সেপ্টেম্বর ইলেভেনের দুই দশক ও আমার খেরো খাতা ( ২ )। মিতা চৌধুরী

  •  
  •  
  •  
  •  

দ্বিতীয় পর্ব:

বিন লাদেনের হত্যা বনাম মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী দ্বিচারী নীতি: সেপ্টেম্বর ইলেভেন ঘটনার পরপরই ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আমেরিকায় বসবাসকারী ধনী ও শিক্ষিত মুসলিমদের উপর একটি জরিপ চালায় এবং সেই জরিপে প্রায় সকলেই তাদের হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল বিভিন্ন নিপীড়ক শাষককে আমেরিকার সমর্থন দিয়ে যাওয়ার জন্য (9/11, Noam Chomsky)। সেপ্টেম্বর ইলেভেনের এই জিহাদি বা হামলাকারীরা হঠাৎ কোনো ঘটনা বা ক্ষোভের প্রকাশ ছিল না। সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে শুরু হওয়া শীতল যুদ্ধের, ভূরাজনৈতিক কৌশল বা প্রক্সি-যুদ্ধ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সহ বেশ কিছু আগ্রাসনের ফলাফল।

বিন লাদেন ও আল কায়েদার বিষয়ে সেপ্টেম্বর ইলেভেন পূর্ববর্তী বিভিন্ন মুসলিম দল ও তাদের নেতারা নাখোশ ছিলেন। একারণে বিন লাদেনকে ও আল কায়েদাকে আইনের আওতায় এনে বরং আমেরিকা ও তার মিত্ররা সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারতেন। আজ দুই দশক পরে এই ধরণের উগ্রপন্থী জিহাদি দলগুলো যতটা একজোট তা হয়তো নাও হতে পারতো বিন লাদেনকে আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করলে। এক্ষেত্রে লেবাননের ধর্মীয় নেতা শেখ ফাহাদুল্লাহ বা হিজবুল্লাহ প্রধান সায়ীদ হাসান নাসারুল্লার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এরা প্রত্যেকেই সেপ্টেম্বর ইলেভেনের ঘটনার ও বিন লাদেন এবং আল কায়েদের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন সেই সময়। উল্লেখ্য যে, ১৯৮৫ সালে সিএইএ’র সমর্থনে ও সহযোগিতায় একটি মসজিদের সামনে ট্রাক বোমা দিয়ে শেখ ফাহাদুল্লাহকে হত্যার চেষ্টাও করা হয়েছিল। যদিও শেখ ফাহাদুল্লাহ প্রাণে বেঁচে যান কিন্তু প্রাণ হারায় মসজিদ ফেরত নিরপরাধ মানুষ, যার মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। জিহাদি আন্দোলন নিয়ে গবেষক ও বিশেষজ্ঞ ফাওয়াজ গ্রেগস মনে করেন, যদি আমেরিকা ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান ও ইরাকে অভিযান না চালিয়ে আইনের মাধ্যমে এগোতো তবে এই বিভিন্ন জিহাদিরা আসলে হয়তো বিভক্ত ও দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়তো। কিন্তু আফগান ও ইরাক আক্রমণ আসলে ছিল অনেকটাই বিন লাদেনের ফাঁদে পা দেয়া, যা কিনা বিন লাদেন ও তার অনুসারীদের ইচ্ছা পূরণে আশীর্বাদ স্বরূপ।

দুই দশক পরে যখন তাই আবার সেই তালিবানি’ই রাষ্ট্র ক্ষমতায় তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন থেকে যায়, এই যুদ্ধ বা বিন লাদেনের হত্যা আসলে কতটা যুক্তিযুক্ত। নিবন্ধের এই অংশে আমি আলোচনা করবো বিন লাদেনের হত্যার ঘটনাটি নিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ংকর সব অপরাধীদের কিন্তু আমরা দেখিনা তাদের অপরাধের জন্য কোনোরকম প্রক্রিয়া ছাড়াই তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল; যদিও মানবতার বিরুদ্ধে তাদের দ্বারা সংগঠিত অপরাধগুলো ছিল প্রমাণিত, আর মাত্রার দিক থেকে সেগুলো যে ৯/১১ চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর তা নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বরঞ্চ আমরা দেখি নুরেমবার্গ ট্রায়াল’এর মাধ্যমে এইসব ভয়ঙ্কর অপরাধীদের বিচারে মুখোমুখি করা হয়েছিল, কারণ আইনের সহায়তা পাবার অধিকার প্রতিটি মানুষেরই আছে তা সে যত বড় অপরাধী’ই হোক না কেন। একটি সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যাবস্থায় এমনটাই হওয়া উচিত। তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম ‘বিন লাদেনের পতন বা মৃত্যু’ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল কিন্তু সেটা কি যথাযথ পন্থায় তাকে আইনের আওতায় এনে করাটা অনেক বেশি যৌক্তিক ও আইনানুযায়ী নয়? আর হোয়াইট হাউস থেকেও নিশ্চিত করা হয়েছে সেই ঊনাশিজন চৌকস কমান্ডো যখন বিন লাদেনকে ধরার অভিযানে এবোটাবাদে যায় তারা বিন লাদেনকে সম্পূর্ণ নিরস্র অবস্থাতেই পেয়েছিলো আর বিন লাদেনের পক্ষ থেকেও কোনো প্রতিআক্রমণের চেষ্টাই করা হয়নি। তারপরও যখন বিন লাদেন কে মাথায় গুলি করা হয় তখন এটাই প্রমান হয় যে, সেই অভিযানে বিন লাদেনকে জীবিত ধরে জনসমক্ষে আনার কোনো ইচ্ছাই আমেরিকার ছিল না। আর সেক্ষত্রে এই ঘটনা যে আন্তর্জাতিক মানবধিকার আইনের চূড়ান্ত লংঘন তা বলার আর কোনো অপেক্ষায়ই রাখে না।

আমেরিকার অন্তত একতৃতীয়াংশ জনগণ বিশ্বাস করতো ৯/১১ পেছনে আমেরিকা সরকার বা ইসরায়েল মূলত দায়ী, আর এর কারণ ছিল ৯/১১ পরবর্তী এই ঘটনায় বিন লাদেনকে বা আল কায়েদা এই ঘটনার দায়ী হিসেবে আমেরিকার জনসমক্ষে তথ্য সরবরাহে চরম অসচ্ছতা। আমেরিকার এই বিন লাদেন হত্যাকান্ড অনেকের মনেই ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করেছিল, এমনকি আমেরিকার খোদ মিত্র দেশগুলোও এই কাজে সন্তুষ্ট ছিলোনা। সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর হেলমুট স্মিড আটলান্টিক পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এই বিষয়ে বলেন যে, আমেরিকার এই অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের পরিষ্কার লঙ্ঘন এবং বিন লাদেনকে আটক করে বিচারের আওতায় আনা উচিত ছিল। Daily Beast পত্রিকার সম্পাদক এরিক মার্গলিস বলেন যে, ওয়াশিংটন কখনোই জনসমক্ষে কোনো তথ্য হাজির করেনি যে ওসামা বিন লাদেনই ৯/১১’র হামলার পেছনে ছিল, আর তাই আমেরিকা বা হেগ’র আদালতে একটা প্রকাশ্য বিচার ছিল আমেরিকার সেই সুবর্ণ সুযোগ যাতে আমেরিকা প্রমান করতে পারতো বিন লাদেনই ৯/১১’র জন্য দায়ী।  আর তাই এক্ষেত্রে এটা অবশ্যই আমাদের চিন্তার খোরাক যোগায় কেন আমেরিকা বিন লাদেনকে এত সুযোগ থাকার পরেও কোনো বিচার প্রক্রিয়া না এনে তাকে হত্যা করলো। তবে কি আমেরিকার তাদের দীর্ঘদিনের করে আসা দাবির (বিন লাদেন’ই ৯/১১ হোতা) প্রতি সন্দিহান ছিল ? সেই ভাবনা পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিলাম।

জেফ গ্রিনফিল্ড তার What if bin Laden had been captured, not killed? An alternate history (The Washington Post, May 6 2011) তে বর্ণনা করেছেন, বিন লাদেনকে যখন এবোটাবাদে সিআইএ ও আমেরিকার SEAL টিম আবিষ্কার করেন তখন বিন লাদেন দু’হাত উঁচুতে তুলে মৃদু হেসে আরবিতে শুধু একটি বাক্য বলেছিলো যার অর্থ ছিল “আমি আত্মসমর্পন করছি”! একজন ব্যাক্তি সে যত বড় দাগী অঅপরাধীই হোক সে যখন আত্মসপমর্পন করে, জেনেভা কনভেনশন ও মানবধিকার আইনানুযায়ী তা আমলে নিতে বাধ্য। কিন্তু বলাই বাহুল্য, সাত হাজার মাইল দূরে সিআইএ’র অফিসে বসে পুরো অভিযান পর্যবেক্ষণরত প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট সিআইএ প্রধানকে আদেশ করেন, “আমরা এই ….. বাচ্চাকে জীবিত থাকতে দিতে পারিনা”। এবং সিআইএ প্রধান যখন তাকে বুঝাচ্ছিলো যে, যদি সে (বিন লাদেন) কোনো প্রতিরোধ না করে বা পাল্টা আক্রমণ না করে তবে তাকে আটক করতে হবে হত্যা করা যাবে না। প্রেসিডেন্ট তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “ওর (বিন লাদেন) ওই হাসির অর্থ হলো, ও এমন কিছু জানে যা আমরা জানি না!”

বিন লাদেনকে আইনের আওতায় এনে একটা স্বচ্ছবিচার প্রক্রিয়ার দ্বারা তাকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাড় করানোর যে সুযোগ ছিল তা আমেরিকা বা ন্যাটো কাজে লাগায়নি বরং সমগ্র দুনিয়াকে অন্ধকারে রেখে বিন লাদেনের দাফনটা পর্যন্ত ধোঁয়াশায় রেখেছে এবং তার লাশ পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছে। এই বিন লাদেন আসলে সেদিন মারা গিয়েছিলো কিনা বা অনেকের দাবী অনুযায়ী আসলে বিন লাদেন ২০০১-এর ডিসেম্বরেই নিহত হয়েছিল কিনা; সেই চলমান বিতর্কে যাবো না। কিন্তু এটা নিশ্চই আমাদের চিন্তার খোরাক যোগাবে যে, আসলে এই মৃত্যুতে মানবজাতি কতটা লাভবান হয়েছিল তথা খোদ আফগান যুদ্ধের পরিণতি কি হয়েছিল। ২০১১ সালের রাতের অন্ধকারে আব্বোটাবাদে তাকে যে ঊনাশী জন কমান্ডো হত্যা করলো এতে কি আফগান যুদ্ধের সমাপ্তি এসেছিলো? উত্তরটা সবারই জানা।

আফটারম্যাথ অফ সেপ্টেম্বর ইলেভেন: বৈশ্বিক সামরিকরণ ও মার্কিন আগ্রাসন: ৯/১১ প্রতিউত্তরে আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমণ আসলেই কতটুকু যুক্তিযুক্ত? ওকলাহোমা বোমা হামলার কথা হয়তো আমাদের বা এর পরের প্রজন্মের অনেকেরই অজানা। ১৯৯৫ সালের এপ্রিলের এই হামলায় ১৬৮ জন প্রাণ হারায় যার মধ্যে ১৯ জনই ছিল শিশু এবং ৫০০এর অধিক আহত হয়। কোনোরকমের তদন্ত ছাড়াই আমেরিকার পক্ষ থেকে একে ইসলামী জিহাদিস্টদের আক্রমণ উল্লেখ করে লেবাননের দিকে সন্দেহের তীর ধরে। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই প্রকাশ পায় খোদ আমেরিকার সাবেক দুই সৈন্যই এই হামলার জন্য দায়ী। সেই দুই হামলাকারী কট্টর ডানপন্থী প্যাট্রিয়ট মুভমেন্টের সঙ্গে জড়িত ছিল (Jenkins, John Philip. “Oklahoma City bombing”. Encyclopedia Britannica)। ওকলাহোমা হামলায় কি আমেরিকা তখন ওই দুই সৈন্যের বসত এলাকাতে বা পরিবারকে পাল্টা আক্রমণ করেনি বা সেই কট্টর ডানপন্থী সংগঠন প্যাট্রিয়ট মুভমেন্টের সদস্যদের দমন করতে তাদের ঘাঁটিতেও হামলা করা হয়নি, বরং আইনের আওতায় এনে তাদের বিচার হয়েছে। কিংবা IRA বা আইরিশ রিপাব্লিকান আর্মি যখন লন্ডনে বোমা হামলা করলো ব্রিটেন কিন্তু বেলফাস্টে যেয়ে পাল্টা বোমা হামলা করেনি। কিংবা ৮০’র দশকে যখন নিকারাগুয়াকে সামরিক ও অর্থনৈতিক হামলায় আমেরিকা জর্জড়িত করেছিলো, সেই নিকারাগুয়া কিন্তু আমেরিকাকে পাল্টা আক্রমণ করে নি, বরং আন্তর্জাতিক আইনের দ্বারস্থ হয়েছিল। ভেনিজুয়েলা বা কিউবা আমেরিকার দীর্ঘদিনের নিশান, কিন্তু এমনটা যদি হয় কিউবা’র সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্রাস্ট তাকে হত্যার ষড়যন্তের কারণে মিয়ামিতে বা আমেরিকার অন্য কোনো স্টেট’এ হামলা করতো? এমনটা নিশ্চই চিন্তার খোরাক। ৯/১১ নিঃসন্দেহে আমেরিকার ইতিহাসে ১৮১২ সালের পর এই প্রথম বহিঃশত্রু দ্বারা নিজভূমিতে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। যদিও অনেকেই বলবেন পার্ল হারবার আক্রমণের কথা, কিন্তু এটা মনে রাখা উচিত হাওয়াই অঞ্চল আমেরিকার একটি উপনিবেশিক সামরিক ঘাঁটি, আমেরিকা মূল ভূখণ্ড কিন্তু নয়।

মানবাধীকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা সহাবস্থান এই এই গালভরা শব্দগুলো আমরা পেয়েছি মূলত পশ্চিমা বা আমেরিকার দ্বারা। ইতিহাস ঘাটলেই দেখতে পাই আমেরিকা মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এই শব্দগুলোকে পুঁজি করেই মূলত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে তাদের অভ্যন্তরীন বিষয়ে নাক গলিয়েছে, যার গালভরা নাম ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ বা ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’ বা ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা’, যার মার্কিন নীতিগত নাম ‘লো ইন্টেন্সিটি কনফ্লিক্ট’ সৃষ্টি করা। তো ব্যাপারটা হলো যে রাষ্ট্রটি পৃথিবী জুড়ে নিজেদেরকে শান্তির ঝান্ডা বাহক ও বৈশ্বিক পুলিশ হিসেবে জাহির করে, তাদের এই ৯/১১ ঘটনায় ইতিহাসকে অন্যভাবে লিখার বা সৃষ্টির সুযোগ ছিল কি না? ‘ঢিল মারলে পাটকেল’টি  ছুড়তে হবে’ এমনটা না করে অন্য পথেও তো হাঁটা নিশ্চই যেত।
প্রেসিডেন্ট বুশ তার ১৬ সেপ্টেম্বর ২০০১’এর ভাষণে উল্ল্যেখ করেছিলেন “আমেরিকার শুধুমাত্র একটি যুদ্ধ আশা করা উচিত হবেনা , বরং একটি দীর্ঘ প্রচারণার জন্য প্রস্তুত হওয়া উচিত যা আগে আমরা কখনো দেখিনি” (Habeas Corpus After 9/11 : Confronting America’s New Global Detention System)। ৯/১১ প্রতিআক্রমণ স্বরূপ আমরা প্রথম দেখলাম আফগানিস্তান ও পরে ইরাক আক্রমণ। মার্কিন সরকারের তরফ থেকে এই যুদ্ধের নাম ছিল “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” অর্থাৎ আল কায়েদা ও তাদের গুরু বিন লাদেনকে পরাস্ত করা। কিন্তু ১৬ সেপ্টেম্বরের নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে জানা যায়, আমেরিকা পাকিস্তানকে নির্দেশ  করে পাকিস্তান যেনো আফগানিস্তানে খাদ্য সাহায্য বন্ধ করে দেয়। আমেরিকা পাকিস্তানকে নির্দেশ দেয় তারা যেন আফগানের সাধারণ নাগরিকদের জন্য পাঠানো খাদ্যবাহী কনভয়গুলো সরিয়ে আনে, যা কিনা আফগানিস্তানের তালিবানদের নির্যাতিত কয়েকলাখ ক্ষুধার্থ মানুষের জন্য। যে মানুষগুলো এরই মধ্যে তালিবানদের নির্যাতনে জর্জরিত খোদ মার্কিন সরকার নির্দেশ দিচ্ছে সেই মানুষগুলোর জীবন আরো বিভীষিকাময় করে তুলতে। এটা ঠিক কোন ধরণের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তা ভাববার বিষয়। এই যে সাধারণ নিরীহ আফগানিদের শায়েস্তা করার কর্মপন্থা এটা কি সন্ত্রাসী কর্মের অংশ নয়।

দুই দশকের এই যুদ্ধে ও বিন লাদেন হত্যায়  এই হত্যায় ও চলমান যুদ্ধের প্রতিফল হিসেবে এখন পৃথিবী জুড়ে উগ্র ইসলামী দল বা সংগঠন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি, এবং এর প্রভাব শুধু আফগান, আরব বা পাকিস্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং আরো অনেক প্রতিবেশী দেশ ও অন্যান্য স্থানেও পড়েছে। আবু গরীবে আল কায়েদার যে উচ্চপর্যায়ের নেতারা  আটক ছিল তাদের একটা অংশই আরব বসন্তের সময়ে সিরিয়ার স্বৈরশাসক আসার বিন আসাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে, এবং আমেরিকা তার সেই পুরানো মন্ত্র ‘শত্রুর শত্রু আমার আমার বন্ধু’ নিয়ে বাসর আল আসাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের সামরিক সাহায্য দিতে থাকে। এবং অচিরেই এই বাসর বিরোধী বিপ্লবীরাই আইএসআই হিসেবে সামনে আসে (The True Origins of ISIS, By Hassan Hassan, The Atlantic)। শুধুমাত্র ইরাকেই ২০০৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ৬,৬০৮ টি সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে,  আফগানিস্তানে ২০০৭ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত মোট ১৯,৫৯৯ টি সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। ইউএস ডিপার্টমেন্ট লোড স্টেট’এর তথ্য অনুযায়ী শুধু তাদের তালিকাতেই আছে ১০০ অধিক সন্ত্রাসী সংগঠন, যার মাঝে ৯/১১ পরেই সৃষ্টি হয়েছে ৫৫টি (www.statista.com , Terrorism: Facts and statistics)। আমরা যদি বাংলাদেশের গত দুই দশকের ঘটনা ঘাঁটি তবে দেখতে পাই যে বিপুল সংখ্যক  একটা জনগোষ্ঠী এই তালিবান দ্বারা প্রভাবিত ও উজ্জীবিত। বাংলাদেশের জেএমবি, আনসারুল্লাহ, হরকাতুল জিহাদ বা পরে বাংলাদেশ মূলত সৃষ্টি হয়েছে এই আফগান তালিবানদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, এবং এদের মূল হোতাদের অনেকেই ছিল আফগান যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী। কেউ হয়তো ৮০’র দশকে রাশিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে আবার কেউ ৯/১১ পরে  এই যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলো। যারা পরবর্তীতে দেশে ফিরে  এসে জঙ্গি তৎপরতায় ও উগ্রবাদী সংগঠন সৃষ্টিতে মনোযোগ দেয়। ২০১৬’র হোলি আর্টিজান সন্ত্রাসী হামলায়  যে সন্ত্রাসীরা অংশগ্রহণ করেছিল তারা সবাই মূলত এই তালিবান বা পরবর্তীতে সৃষ্টি আইএসআই মতাদর্শে দীক্ষিত।

নূরেমবার্গ ট্রায়ালে নিযুক্ত প্রধান কাউন্সিল মার্কিন এটর্নি জেনারেল রবার্ট হেইচ জ্যাকসন আগ্রাসনকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এভাবে, আগ্রাসক বা আগ্রাসনকারী হলো সেই রাষ্ট্র যে প্রথমেই যুদ্ধ ঘোষণা করে বা করা ব্যতিরেকেই যে রাষ্ট্রটি তার সেনাবাহিনীকে দিয়ে আরেকটি রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের সীমা লংঘন করে সেখানে আক্রমণে লিপ্ত হয়। এই ব্যাখ্যানুযায়ী বুশ প্রশাসন ও পরবর্তীতে ওবামা সেই সামরিক আগ্রাসনের কাজটি’ই করেছেন প্রথমে আফগানিস্তান ও পরে ইরাক আক্রমণের মধ্যে দিয়ে। এই সামরিকায়ন এবং কর্তৃত্ববাদী আগ্রাসন শুধু যে আরব ও সেন্ট্রাল এশিয়াতে নিজের কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা তা নয়, এর সঙ্গে জড়িত আছে ট্রিলিয়ন ডলারের অস্র বাণিজ্য। এটা তো বলাই বাহুল্য যে সামরিক সরঞ্জাম ও যুদ্ধাস্র মার্কিন বৈদেশিক আয়ের একটা বিশাল অংশ, এবং আমেরিকার ফেডারেল বাজেটের বিরাট একটা অংশ বরাদ্দ হয় এই সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে। চার্লস কাপচান তার The Persian Gulf and the West গ্রন্থে মার্কিন ও তার মিত্রদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর ভূরাজনীতিতে তাদের যে ধারাবাহিক সামরিকায়ন এবং কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করেছে তার বিস্তর বর্ণনা পাওয়া যায়।

এই যুদ্ধে যারা আটক হয়ে আবু গরিব বা গুয়ান্তামো-বে প্রিজনে বন্দী হিসেবে ছিল তাদের এই আটক করা এবং কোনোরকম স্বচ্চপ্রক্রিয়া ছাড়াই বছরের পর বছর নির্যাতন পুরোটাই ছিল মানবতার চরম লঙ্ঘন। ACLU বা আমেরিকান  সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন যারা মার্কিন সরকারের নিয়মবহিঃর্ভুত কাজগুলোর কড়া সমালোচক, বহুদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে গুয়ান্তামো বে’র অবৈধ কারাগার ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে। তাদের তথ্যানুযায়ী ২০০২ এর ১১ জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠা করা অব্দি, ৮০০’এর বেশি মানুষকে এই কারাগারে নিয়মবহিঃর্ভুত ও আন্তর্জাতিক মানবধিকার আইনের কোনই তোয়াক্কা না করে জঘন্য নির্যাতন করা হয়েছে (GUANTÁNAMO BY THE NUMBERS; aclu.org)। শুধু তাই নয় এই নির্যাতন নিয়ে যেন কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেয়া যায় সে জন্য ২০০২ এর জানুয়ারিতে আফগানিস্তান কে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিয়ে জেনেভা কনভেনশন থেকে বাদ দেয়া হয় (Habeas Corpus After 9/11 : Confronting America’s New Global Detention System)। কারণ, তাহলে এই বন্দীদের নির্যাতন প্রক্রিয়াকে জেনেভা কনভেনশনের আওতায় এনে আর বিচারের মুখোমুখি করা যাবে না। ইরাক যুদ্ধের বন্দিদের আবু গরিব কারাগারে ঠিক এমন অবনবিক ভাবেই নির্যাতন করা হয়েছে। মানবাধিকারের নূন্যতম বিধিনিষেধ এখানে মানা হয়নি। Eric Fair যিনি আবু গরিব কারাগারে বন্দিদের জিজ্ঞাসাবাদের কাজে নিযুক্ত ছিলেন, তিনি তার দেয়া এক সাক্ষাৎকারে  ( এই সাক্ষাৎকারটি ৪ এপ্রিল ২০1৬ প্রকাশ হয়, যা সবটুকু পড়া মানসিক ভাবে খুবই পীড়াদায়ক)  এই বিতর্কিত বন্দীশালার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, “আমরা মানুষকে শুধু শারীরিকভাবেই আঘাত করি না। আমরা তাদের আবেগগতভাবে/ মানসিকভাবে  ধ্বংস করেছি, এবং … আমি মনে করি,  এটি আমাদের জন্য একটি ন্যায়সঙ্গত শাস্তি হবে যে আমরাও যদি এখন এর কিছু পরিণতি ভোগ করি।” (https://www.npr.org/sections/parallels/2016/04/04/472964974/it-was-torture-an-abu-ghraib-interrogator-acknowledges-horrible-mistakes)

এখন আসি এই ৯/১১’র ঘটনায় যে নিরাপরাধ প্রাণগুলো ঝরেছিল তাদের পরিবার ও যারা ঐদিন প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়েছিল তাদের জীবনে এই ঘটনার প্রভাব কি পড়েছিল বা এখনো আছে তা আমরা কি দিয়ে পরিমাপ করবো। রাষ্ট্রের সন্ত্রাসের বলি এতগুলো প্রাণ কেন হলো? মার্কিন সামরীকরণের ফলাফল শুধু যে আক্রান্ত দেশ বা ভূখণ্ডের জনগণের জীবনে’ই
প্রভাব ফেলছে বললে সঠিক মূল্যায়ন হবে না, খোদ আমেরিকার জনগণ ও বিশ্বজুড়ে অগণিত মানুষ এর ভুক্তভুগী। ৯/১১ ঘটনাটা ঐদিন যারা প্রাণে বেঁচে গিয়েছে বা প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিল কিভাবে তাদের মনে এর প্রভাব সে প্রথমদিন থেকে এখনো বিরাজ করছে বা সেই দুঃস্বপ্ন তাদের তাড়া করে ফিরছে তার একটা বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় Yael Danieli and Robert L. Dingman সম্পাদিত, ‘On the Ground after September 11’ বইটিতে। এত বছর পরে এসেও সেইদিনের প্রতক্ষদর্শীরা এক বিভীষিকার স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন, এদের অনেকেই আর কোনোদিন সুস্থ জীবনে ফিরে যেতে পারেনি। কেউ চিরদিনের মতো বেকার হয়েছে, কেউ ডিপ্রেশনে, কেউ কেউ আত্মহনন’ও করেছে। যে সৈন্যরা এই যুদ্ধে (আফগান ও ইরাক) অংশ গ্রহণ করেছে তাদের বিশাল সংখ্যক সৈন্য ‘পোস্ট ট্রামটিকে স্ট্রেস ডিস-অর্ডার’ (পিটিএসডি) তে ভুগছে, বহু সৈন্য আত্মহননের মতো পথ’ও বেছে নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়াতে এই নিয়ে তদন্ত করতে রয়েল কমিশন পর্যন্ত গঠন করা হয়েছে।
দুই দশক পরে তাই আমরা বলতেই পারি এই যুদ্ধটা ছিল মানবতার এক চরম বিপর্যয়, যা চেষ্টা করলেই এড়ানো যেত।

মিতা চৌধুরী
লেখক, চিত্রশিল্পী, সংগঠক
মেলবোর্ন প্রধান, প্রশান্তিকা।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments