সেপ্টেম্বর ইলেভেনের দুই দশক ও আমার খেরো খাতা । মিতা চৌধুরী

  •  
  •  
  •  
  •  

তখন আমি আমার কৈশোরের শেষের দিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। সেইদিনের কথা আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, নাইন ইলেভেন বা সেপ্টেম্বর ইলেভেন যাই বলি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এই একটি দিনের ঘটনা সমগ্র মানবজাতির ইতিহাস চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে। আমরা যারা বিশেষ করে ওই সময়ে সদ্য তারুণ্যে পা দিচ্ছিলাম, তারা খুব নির্মমভাবে ইতিহাসে সাক্ষী হয়েছি, চিরচেনা পৃথিবীকে নির্মমভাবে বদলে যেতে দেখেছি।

সেদিন রাতে/ সন্ধ্যায়, ঠিক কয়টা তখন আমার মনে নেই, আমরা রাতের খাবার খেতে বসেছি। আমি তখন চারুকলার ভর্তি কোচিং করছি, কোনো কারণে ঐদিন আমি কোচিং শেষ করে আর গাজীপুর ফিরতে পারিনি, আমার মেজবোনের মালিবাগের বাসায় চলে গিয়েছিলাম। রাতের খাবার টেবিলে আমরা সবাই, টিভিটা অন ছিল; যেটা বিবিসি নিউজ চ্যানেলে ছিল। হঠাৎ দেখলাম টিভি পর্দায় দুটো আকাশচুম্বী ভবনে প্রথম একটি বিমান পরে আরো একটি বিমান ঢুকে গেলো। টিভিটার শব্দ ঠিক মতো শুনতে পারছিলাম না আর লেখাও দূর থেকে পড়তে পারছিলাম। প্রথম ভাবলাম হলিউডের নতুন সিনেমার ট্রেইলার! বারবার দেখাচ্ছিলো, তাই খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে টিভির কাছে গিয়ে দেখলাম ব্রেকিং নিউজ, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বিমান হামলা বা সন্ত্রাসি হামলা, এরকম কোনো একটা শিরোনাম। কুড়ি বছর আগে সেইদিন টিভির সামনে দাঁড়িয়ে বোধ করি কেউই সামান্যতমও অনুমান করেনি, সেইদিনের পর থেকে এই পৃথিবী চিরদিনের জন্য বদলে যাচ্ছে।

ওসামা বিন লাদেন।

সেই হামলার কারণে আল কায়েদা ও এর প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে এর জন্য আমেরিকা দায়ী করলো এবং আল কায়েদা ও ওসামা বিন লাদেন এর দ্বায় স্বীকার করলো। তবে এখানে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, এই দ্বায় স্বীকার কি নিজেদের বীরত্ব ফলানোর চেষ্টা ছিল, না কি আসলেই দ্বায় তাদের। যাই হোক এই হামলার প্রতিআক্রমণ স্বরূপ আমরা আমেরিকার আফগানিস্তান দখল থেকে শুরু করে বিন লাদেনের পতন সবই এই দুই দশকে দেখেছি। এবং দুই দশক পরে এসে আমেরিকা ও তার মিত্রদের কোনোরকম প্রতিকার ছাড়াই আফগানিস্তান আবার সেই তালিবানদের হাতেই ছেড়েও দিয়ে আসতে আমরা দেখছি। ৩১ অগাস্ট আফগান মাটি থেকে আমেরিকার শেষ সৈন্যকে প্রত্যাহারও আমরা করতে দেখেছি।

এই যে দুই দশকের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ চললো আফগানিস্তানে, দুই দশক পরে আমরা নিশ্চয়ই এর খেরো খাতাটা নিয়ে বসতে পারি! তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করে প্রথমে আফগানিস্তানে ও পরে ইরাকে; আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও ন্যাটোর দেশগুলো অভিযান চালালো বছরের পর বছর জুড়ে। বিবিসি নিউজের ১৬ অগাস্ট ২০২১ এর সংবাদ মোতাবেক, ২০০১ সালে এই যুদ্ধ শুরু থেকে ২০১৯ পর্যন্ত মোট $৭৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়েছে এই যুদ্ধের যোগান দিতে, ২০২১ সালে এসে সংখ্যাটা নিশ্চয়ই আরো অনেক বেশি। দুই দশকের এই যুদ্ধে এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত আমেরিকার সৈন্য নিহত হয়েছে ২৪৪৮ জন, আমেরিকার কন্ট্রাক্টর নিহত হয়েছে ৩৮৪৬ জন, আফগান মিলিটারি ও  পুলিশ নিহত হয়েছে ৬৬০০০ জন, মার্কিন মিত্রদেশের সৈন্য ১১৪৪ জন, আফগান জনগণ ৪৭,২৪৫ জন, তালিবান ও তাদের মিত্র ৫১,১৯১ জন, ত্রাণ কর্মী ৪৪৪ জন সাংবাদিক ৭২ জন (সূত্র: কস্ট অফ ওয়ার, ব্রাউন ইউনিভার্সিটি ইউএসএ, ২০২১) ।  দুই দশকের এই যুদ্ধে ৪,৬৬৪,০০০ মানুষ গৃহহীন হয়েছে , ইউএন রিফুজি সূত্র বলছে আফগান যুদ্ধে ৫ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে যারা আর কখনো নিজ ভিটায় ফিরতে পারেনি এবং ২.৩ মিলিয়ন মানুষ রেফিউজি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের (২০২০) তথ্যানুযায়ী আফগানিস্তানের দারিদ্র হার বেড়েছে ৭২%’এ, সেই সঙ্গে আইএমএফ বলছে ২০২০ নাগাদ আফগানিস্তানের প্রবৃত্তির হার ৫% হ্রাস পাবে। বিশ্বব্যাংকের একই প্রতিবেদন বলছে যে, প্রায় ৫০% আফগানী নিরক্ষর এবং এর ৭৬.৬% দরিদ্র, বেকার জনগোষ্ঠী প্রায় ৪০%। বিদেশি সাহায্যের কারণে বেশ কিছু ক্ষেত্রে যেমন স্বাস্থ্য, জনপ্রশাসন ও শিক্ষাক্ষেত্রে কাজের বাজার তৈরি করলেও মূলত এই বিদেশি সাহায্যের সঠিক ও সুষম বন্টন হয়নি।

হিউমান রাইটস ওয়াচের অ্যাসোসিয়েট এশিয়া ডিরেক্টর প্যাট্রিসিয়া গোসমান তার How US-Funded Abuses Led to Failure in Afghanistan রিপোর্টে বলেন যে, গত দুই দশকে বিদেশি সাহায্যে আফগানিস্তান কিছু সফলতা পেয়েছিলো কিন্তু এই সাফল্যগুলো ছিল ভঙ্গুর ও সীমিত, একইসঙ্গে প্রচন্ডরকমের সহিংসতা এবং অপব্যবহারের ব্যাপক অভিযোগ আছে এই তহবিলগুলোর ব্যবহারে।

এই ২০ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তৈরির চেয়ে স্বল্পমেয়াদী সামরিক লাভকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা এবং মানবাধিকার সুরক্ষা মার্কিন মিশন এবং ২০০১-এর পরবর্তী মার্কিন এলাকা নির্মাণের প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পর্যাপ্ত ও টেকসই বেসামরিক সুরক্ষা ছাড়া শুধুমাত্র বিমান হামলার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা পূরণের জন্য অবমাননাকর যুদ্ধবাজদের উপর নির্ভর করা এবং পাইকারি দুর্নীতি এবং অধিকার লঙ্ঘনকে ব্যাপকভাবে উপেক্ষা করা, আমেরিকা ও আফগান সরকারের গভীর অসন্তোষ ও অবিশ্বাসকে বাড়িয়ে তোলে! যা মূলত আফগানিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে তালেবানদের জন্য একটা অনুকূল স্থান লাভ করা অনেক সহজ করে দিয়েছে।
আর একারণেই আগস্টের ১৫ তারিখে বিশ্ববাসী, কোনো প্রতিরোধ বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তালিবানদের কাবুলসহ সমগ্র আফগানিস্তান আবারো দখল করতে দেখলো। দেশের রাষ্ট্রপতি আশরাফ ঘানি নিজ দেশের হাজার হাজার জনগণকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতে ঠেলে দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের বরাত দিয়ে গুজব চলছে পালিয়ে যাওয়ার সময় রাষ্ট্রপতি আশরাফ ঘানি বিপুল পরিমান অর্থসহ পালিয়েছিলেন। বিবিসির এক সাম্প্রতিক প্রতিবেন বলছে মার্কিন ও বৈদেশিক সাহায্যে আফগান সরকার যদিও তাদের সামরিক শক্তি ও ক্ষমতা বৃদ্ধির নাম করে বলছিলো তাদের সৈন্য সংখ্যা তিন লাখের উপরে কিন্তু বাস্তবে মূলত এটা ছিল একটি মিথ্যা সংখ্যা যার মূল উদ্দেশই ছিল বৈদেশিক সাহায্য লাভ, প্রকৃত সৈন্যের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারের মতো।

সঙ্গত কারণেই আমরা বলতে পারি এত রক্তক্ষয় ও জীবনের বিনিময়ে গত দুই দশক ধরে “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” নাম যা চলছিল তার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েই যায়। দুই দশক ধরে চলা এই মার্কিন ও তার মিত্রদের অভিযানের ফলে আফগানিস্তানের আপামর বা তৃণমূল জনগণের জীবন যাত্রায় তেমন কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি বা দীর্ঘ মেয়াদি কোনো সাফল্যও আসেনি।

আমার নিজ পড়াশুনার কারণেই আমাকে সাম্প্রতিক সময়ে এই সেপ্টেম্বর ইলেভেনের পরবর্তী নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছিল। সেপ্টেম্বর ইলেভেনের দুই দশক উপলক্ষে তাই  আমার আজকের এই লেখা, যা আমি চেষ্টা করেছি শুধু সেপ্টেম্বর ইলেভেনের পরবর্তী সময়ে শুধু নয় এর পূর্বের ইতিহাসেও নজর দিতে।

সেপ্টেম্বর ইলেভেনের পটভূমি ও মার্কিন অতীতের দ্বায় :
মার্কিন ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক প্রফেসর নোম চমস্কি তার ৯/১১ গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন যে, সেপ্টেম্বর ইলেভেনের ঘটনা নিঃসন্দেহে একটি জঘন্য ঘটনা কিন্তু আমেরিকাকে আমরা একই সঙ্গে নিছক নিরীহ শিকার বলতে পারিনা। অন্তত আমেরিকার অতীত ইতিহাসে চোখ বুলালে নয়। আর এমনটা বলার কারণ কিন্তু নিছক কোনো কথা নয়। নোম চমস্কি বা তাঁর মতো ব্যাক্তিরা যারা খুব নিরপেক্ষ ও নিবিড়ভাবে এবং নিরাবেগভাবে ইতিহাসকে পর্যালোচনা করেন তারা সকলেই একমত যে, সেপ্টেম্বর এলেভেনর ন্যাক্কারজনক এই ঘটনায় আমেরিকাকে আমরা নিরীহ শিকার বলতে পারিনা, বরং তা মার্কিন সম্রাজ্যবাদের দীর্ধদিনের কর্মকান্ডের প্রতি-আক্রমণ।
Western State Terrorism নামক সম্পাদনা গ্রন্থে সম্পাদক আলেকজেন্ডার জর্জ ফিশ উল্লেখ করেছেন যে কিভাবে প্রথাগতভাবে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো তাদের শক্তি বা ক্ষমতাকে অন্য রাষ্ট্রের উপর দমন ও হুমকি হিসেবে ব্যবহার করেও তাকে সন্ত্রাস হিসেবে আখ্যা করে না, অপরদিকে ঠিক একই কারণে অন্য রাষ্ট্র’র কর্মকান্ডকে শক্তিমান রাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদী হিসেবে তকমা দেয়। আমরা ইতিহাস ঘাটলে দেখতে পাবো যে, পশ্চিমা শক্তি ( আমেরিকা ও তার মিত্ররা ) বিভিন্ন অজুহাতে বিভিন্ন সময়ে অন্য রাষ্ট্রের উপর তাদের খবরদারি ও অভ্যন্তরীন বিষয়সমূহে নাক গলিয়ে আসছে। কখনো এর নাম দিয়েছে, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, কখনো’বা বলেছে মানবিক হস্তক্ষেপ, কখনো’বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ; কিন্তু উদ্দেশ্য ও কারণ মূলত এক হেনরী ও অভিন্ন ।

আফগানে তালিবান বা আল কায়েদার উত্থানের ব্যাখ্যার আগে আমি একটু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ৯০’র রাশিয়ার পতন পর্যন্ত শীতল যুদ্ধের দিকে নজর দিতে চাই। বলা হয়ে থাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যত যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে মূলত তা সবই মার্কিন ও রাশিয়ার মধ্যকার প্রক্সি-যুদ্ধ, এবং তা সেই কোরিয়ান পেনিনসুলা থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম বা আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ইরাক ইরান যুদ্ধ ও সর্বশেষ ছিল আফগানিস্তানে তথাকথিত রাশায়ন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭ তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন

৯/১১ কিন্তু পৃথিবীর বুকে এই প্রথম ছিল না, বরং এটা আমেরিকারই তৈরি পুরোনো ইতিহাস। নিক্সন সরকার ঘটিয়েছিলেন ইতিহাসের প্রথম ৯/১১ ১৯৭৩ সালে। ঐদিন আমেরিকা তার দীর্ঘদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ও লেগে থাকার ফলাফল হিসেবে চিলির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান সালভাদোর আলেন্দেকে হত্যার মাধ্যমে  উৎখাত করতে সফল হয় ও সামরিক শাষক জেনারেল পিনোশের ক্ষমতায়ন ঘটায়। ১৯৭৩ এর ৯/১১ অবশ্য ইতিহাসে তেমন গুরুত্ব পায়নি, যেহেতু অপকর্মটি সংগঠিত হয়েছিল আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদদে। খোদ হেনরী কিসিঞ্জার স্বয়ং, ঘটনার কিছুদিন পরে বলেছিলেন, “খুব বিরাট কিছু ঘটে নি”! মূলত ১৯৬২ সালে প্রেসিডেন্ট কেনেডি আঞ্চলিক নিরাপত্তার নাম যে ভূঞা আশঙ্কার ধোঁয়া সৃষ্টি করতে সফল হয়েছিল, পৃথিবী জুড়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অযাচিত উপস্থিতি আসলে তারই ফসল। আমেরিকা দীর্ঘ দিন ধরে অক্লান্ত ও নিরবিচ্ছিন্নভাবে লেগে থেকে সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকাকে অস্থির করে তুলতে সফল হয়েছিল। দক্ষিণ আমেরিকা বা ল্যাটিন আমেরিকা যাতে নিজ দেশের সম্পদের ও জনগণের উপর কর্তৃত্ব গ্রহণ না করতে পারে এটি আমেরিকার মূল লক্ষ্য, আর তাই আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিক্সন বলেছিলেন ‘ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। মূলত বিষয়টা হচ্ছে, আমেরিকা যদি নিজ অঞ্চলের উপরেই অর্থাৎ নাকের ডগায় বসে থাকা ল্যাটিন আমেরিকাকেই বশে আনতে না পারে তবে দুনিয়ার অন্য প্রান্তে নিজেদের কর্তৃত্ব কায়েম করাটা দুরূহ হয়ে যাবে। এবং বলা বাহুল্য কিউবা বা ভ্যানিজুয়েলার মতো যে দেশগুলোতে আমেরিকা নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি সেখানে তারা নিরবিচ্ছিন্নভাবে এখনো সিআইএ ও তার বিভিন্ন এজেন্টগণ তৎপর আছে। এরপর আমেরিকা লাগাতারভাবে নিকারাগুয়াকে অস্থির করে তোলে, তাদের অভ্যন্তরীন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অচল করেদিতে ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে আমেরিকা দিনের পর দিন সেখানে সিআইএ’কে নিযুক্ত রাখে। আশির দশকে আরব অঞ্চলে লেবাবন, মিসরসহ আরো বেশ কিছু দেশে আমেরিকা তাদের খবরদারীর সঙ্গে ল্যাটিন আমেরিকায় নিকারাগুয়া হচ্ছে মার্কিন আক্রমণ ও হামলার চরম বলি। লাখখানেক মানুষ নিহত হয়েছে আমেরিকার এই লাগাতার হামলায়। সীমিত আয়ের একটি দেশ নিকারাগুয়া, পুরো দেশটা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং যার প্রভাব এখনো চলছে। আমেরিকার লাগাতার এই হামলার সঙ্গে ছিল নিকারাগুয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক যুদ্ধ। আমেরিরক এই লাগাতার হামলা ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে নিকারাগুয়া শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আদালদের শরনাপন্ন হতে হয়েছিল। এবং আমেরিকা খুব কৌশলে নিকারাগুয়ার এই ইতিহাসটি সবসময় চেপে যায়, কারণ এই ইতিহাসটি হলো ‘আমেরিকা’ই একমাত্র দেশ, যাকে আন্তর্জাতিক আদালত হেগ ও নিরাপত্তা পরিষদ তার সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বন্ধের নির্দেশ দেন ও ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেন ‘, এবং যা আমেরিকা পূরণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরিষ্কার ভাষায় যা দাঁড়ায় তা হলো, সভ্য ইতিহাসে আমেরিকায় একমাত্র দেশ যে আন্তর্জাতিক আদালত হেগ ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে রায় পেয়েছে। আমেরিকায় আদালত স্বীকৃত একমাত্র সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। আশাকরি  আমেরিকা কেন নিকারাগুয়ার সঙ্গে তাদের ইতিহাসটা মাটিচাপা দিয়ে রাখে তা পাঠক পরিস্কারভাবেই বুঝতে পারছেন।

আমেরিকার অদূর অতীতের ইতিহাস ও কার্যকলাপে চোখ দিলে আমরা একটা বিষয়ে খুব পরিষ্কার হই, আর তা হলো আমেরিকা তার নিজ প্রয়োজনেই কাউকে ক্ষমতাধর ও শক্তিশালী করে এবং পরবর্তীতে যখন প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় তখন তাকে বা সেই শক্তিকে সন্ত্রাসী, দানব বা শয়তানের তকমা দেয়। যেমনটা হয়েছিল দক্ষিণ ভিয়েতনাম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে সেই দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিরুদ্ধেই আমেরিকা যুদ্ধ করে। এরপর ইরাক ইরান যুদ্ধে ইরানকে শায়েস্তা করার জন্যই স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনকে আমেরিকা বেছে নেয় ও অতিদানবে পরিণত করে। আমেরিকার অর্থে, প্রযুক্তিতে ও সাহায্যেই সাদ্দাম হোসেন নিজ ক্ষমতা ধরে রাখতে কয়েকলাখ কুর্দ ও বেদুইনকে হত্যা করেন। এবং পরবর্তীতে  যখন ১৯৯১ সালে এসে সাদ্দাম হোসাইন কুয়েত দখল করেন তখন আমেরিকা সুযোগ পেয়ে যায় সাদ্দাম হোসাইনকে আক্রমণের। ঠিক এভাবেই ১৯৭৮ থেকে আমেরিকা সরকার ও প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার আফগানিস্তানে তাদের কন্সপিরেসি চালাতে থেকে রাশিয়া আফগানিস্তান দখল করে নিচ্ছে ও সমাজতন্ত্র কায়েম করছে, যা ১৯৭৯ তে এসে বাস্তবে রূপ দিতে থাকে। তখন আমেরিকা তার সিআইএ ও পাকিস্তানের আইএসআই দ্বারা আফগান জনগণের মাঝে মুজাহিদিন মতবাদ মগজধোলাইয়ের মাধ্যমে ঢুকাতে থাকে। পাকিস্তানের সাবেক স্বৈরশাষক পারভেজ মোশারফের লিখা ‘In The Line of Fire’ আত্মজীবনীতে এর যথেষ্ট প্রমান তিনি নিজেই দিয়েছেন। বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে সিআইএ তখন আফগান জনগণকে ধর্ম যুদ্ধ বা জিহাদে উদ্ভুত করতে থাকে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্ররোচনা হিসেবে। আমেরিকা’ই মুজাহিদিন আফগান তৈরী করেছিল নিজ অর্থে ও প্রযুক্তিতে যারা পরবর্তীতে তালিবান, আমেরিকাই আফগান জনগণের মাথায় ঢুকিয়েছে ইসলামে সমাজতন্ত্র নাই, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলে ইসলামের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না, সুতরাং ইসলাম রক্ষার কারণে হলেও রাশিয়াকে পরাস্ত করতে হবে। স্বাভাবিক ভাবেই ধর্মের মতো এইরকম একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে আফগান জনগণ লুফে নেয়, তারা রাশিয়াকে আফগান ছাড়া করে। আমেরিকা তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আফগানিস্তান থেকে বিদায় নেয়।

প্রফেসর এডওয়ার্ড সায়ীদ ও জন কুলি’র প্রবন্ধ আনহলি ওয়ারস (Unholy Wars) বইটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এই বইটিতে অতন্ত্য নিরপেক্ষভাবে যুক্তি ও প্রমানসহ লেখকদ্বয় আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদের ও নীতির একটি দলিল তুলে ধরেছেন। বইটিতে আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও তার সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা  ইজবিগনেভ ব্রজিজিনিস্কি (Zbigniew Brzezinski) শীতল যুদ্ধে রাশিয়াকে বশে আনতে ও আফগানে নিজেদের কর্তৃত্ব কায়েম করতে ‘আফগান ফাঁদ’ নামের যে মিথ তৈরী করছিলো ও সাফল্যের সঙ্গে রাশিয়াকে সেই ফাঁদে পা দিতে বাধ্য করেছিল তার বিস্তর বর্ণনা পাওয়া যায়। ১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে ফরাসি ম্যাগাজিন লে নওভেল অবজারভেটরকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে, সাবেক এই মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা  বলেছিলেন যে, “ইতিহাসের সরকারী সংস্করণ অনুসারে, মুজাহিদিনদের সিআইএ সহায়তা ১৯৮০ সালে শুরু হয়েছিল, অর্থাৎ ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সোভিয়েত সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে আক্রমণ করার পরে । কিন্তু বাস্তবতা, যা এখন পর্যন্ত গোপন রাখা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন: প্রকৃতপক্ষে, ১ ১৯৭৯ সালের ১ জুলাই প্রেসিডেন্ট কার্টার কাবুলে সোভিয়েতপন্থী শাসকদের বিরোধীদের গোপন সাহায্যের প্রথম নির্দেশে স্বাক্ষর করেছিলেন।“ (The Myth of the “Afghan Trap”: Zbigniew Brzezinski and Afghanistan, 1978–1979)

দীর্ঘ এক দশক ধরে সিআইএ ও আইএসআই যে উগ্র ধর্মীয় মতবাদের এক বিশাল মুজাহিদিন/জিহাদি/তালিবান বা আল কায়েদা তৈরী বা তোষণ করলো, তারা এই যুদ্ধপরবর্তী সময়ে কি করবে বা তাদের কি হবে সেই বিষয়ে সিআইএ বা খোদ মার্কিন সরকারপ্রধানরা কেউই চিন্তা করলো না। তালিবান বা বিন লাদেন, এ সবই ছিল মার্কিন ও তার মিত্রদের সেবক, এবং মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররা এই সেবকদের ততদিনই তোষণ করেগিয়েছে যতদিন তারা আমেরিকা ও তার মিত্রদের স্বার্থকে পরিবেশন করেছে। এই আফগান যুদ্ধের ফলে এরই মধ্যে তখন আল কায়েদা, তালিবান ও বিন লাদেনের মতো সংগঠন বা ব্যাক্তি তৈরী হয়ে গিয়েছে, যারা ততদিনে চরম ইসলামী চেতনায় উজ্জীবিত ও সেই সঙ্গে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নও দেখছে।

তালিবানদের সাম্প্রতিক আফগান মসনদ দখল।

এই তালিবান বা মুজাহিদীনরা তখন বিভিন্ন দেশে যেমন কসোভো, সার্বিয়া, চেচনিয়া, মিসর বা  পশ্চিম চিনে ছড়িয়ে পরে। কারণ ততদিনে বিন লাদেন বা এসব  মুজাহিদীনরা আমেরিকাকেই ইসলামের শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করে। আমেরিকা বিভিন্ন অজুহাতে বিভিন্ন দেশে তাদের শক্তি প্রদর্শন করাটা বিশেষ করে সার্বিয়া বা কসভোতে ন্যাটো তার প্রত্যক্ষ মদদে গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত করেছে। আর সেই বিষয়গুলোই আল কায়েদা বা বিন লাদেন সাধারণ মুসলিম জনগণের মাঝে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, আল কায়েদা বা বিন লাদেন সার্বিক অর্থে আরব অঞ্চলে একেবারেই জনপ্রিয় কেউ না বা বিন লাদেনকে তারা পছন্দও করতোনা। আমেরিকার দ্বারা নিরীহ মুসলিম নির্যাতিত হচ্ছে বা প্রাণ হারাচ্ছে এটাকেই পুঁজি করে আল কায়েদা বা বিন লাদেন পরবর্তীতে তাদের লোকবল ও শক্তি বাড়াতে থেকে।

নোম চমস্কি তার ৯/১১ গ্রন্থে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করেছেন, আর তা হলো আমেরিকা বা তার মিত্রদের পক্ষথেকে প্রায়সই বলা হয়ে থাকে যে, মূলত পশ্চিমা সংস্কৃতি, বাক স্বাধীনতা বা ধর্মীয়স হাবস্থান ভেঙে দিতেই তালিবানরা আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলা করেছিল। কিন্তু নোম চমস্কি এই যুক্তিকে অনেকটাই ঠুনকো হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন যে, মূলত আরব অঞ্চলের শাসকদের আমেরিকার তোষণকে বা সৌদি আরবে আমেরিকার উপস্থিতিকে লাদেন বা তার অনুসারীরা ঠিক আফগানিস্তানে রাশিয়ার অভিযান ও আগ্রাসনের মতোই দেখতো। এবং সেকারণে আল কায়েদা বা তালিবানদের চোখে ঐসকল আরব শাসকেরা ছিল অনৈসলামিক ও ঘৃণিত। অধ্যাপক চমস্কি আরো উল্লেখ করেন যে, পৃথিবীর বহু বাঘা বাঘা সাংবাদিকই বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার নেয়ার পর বলেছেন যে, সে (বিন লাদেন) সমসাময়িক বিশ্ব বা পশ্চিমা মূল্যবোধ বিষয়ে খুব একটা মাথা আসলে ঘামান না। বিন লাদেনের মূল আপত্তিটা ছিল আরব অঞ্চলে আমেরিকার উপস্থিতি ও বিভিন্ন আরব রাষ্ট্র প্রধানদের আমেরিকা তোষণ।

আমেরিকার প্রতি বা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আচরণের প্রতি বিশ্বব্যাপী যে একটা ক্ষোভ, তা পশ্চিমা সংস্কৃতি বা জীবনযাপনের রীতির প্রতি আরব, আফ্রিকা বা সমাজতন্তপন্থী দেশগুলোর নিছক ক্ষোভ এই বলে উড়িয়ে দেয়া যাবে না ! চিলি, কিউবা ও নিকারাগুয়ার বা ইরাক ও আফগানিস্তানের সঙ্গে অন্য যে দেশটির বারোটা বাজানোর কথা উল্লেখ করবো তা হলো সুদান। নিরাপত্তার ধোঁয়া তুলে সুদানের ১৯৯৮ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সুদানের আল শিফা ফার্মাসিটিকল নামের একটি ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে মিসাইল হামলা করে। এবং এখানে বলা বাহুল্য যে, যদি আমরা শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতির ও প্রাণহানির হিসেবে করি তবে তা হবে চরম অপরিপক্কতা। এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল সুদানের মতো দরিদ্র একটি দেশের জীবন রক্ষাকারী ঔষধের প্রধান উৎপাদক, ৯৫% ঔষধ এখানেই প্রস্তুত হতো, ম্যালেরিয়া বা টাইফয়েডের মতো মারাত্মক রোগগুলোর ঔষধ এই আল শিফা প্রস্তুত করতো।শুধু মানুষের জীবন রক্ষাকারী ঔষুধ’ই নয় প্রাণীর জীবন রক্ষাকারী ঔষুধ একমাত্র এই ঔষধ কারখানাটি’ই প্রস্তুত করতো। শুধুমাত্র এই একটি ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হওয়ায় পরের বছর সুদানে কয়েকলাখ মানুষ কলেরা, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়ার আক্তান্ত হয়ে ঔষুধের অভাবে মারা যায়। সুদানের সাবেক জার্মান রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন’ “আল শিফা ফার্মাসিটিকল ধ্বংস করার কারণে সুদানের মতো একটা চরম গরিব দেশে ঠিক কতজন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন এটা হিসেবে করে বের করাটা কঠিন, তবে লাখখানেক মানুষ হবেন ইটা একটা যৌক্তিক অনুমান (সূত্র: Werner Daum, “Universalism and the West”, Harvard International review, Summer 2001)

দশকের পর দশক ধরে এইযে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস সংগঠিত হচ্ছে শক্তিমান রাষ্ট্রের দ্বারা এতে যে মৃত্যুর পাহাড় গড়ে উঠেছে তার পাল্লাটা ৯/১১ এর চেয়ে অনেক বেশি ওজনদার। আমি এখানে একটি সন্ত্রাস দ্বারা আরেকটি সন্ত্রাসকে স্বীকৃতি দিচ্ছি না, কারণ মৃত্যু মৃত্যুই এর কোনো মাত্রা হতে পারে না। আর একথাও আমাদের অস্বীকারের কোনো উপায় নেই ৯/১১ নিঃসন্দেহে মানবতার বিরুদ্ধে চরম আঘাত। কিন্তু একজন সুস্থ ও চিন্তাশীল মাত্রই এইসব অপরাধগুলোর নেপথ্যের কারণ খুঁজতে চেষ্টা করবেন তা সে উগ্র মুজাহিদিন দ্বারাই হোক বা আমেরিকা, ব্রিটেন বা অন্যকোনো রাষ্ট্রীয় পক্ষেরই হোক।

প্রথম কিস্তির সমাপ্তি।

মিতা চৌধুরী
লেখক, চিত্রশিল্পী, সংগঠক
মেলবোর্ন প্রধান, প্রশান্তিকা।
মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments