সুলতানা কামালকে হত্যার হুমকিঃ অত:পর? – রণেশ মৈত্র

  •  
  •  
  •  
  •  

মনটা, গতকাল ৪ মে, শনিবার থেকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। একে তো ‘ফণী’ নিয়ে দেশজুড়ে আতংক নানা সংকায়, ভোগান্তিতে জনজীবন বিধ্বস্ত জতিত উৎকণ্ঠা অপরদিকে হঠাৎ করেই গুরুত্বহীনভাবেই যেন কোন কোন টি.ভি. চ্যানেলে বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী কামালকে হত্যার হুমকীর খবর কয়েক সেকেন্ডে অত্যন্ত গুরুত্বহীনভাবে প্রচারিত হলেও তা চোখে পড়ে যাওয়ায়।

পরদিন সকালে সংবাদপত্র হাতে এলে তাতে দেখলামঃ

“মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল সহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে “ইসলামের স্বার্থে” হত্যা ও শেষ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে একটি জঙ্গী সংগঠন। এ বিষয়ে গতকাল ৪মে শনিবার সন্ধ্যায় ধানমন্ডি থানায় একটি জিডি করেছেন সুলতানা কামাল। ডি.জি. নং ১০৭১। আন্তর্জাতিক জঙ্গী সমর্থিত অনলাইন ম্যাগাজিন “লোনউলকে” এই বিষয়টি প্রকাশ করা হয়েছে বলে জিডিতে উল্লেখ করা হয়। সুলতানা কামাল ছাড়া আর কাকে কাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে পত্রিকাটিতে তার উল্লেখ না থাকায় প্রগতিশীল কয়েকজন ব্যক্তিত্বের (যারও সুলতানা কামালের মত শতভাগ অসাম্প্রদায়িক) কথা মনে ভেসে উঠলো। তবু যেহেতু তাদের নামের তালিকা পাই নি তাই অনুমান সঠিক হতেও পারে-নাও হতে পারে। কিন্তু এটি তো দিবালোকের মত সত্য যে ইসলামিক জঙ্গী সংগঠন বেশ কিছু দিন পর নতুন করে দেশের শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক নাগরিকদেরকে তাদের ‘হিট লিষ্টে’ স্থান দিয়েছে এবং সে অনুযায়ী তাদেরকে হত্যার হুমকী দিতে সুরু করেছে “ইসলামের স্বার্থে”।

বছর কয়েক আগেও তারা ব্লগার বলে পরিচিত অভিজিত রায় সহ বেশ কয়েকজন অনুরূপ বুদ্ধিজীবীকে হত্যার হুমকি দিয়ে শেষ পর্য্যন্ত হত্যারও করেছিল নির্মমভাবে। এই হত্যাগুলির মন্থর তদন্ত এবং বিচার বা কারও শাস্তি না হওয়ায় ঐ সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক জঙ্গীদের মনে নিরাপত্তা বোধ জাগ্রত হয়েছে বলে মনে করি এবং তা থেকেই তারা সাহস পেয়েছে এমন সুপরিচিত বিদগ্ধজনদেরকে হত্যার হুমকি দিতে হুমকি কাজে পরিণত করতে।

অবশ্য খবরে বলা হয়েছে জি.ডি. করার পর থেকেই সুলতানা কামালের নিরাপত্তার জন্য তার বাসায় পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হয়ত পুলিশ এ ব্যাপারে আন্তরিক এবং সম্ভাব্য যে কোন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য রীতিমত প্রস্তুত।

তারপরেও উদ্বেগ দূর হয় না, মনের শংকাও হ্রাস পায় না অতীতের ঐ ভয়াবহ ঘটনাবলীর কথা ভেবে।

আমরা জানি, হুমকি প্রাপ্তরা আজকের বাংলাদেশের সম্পদ তারা জাতির অহংকার। স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী এবং সাম্প্রদায়িকতার বিষে জর্জরিত ঐ ইসলামিক জঙ্গীরা সে কারণেই তাদেরকে টার্গেট করেছে। ঐ তালিকায় আরও অনেকের নাম থাকতে পারে যাদেরকেও আজও বাংলাদেশের বড্ড প্রয়োজন। দেশকে এখনও তাদের দেওয়ার অনেক কিছু আছে।

শংকা ও উদ্বেগ আরও বাড়ে গোটা পৃথিবীর হাল হকিকত দেখে। এই তো সেদিন মাত্র নিউজিল্যান্ডের ক্রাই্টচার্চের দুটি মসজিদে জুম’আর নামায আদায়রত ৫০ জন ধর্মানুরাগী মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো শতাধিককে আহত করা হলো। বাংলাদেশের ভাগ্য ভাল যো আমাদের ক্রিকেট দলের অনেকে নামা পড়তে ঐ মসজিদের কাছে যেতেই অসংখ্য লাশ ও রক্তের বন্যা দেখতে পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ফিরে আসেন তাদের হোটেলে। কিন্তু ঐ আহতদের মধ্য থেকে চিকিৎসারত আরও একজন মুসুল্লি মারা গেছেন।

নিউজিল্যান্ডের মত শান্তিপ্রিয়, সভ্য ও ধর্ম নিরপেক্ষ দেশে এমন মর্মান্তিক ঘটনা যে ঘটতে পারে এমনটা গোটা বিশ্বে কেউ কল্পনাতেও আনতে পারে নি। বরং গোটা পৃথিবী হয়েছে স্তম্ভিত।

কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো এমন ভয়াবহ ঘটনা সেখানে ঘটলো এবং অসংখ্য নির্দোষ ব্যক্তিকে হারাতে হলো বহু মায়ের, অনেক স্ত্রীর, অনেক প্রেমিকার, অনেক ভঅই বোনের আপন জন নিমেষেই হারিয়ে গেহলেন। বিশ্ব যাদেরকে হারালো তাদের মধ্যে কয়েকজন নিউজিল্যা- অভিবাসী জনাকায়েক বাংলাদেশীও ছিলেন।

এর পর দু’তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই ভয়াবহ খবর এলো শ্রীলংকা থেকে। সেখানে তিনটি গীর্জায় খৃষ্টানদের ধর্মীয় উৎসবের দিন ইস্টার সানডের প্রার্থনারত কয়েকশ ধর্মানুরাগীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো। এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের হোটেলেও একই সন্ত্রাসী জঙ্গী বাহিনীর সন্ত্রাসীরা আরও অনেককে একইভাবে অতর্কিতে হত্যা করলো। দেশী বিদেশী তিন শতাধিক মানুষ নিমেষেই হারিয়ে গেলেন রক্তের বন্যা বইলো কলম্বো নগরীতে অশ্রু বন্যা বইলো সমগ্র পৃথিবীতে।

কি করলো ঐ জঙ্গীরা নিউজিল্যা- ও শ্রীলংকায়? উভয় জায়গার ঘটনায় হত্যাহত হলেন অন্তত: হাজার পাচেক মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ে তারা মুসলমান, খৃষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ সবাই। কোন ধর্মাবলম্বী মানুষই রেহাই পান নি। হত্যার অভিযান চালালেন দৃশ্যত: নিউজিল্যান্ডের শ্বেতবর্নের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় উগ্র বর্ণ ও সাম্প্রাদকিতাবাদী একজন খৃষ্টান। ঐ খুনীকে গ্রেফতার করে জেলে পুরা হয়েছে। মামলা আজও তদন্তাধীন। খুনীও চিকিৎসাধীন দেখা হচ্ছে লোকটি প্রকৃতিস্থ ছিলো না কি মস্তিষ্ক বিকৃতিতে ভুগছিল। মেডিক্যাল রিপোর্ট পেলেই দ্রুত পুলিশী তদন্ত শেষ হতে পারবে?

আস্থা, খুনীটা যে শ্বেতবর্ণের মানুষদের প্রাধান্য চেয়েছিল বলে প্রচার হলো-তার সেই উদ্দেশ্য কি ৫১ জন মুসলিম (মূলত: অভিবাসী) কে হত্যা ও দেড় শত মুসলিমকে আহত করার ফলে প্রতিষ্ঠিত হলো? নিউজিল্যান্ডে তো শ্বেত বর্ণেরই প্রাধান্য প্রাধান্য খৃষ্টানদেরও। তা হলে কি হত্যালীলার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বে শ্বেত ও খৃষ্টান প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল বা হতে চলেছে? বিশ্ব কালো মানুষহীন, মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধহীন হয়ে গেল কি?

আবার শুনা যায়, অন্তত: আই.এস. দাবী করে বলেছে যে তারা তাদের “মুসলমান ভাই” দেরকে নিউজিল্যান্ডে হত্যার “রতিশোধ” নিতেই শ্রীলকংকার ঘটনা ঘটিয়েছে। উভয় দেশের ঘটনার দায়ই আই.এস. স্বীকার করেছে।

এখানে এ প্রশ্ন ওঠা কি অস্বাভাবিক হবে যে নিউজিল্যান্ডে না হয় একজন খৃষ্টান ৫১ জন মুসলমানকে হ্যা করেছে। সে কারণে সকল খৃষ্টান, সকল দেশের খৃষ্টানকে দায়ী করা ায় কোন যুক্তিতে। প্রতিমোধ নেওয়া হলো শ্রীলংকার খৃষ্টানদের উপর গীর্জায় হামলা চালিয়ে হতাহত যে খৃষ্টানরা ঐ গীর্জাগুলিতে হলেন তারা কি আদৌ নিউজিল্যান্ডের হত্যালীলার জন্যে দায়ী? তা যদি না হন তবে তাদেরকে হত্যা করার মাধ্যমে ‘প্রতিশোধ’ নেওয়াটা কি কোন ধার্মিক তার কল্পনাতে আনতে পারে?

আরও লক্ষ্যনীয় যে শ্রীলংকার মুসলিম জঙ্গীরা যারা আই.এস. এর সাথে সম্পৃক্ত বলে জানা যাচ্ছে তারা তো শুধু গীর্জা আক্রমণ করেই ক্ষান্ত থাকে নি তারা কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের হোটেলেও বোমা নিক্ষেপ করে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে আহত করেছে। হোটেলে অবস্থানকারী এই মানুষগুলি তো শ্রীলংকারন নন তারা সবাই বিদেশী পর্য্যটক। এদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই খৃস্টান। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ-খৃষ্টান সবাই ছিলেন পর্য্যটক হিসেবে, তাহলে অ-খৃষ্টানদেরকে ঐ তথাকথিত প্রতিশোধের অছিলায় হতাহত করাটাও কি যুক্তি সঙ্গত? এটা কি কদাপি ইসলাম ধর্ম অনুমোদন করে?

বস্তুত: শ্রীলংকার ঘটনার মাধ্যমে ঐ জঙ্গীরা বা আই.এস. ভূক্ত বা বর্হিভূত উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠী যা করলো তার ফলে ঐ দেশে সাম্প্রদায়িকতা নির্ঘাত বৃদ্ধি পাবেমুসলিমেরাই মানুষের টার্গেটে পরিণত হবে। ইতোমধ্যেই পত্রিকা মারফত জানা গেছে যে শ্রীলংকার মুসলিম সম্প্রদায়ি আতংকের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন তাদের তরুণেরা গ্রেফতার বা আক্রমণের আশংকায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এই সংকট জনক দুর্ভাগ্য জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করলো আই. এস. নামক মুসলিম জঙ্গী সন্ত্রাসীরা। ধর্মীয় বিচারে মুসলমানদের ক্ষতি ইসলামের নামে তথাকথিত মুসলমানরাই করলো। কী ভয়ংকর অপব্যবহার ধর্মের।

এভাবে আজ কয়টি বছর যাবত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মের বা বর্ণের নামে হত্যালীলা চালিয়ে যাচ্ছে। ঘটনাগুলি শুধুমাত্র বেদনাদায়ক নয় অত্যন্ত গর্হিত ও বর্বর এবং অসভ্য প্রখৃতির। ধর্মের সাথে যেমন এগুলির সম্পর্ক নেই তেমনি আবার ধর্মান্ধ উগ্রবাদ সর্বপ্রযত্নে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ধর্মীয়, বর্ণগত ও লিঙ্গগত কারণে সৃষ্ট বৈষম্য দূরীকরণ অসম্ভব।

লক্ষ্যনীয় এই উগ্র ধর্মান্ধরা বাংলাদেশে সুলতানা কামাল ও অন্য কয়েকজন দেশপ্রেমিক উদার গণতন্ত্রীকে টার্গেট করে তাদেরকে “ইসলামের স্বার্থে” হত্যার হুমকি দিয়েছে। কিন্তু এই দুস্কৃতিরা আদৌ হুমকি দিচ্ছে না বা দিবেও না যে সকল অসৎ ব্যবসায়ী পবিত্র রমজান মাসে পণ্য মূল্য অহেতুক বৃদ্ধি করছে, যারা হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে বিদেশে পাচার করছে, যে অসৎ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারা ঘুষ খেয়ে দিব্যি রাজার হালে দিন কাটাচ্ছে, যারা নারীদের উপর ডৌন নির্য্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে-যারা ধনী গরীবের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে চলেছে, যারা বে-আইনীভাবে অন্যের সম্পত্তি গ্রাস করে চলেছে তাদের বিরুদ্ধে। বরং পারলে ঐ ঘুষখোর, মুনাফায়ের অসৎ লোকদের কাছ থেে বিপুল অর্থ সাহায্য নিয়ে বে-আইনীভাবে অস্ত্র কিনে তাদের হত্যালীলা পবিত্র “ইসলামের স্বার্থে” চালিয়ে যাচ্ছে।

এহেন পরিস্থিতিতে সরকারকে দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই সুলতানা কামালের বিন্দুমাত্র ক্ষতি যেন স্বাধিত না হয়, তার নিরাপত্তা বিধান যে ত্রুটিমুক্ত হয় তার স্বাভাবিক জীবন যাত্রা শান্তিপূর্ণভাবে নির্বিঘেœ চালিয়ে যেতে পারেন দ্রুতই তেমন একটা পরিবেশ রচনা করা হোক। সকল বুদ্ধিজীবীর ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী সকল কবি, সাহিত্যিক ও অন্যান্য বিদগ্ধ জনেরাও যেন একইভাবে নির্বিঘ্নে তাদের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা চালিয়ে যেতে পারেন।

আর ঐ উগ্রদর্শান্ধ জঙ্গী এবং জঙ্গী উৎপাদনকারী ও প্রশ্রয়দাতাদের শীঘ্র গ্রেফতার করা হোক। অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনী পন্থায় ঐ হুমকী দাতাদের বিরুদ্ধেও কঠোরতম এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বিধান করা হোক।

রণেশ মৈত্র
লেখক,কলামিস্ট
একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক; মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক।
ইমেইল : raneshmaitra@gmail.com