদের সন্তান, তাদের ভাই, তাদের বন্ধু আর এই পৃথিবীতে নেই, তার এর মৃত্যু হয়েছে। ঘাতক নিজের জীবনের ভয়ে সে এই কাজ গুলো করেছে। একের পর এক অপরাধ করেছে সে, সেই অপরাধগুলো পাপে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষে মনির পরিবার জানতে পারে। ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। আমাকে জানায় আমার হলের রুমমেট, সে খবরের কাগজ থেকে জানতে পারে এবং কাগজটি আমাকে দেখাতে নিয়ে আসে। আমি সেই রাতে শুধু আলোয় ভেসেছি। আমার ঘুম হয়নি। আমি জানি না মৃত্যুর দেশে অনেক আলো থাকে কিনা। চারুকলাতে ফেরার আমার কোনো ইচ্ছা বা শক্তি অবশিষ্ট ছিলো না।

I died as a mineral 
and became a plant, 
I died as a plant and rose to animal,
I died as an animal and I was Man. 
Why should I fear? 
When was I less by dying?
-Rumi

মনি তার জীবনে মাত্র দুটো পাসপোর্ট সাইজের ছবি তুলেছিলো। একটা এস. এস. সি পরীক্ষার সময়। আরেকটা তুলেছিলো পাসপোর্ট বানানোর জন্য, যেটা দিয়ে সে ভারতে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। তখন তো ফোন ছিলো না, না ছিলো সেলফি। শেষে সেই ২য় ছবিটা পত্রিকায় খবর ছাপার কাজে লাগলো। আমরা চারুকলার ছাত্র-ছাত্রীরা মিলো, কয়েকদিন আন্দোলন করি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও চিঠি পাঠানো হয়। দিনের পর দিন রোদে বসে আন্দোলন করি কিন্তু কিছুই করতে পারিনি। সবাই ভাবে রাস্তায় নেমে গলা ফাটালে বা দু চারটা গাড়ী ভাঙ্গচুর করলে, সমস্যার সমাধান হয়, নয়তো হয় না। এধরনের মধ্যবিত্ত ধারণা থেকে আমাদের বের হয়ে, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের জন্য কাজ করে যেতে হবে। একটি দেশে সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মারা যায় আর কোনো বিচার হয় না; সে দেশের বিচার ও আইন আদালত নিয়ে নাগরিকদের সংশয় থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কোনো সভ্য দেশে এমন ঘটনা বিরল।
এই দেশের কারো মনে এক চুলও সমবেদনা, সহমর্তিতা সহযোগিতা আমি পাইনি সেদিন। আমি সেইদিন মনির আত্মাকে বলেছিলাম এই পোড়াদেশে আমি আর থাকবো না, এ পোড়া সমাজ আমার নয়। কারণ এই পোড়া ক্ষত সারিয়ে তোলা প্রায় অসম্ভব। আমাদের দেশটা নব্বইয়ের শুরুতেই পঁচতে শুরু করেছে। সেখানে শিল্পী আর কবিদের হৃদয় শুধু শকুনের খাদ্য বই কিছুই নয়।

এ-কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
শিয়রে যাহার ওঠেনা কান্না, ঝরেনা অশ্রু ?
… কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
বিরহে যেখানে নেই হাহাকার ? কেবল সেতার
হয় প্রপাতের মোহনীয় ধারা, অনেক কথার
পদাতিক ঋতু কলমেরে দেয় কবিতার কাল ?
(স্মৃতিস্তম্ভ-আলাউদ্দিন আল আজাদ)

কতগুলো ক্রমাগত ঘটানার সমন্বয় মনির মৃত্য নিশ্চিৎ করেছিল। এটাও নিশ্চিৎ হলো যে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার কোনো সমাপ্তি ঘটবে না নিকট ভবিষ্যতে। সেই ঘটনাগুলো হলো…

-গাড়ীর চালক ট্রাফিক আইন মেনে গাড়ী চালাচ্ছিলো না। তার গতি ছিলো স্বাভাবিকের থেকেও বেশী। মনি ফুট পাত দিয়েই হাটছিলো।
-পুলিশ দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা করেছে ।
-হাসপাতাল চিকিৎসক নার্সেরা তাদের দায়িত্ব পালন করেননি।
-বিশ্ববিদ্যালয় কি ভূমিকা পালন করেছে আমি জানি না। করলে হয়তো ফল পাওয়া যেতো।
-স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ও কি দুর্নীতিমুক্ত ছিলো? তারা কোনো পদক্ষেপই নেয়নি।
-খবরের কাগজ দায়সারাভাবে কতগুলো খবর ছাপালো এর পরে কোনো ইনভেস্টিগেশন হলো না।
-বন্ধ-বান্ধবরা আমরা এক বছর মনির মৃত্যু বার্ষিকীতে প্রদর্শনী করে, দায়িত্বে ইস্তফা দিয়েছে। এর পরে মনিকে নিয়ে খুব একটা কোনো কাজ করিনি আমরা বা কথাও বলার সুযোগ ছিলো না। কেউ এসব কষ্টকর কথা কেউ তুলতে চায় না বাংলাদেশে। সবাই সমস্যায় গলা পর্যন্ত ডুবে আছে, নতুন সমস্যা আর যোগ করতে চায় না কারো জীবনে। কারণ আমরা কেউ সমস্যার সমাধান চাই না।

যে দেশে অধিকাংশ নাগরিকই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়, নয় সৎ ও পরিশ্রমী সে দেশের ভবিষ্যৎ এখন তো সুস্পষ্ট। কারণ আজ মনির মৃত্যুর ২০ বছর হতে চললো, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে বই কমেনি। আমরা কিছুদিন আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন বিখ্যাত শিল্পীকে হারিয়েছি। মিশুক মুনীর এবং  তারেক মাসুদ  এর মতো দুজন প্রতিভাবান ব্যক্তিত্বের মৃত্যর ক্ষতি দেশ আজো পূরণ করতে পারেনি। বাকী দুর্ঘটনায় কারিয়ে যাওয়া প্রাণের কথা তো বাদই দিলাম।
২০১৮ সালের ২ জুলাই দ্য ডেইলি স্টারের খবরে বলছে এ বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। বছর এখনও শেষই হয়নি। ২০১৭ সালে দেশে গিয়েছিলাম, অল্পদিনের জন্য। শাহবাগের মোড়ে যাদুঘরের সামনে লেখা দেখলাম টেম্পু ঢোকা নিষেধ। অথচ টেম্পু ঢুকলোই, দেখলাম সিকিউরিটির হাতে চালক গুজে  দিলো কিছু বকশিস। পৃথিবীতে বহু দুর্নীতিবাজ দেশ আছে কিন্তু দুর্নীতি আমাদের যে ভাবে গিলে খেয়েছে তার নজির বিরল। দেশের জনসংখ্যা দেশ থেকে অনেকগুণ বেশী, সব কারণগুলো শিক্ষিত সমাজের জানা। শিক্ষিত আচরণ করবার উপায় শুধু জানা নেই। আমাদের জানা নেই সভ্যতা কাকে বলে। আমরা রাজনীতিবিদদের গালি দিয়ে নিজেই উল্টোদিকে গাড়ি এগিয়ে দেই। শুধু রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্র সংরক্ষণ করবে না, নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব, আমাদের রাষ্ট্রকে গড়বার। আর প্রতিদিন কাজে যেতে হলে রাস্তায় নামতে হবে রাস্তায় নামলে আমরা যেনো আইন মেনে চলতে হবে।

No evil can happen to a good man, either in life or after death. – Plato

কথায় বলে যেটার যোগ্য তুমি না নেই কাজটি করা ঠিক না, আমরা যদি ট্রাফিক আইন না মানতে পারি আমাদের অধিকার নেই গাড়ী চালানোর, আমরা যদি রাস্তা দেখে রাস্তা না পার হই সেই রাস্তা চলাচলে আমদের অধিকার নেই। আমরা যদি আমাদের জীবনকে মূল্য না দেই, কারো দায়িত্ব নয় সেটার মূল্য দেবার। আমরা মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করিনা। আমাদের সেই অভ্যাসটা পরিবর্তন করতে হবে।

মনি একজন সেক্যুলার মানুষ ছিলো। সব ধর্মের মানুষের প্রতি তার যেমন ভালোবাসা ছিলো, তেমনি ছিলো সব ধর্ম বা সংস্কৃতির উপর ছিলো শ্রদ্ধাবোধ। বৌদ্ধ দর্শনের প্রতি ওর গভীর আগ্রহ ছিলো এবং নিয়মিত ধ্যান করতো। মনির হাত ধরেই আমার প্রথম বনসাই সম্পর্কে ও দেখার সুযোগ মেলে। এমন অনেক নতুন নতুন বিষয় নিয়ে ওর আগ্রহ, এমন জ্ঞানপিপাসু প্রাণবন্ত যুবকের মৃত্যুতে বাংলাদেশের একটি গাছের পাতাও নড়লো না। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বুঝতেও পারলো না যে তারা কী হারালো। আমরা অনুভূতিহীন এক দেয়ালের মতো হয়ে গিয়েছি। ১৮ কোটি দেয়াল যেনো একে অন্যের সামনে দাড়িয়ে আছি। কেউ কারো অবেগ-অনুভূতিগুলো স্পর্শ করতে পারি। জীবন  যেখানে সহজ,  মৃত্যুতো হবেই। ব্যাঙের ছাতার মতো মানুষ জন্মাচ্ছে আর মরছে। বাকী সবাই বৈষয়িকতায় ব্যস্ত।
মনির মৃত্যুর ঠিক দশ বছর পরে, আমি আমার রঙের মধ্যে খুঁজে পাই একটি পেনসিল হোল্ডার, যা আমি প্রথমে চিনতে পারিনি। পরে মনে হলো এটা মনির। জীবন কত ক্ষণস্থায়ী হতে পারে। একটি পেনসিল হোল্ডারও রয়ে যায় কিন্তু জলজ্যান্ত একজন মানুষ হারিয়ে যেতে পারে শূন্যে। আমি সেই পেনসিল হোল্ডারকে আমার শিল্পকর্মে চিরস্থায়ী করে রাখবো। মনির উপহার দেয়া কবিতার বইগুলোও তো রয়ে গেছে আমার কাছে। মানুষের জীবন কত বিশাল হতে পারে। সেই জীবনই একটি ফুলের থেকেও সংক্ষিপ্ত হতে পারো কোনো কোনো সময়।
আপনারা দয়া করে একবার চোখ বন্ধ করে চিন্তা করুন, আপনি নিজেও ঠিক এমনভাবে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন কেউ আসছে না সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। শেষ পর্যন্ত প্রিয় মানুষদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অন্ধকারের দিকে। মনের চোখ দিয়ে একটু দেখুন দয়া করে। এরপরে চিন্তা করুন আপনার প্রিয় কারো মুখ, হাসপাতালের বিছনায় রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত্যুর যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তাকে কেউ বাঁচাতে আসছে না। শেষে সেও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। চিন্তা করুন একবার দয়া করে। আপনার কষ্ট হচ্ছে? চোখ ভিজে উঠছে? ঠিক তাই, কেউই চায়না অকাল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে বা আমাদের প্রিয় মানুষেরা এমন করে বেওয়ারিশ হয়ে যায় যে আমরা শেষ বিদায়টুকুও জানাতে পারি না।

আমাদের মনের চোখ খোলার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়। 
অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুনার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।
(অদ্ভুত আঁধার এক-জীবনানন্দ দাশ)

————————————–
‘সীমান্তে সরল সত্যে’ নামটি নেয়া কবি জয় গোস্বামীর একটি কবিতার শিরোনাম নাম থেকে।

আসমা সুলতানা
ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট
টরোন্টো, কানাডা

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments