সেলিব্রেটিং লাইফ -শিল্পী রহমান

  •  
  •  
  •  
  •  

‘সেলিব্রেটিং লাইফ’ কথাটা মনে ধরেছে বেশ।
কথাটা প্রথমে শুনেছিলাম আমার প্রিয় শিক্ষক, মেন্টর মার্গী ব্রাউন অ্যাশ এর কাছে। যখন উনার ভাই ক্যান্সারে মারা যান , তাঁর ফিউনেরেলের অনুষ্ঠানটির নাম দিয়েছিলেন ‘সেলিব্রেটিং লাইফ’। অর্থাৎ উনার জীবদ্দশায় উনি যা যা করেছেন তার একটা সেলিব্রেশন হবে উনার মৃত্যুর পরে। উনাদের পুরো পরিবার এবং বন্ধু বান্ধব একত্রিত হয়েছিল সেই ভাইয়ের বাসায়। রাতে ক্যাম্প ফায়ার জ্বলেছে এবং সেখানে সবাই গোল হয়ে বসে ভাইয়ের গুণকীর্তন দিয়ে অনুষ্ঠিত করেছে একটি সম্মানজ্ঞাপক অনুষ্ঠান। আমরাও খানিকটা এমনই করি, তবে একটু অন্যভাবে করি। যেই কাছের মানুষটা চলে যায় , তাঁর চলে যাওয়ার বিরহে কাঁদতে কাঁদতে  তাঁর ভালো কাজ বা কথাগুলোকে স্মরণ করি এবং এক অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিই সেই দুঃখের ভার।

মৃত্যু তো অনিবার্য , এর কোন বিকল্প নেই , সবাই মারা যাবো আমরা। এই সেলিব্রাটিং লাইফ কথাটাকে আরেকটু অন্যভাবে সাজালে কেমন হয়?  যেমন আমি বেঁচে থাকা অবস্থায় আমার যত্নে যদি একটা গাছে ফুল ফোটে, একটা মানুষের মুখে হাসি ফোটে, একটা মানুষের পেট ভরে, বা কারো গায়ে জামা ওঠে কিংবা একটা আটকে পড়া প্রজাপতি মনের আনন্দে ডানা ঝাপটে উড়ে বেড়াতে পারে, কিংবা আমি যেই কাজটা একদম পারিনা সেই কাজে একটু  অগ্রগতি হলো, পরান ভরে সূর্যাস্ত দেখলাম, নিজের বাড়ির ছাঁদে একটা অসাধারণ বিকেল কাটালাম – এমন একটা জীবন তো উদযাপনযোগ্য হতে বাধ্য ! নয় কি? এগুলো খুব সামান্য মনে হচ্ছে আমি জানি, কিন্তু আমার এই ক্ষুদ্র অবদান থেকে আমাদের যে পরিতৃপ্তি, ছোট ছোট প্রাপ্তিতে যে সুখ, তাকে ছোট করে দেখে এমন সাধ্য কার ? এই ছোট বিষয়গুলো নিয়েই কি হতে পারে না প্রতিদিনকার সেলিব্রেশন? কেন নয়?
“সেলিব্রেটিং লাইফ” হোক প্রতিদিনকার অভ্যাস।

শুরুর গল্পটাতে শব্দ দুটো ভিন্ন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হলেও, এখানে শব্দ দুটোকে অন্য দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করছি আমি। কারন আমরা যখন মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত থাকি তখন জীবনের ভালো দিকগুলো আমাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায় এবং সমস্যা বা নেতিবাচক অন্ধকারে ডুবে যেতে থাকি। কিন্তু ওই অন্ধকার সময়ে যদি “সেলিব্রেটিং লাইফ” এর অভ্যাসটা অনুশীলন করতে পারি তাহলে অনেক উপকার পাওয়া যাবে।
কৃতজ্ঞ মানুষেরা সাধারণত খুব সুখী, স্বাস্থ্যবান এবং একটা পরিপূর্ণতা নিয়েই জীবন যাপন করতে পারে। কৃতজ্ঞবোধ মানুষকে মানসিক চাপ মোকাবেলা করতে সাহায্য করে, এমনকি হৃদস্পন্দনেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।  এই প্রক্রিয়াটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে,   যারা প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে ৩ টি সুখের মুহূর্ত( ভালো কিছু) স্মরণ করে ডায়েরিতে লিখে ঘুমিয়েছে। কেবলমাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের হতাশা অনেকাংশে কমে গিয়েছে, এক  মাসের চর্চায় তারচেয়েও সুখী মানুষে পরিণত হয়েছে। গবেষণা করা হয়ছিল ৬ মাস পর্যন্ত এবং এর ফলাফল অভূতপূর্ব । এটা সারাজীবনের অভ্যাসে পরিণত হলে হতাশা দূরে  থাকবে বলে মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন।

প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে সর্বশেষ বিজ্ঞান পর্যন্ত বলে, কৃতজ্ঞতা আমাদের এবং আমাদের চারপাশের মানুষগুলোর জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি অনুশীলন। তবুও এটা আমাদের ভেতরে একটা স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া হয়ে গড়ে ওঠেনি এবং আমরা সাধারণত আমাদের জীবনের ভাল জিনিসগুলিকে প্রাপ্য (granted) বলেই ধরে নিই।গুরুত্ব দিতে চাইনা, ধরে নিই এমনই তো হবার কথা  ছিল বা এমন হওয়াই তো স্বাভাবিক। আর সেই কারণে এই স্বাভাবিক প্রাপ্তি গুলোতে মনোযোগ দেয়াই হয় না উল্টো স্বাভাবিকের বাইরে কিছু হলে বিরক্ত হই বা হতাশ হই, আর হতাশাগুলো দিনে দিনে বাড়তেই থাকে কারণ ওগুলোই আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয় বেশী  অথচ ওই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো আমাদের স্বস্তি দেয় বা ভালোলাগা দেয় কিন্তু তখন তাদের গ্রাহ্য করতে শিখিনি। সুতরাং কৃতজ্ঞ হওয়ার এই অভ্যাসকে সচেতনভাবে শিখে নিতে হবে।

যারা বাগান করে, প্রতিদিন নতুন পাতার বেড়ে ওঠা দেখতে পায়, কিংবা কলি থেকে ফুল, ফুল থেকে ফল, পুঁই লতা বা বাগান বিলাসের বেয়ে ওঠা দেখতে পায় যেই মানুষগুলি তারা কি পারে না জীবনের এই অপরিমেয় মুহূর্তগুলোকে মহিমান্বিত করতে?  যেই মুহূর্তগুলো ভালো লাগার, সেগুলোকে অতি সাধারণ গণ্য করে উপেক্ষা করে বেঁচে থাকলে জীবনের সঠিক মূল্যায়ন হয় না, এগুলো উদযাপনযোগ্য মুহূর্ত।  আমার বিশ্বাস যারা বাগান করে তাদের এই সেলিব্রেশনে কোন সমস্যা হবার কথা না। কিন্তু দিন শেষে এই মুহূর্তটাকে কি জীবনের একটা সুন্দর সময় বা ভালো দিন বলে গণ্য করি আমরা?
২৪ ঘণ্টায় লক্ষ্য করবার মতো অনেক ঘটনাই ঘটে যদি আমরা লক্ষ্য করতে চাই। এই লক্ষ্য করবার মুহূর্তগুলোকেই আমি বলতে চাই ‘সেলিব্রেটিং লাইফ’। কৃতজ্ঞতাবোধ, সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকবার জন্য গ্র্যাটিচুড অত্যন্ত জরুরী। প্রতিদিন করলে একটা অভ্যাসে পরিণত হবে।বিশেষ করে মানসিক ভাবে অনেক শান্তি ফিরে আসবে তাদের জন্য যারা অস্থিরতা বা হতাশায় ভুগছেন । আমরা দৈনন্দিন জীবনে আমাদের সমস্যাগুলো নিয়ে এমন ভাবে জড়িয়ে যাই যে, আশেপাশে ভালো যা কিছু হচ্ছে তা দেখবার অবকাশই পাই না।  আসুন ‘সেলিব্রেটিং লাইফ’ শুরু করি। বিশাল বড় কিছু না, ছোট ছোট বিষয়। যেমন ধরুন, অতিরিক্ত গরমের  সময় ইলেক্ট্রিসিটিটা চলে যায়নি বলে ঘরে ঢুকেই এসি বা ফ্যানের বাতাসে আরাম করতে পারছেন। কিংবা প্রচণ্ড গরমে ফ্রিজ খুলে দেখলেন বোতল ভর্তি ঠাণ্ডা পানি (নাও থাকতে পারতো)।
বাসা থেকে বের হলেন ,ঠিক আপনার সামনেই ওপর থেকে কেউ পানি ফেলে দিলো, রাগ লাগতেই পারে কিন্তু রাগ না হয়ে আপনি ভাবলেন, “একটুর জন্যে বেঁচে গেছি, নাহলে পানিটা আমার গায়েই পড়তো”।
খুব গরমে বা ঠাণ্ডায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে  খুব বিরক্তি নিয়ে কারো জন্য অপেক্ষা করছেন, দূরে দেখলেন একটা ছোট বাচ্চা তার ছোট ভাইয়ের সাথে মহানন্দে পানি ছিটিয়ে খেলছে, উপভোগ করুন সেই সুন্দর দৃশ্য।
খুব বিরক্তি নিয়ে অনেকক্ষণ হাঁটছেন, হঠাৎ কোথা থেকে যেন হাসনাহেনা বা দোলন চাঁপার গন্ধ এলো আপনার নাকে, মুহূর্তে বিরক্তি ভুলে গিয়ে ভালো লাগাটাকে সেলিব্রেট করতে পারেন।
খুব উৎকন্ঠায় আছেন গাড়িতে পেট্রোল নেই বলে, কিন্তু ঠিক ঠিক একটি পেট্রোল ষ্টেশন পেয়ে গেলেন, উৎকণ্ঠা মুক্ত হওয়ার মতো শান্তি আর কিসে আছে বলুন?
যার যার নিজের পেশায় বা পড়াশুনায় প্রতিদিনকার ছোট ছোট সফলতাগুলোকে লক্ষ্য করুন এবং সেলিব্রেট করুন , সেটা মনে মনেও করতে পারেন কিংবা একটা ভালো কফি শপে যেয়ে বা নিজেকে যে কোনভাবে সুখী করেও সেলিব্রেট করতে পারেন। আপনার ইচ্ছে মতো। মোদ্দা কথা আপনার ছোট ছোট সফলতা বা প্রাপ্তিগুলো যেন আপনাকে পাশ কাটিয়ে চলে না যায়। এদের স্বীকৃতি দিন (acknowledge and recognise ) এবং “সুখবাক্সে” সংগ্রহ করে রাখুন। কোন এক বৃষ্টির দিনে বসে এই বাক্স খুলে দেখতে পারবেন আপনার বাক্সটা একেবারে খালি নয়, অনেক সঞ্চয় রয়েছে সেখানে।

যত বেশী ক্ষুদ্র প্রাপ্তি আপনার পঞ্চইন্দ্রিয়কে আন্দোলিত করতে পারবে আপনি ততবেশি জীবনকে মূল্যায়ন করতে শিখবেন এবং সুখী হবেন। প্রতিদিন এমন অনেক ঘটনা ঘটছে আমাদের চারপাশে। লক্ষ্য করতে শুরু করুন।
কেন এটি কাজ করে?
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যা ভুল হয় বা ঠিক হচ্ছে না এই বিষয়গুলিই আমাদের মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে বারংবার। মনোযোগটা সেখানেই পড়ে থাকে। আর এসব ভাবতে ভাবতে খুব সূক্ষ্ম সমস্যাগুলিও লক্ষ্য করতে শুরু করি যা এড়িয়ে গেলেও চলে। এর মধ্যে ভালো যা কিছু হচ্ছে তা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়না, লক্ষ্যই করি না অর্থাৎ গুরুত্ব দিচ্ছিনা।

মারটিন সেলিগমেন্ট বলেছেন, এই কাজটি খুবই সহজ হলেও অবিশ্বাস্যরকম শক্তিশালী। প্রতিদিনকার ভাল জিনিসগুলি লক্ষ্য করার এই অভ্যাস, এনে দিতে পারে পরবর্তী দিনের জন্য নতুন উৎসাহ এবং উদ্দীপনা।
বর্তমানে বাস করুন। অতীতে কি হয়নি তা নিয়ে নয়, আবার ভবিষ্যতে যদি না হয় সেই ভয়েও নয়। আজকের দিনটাতে ১০ কাজের মধ্যে ২টা কাজে সফল হলে, আপনার আজকের রাতের ডায়েরীর সাথে হোক সেই দুটা কাজের সেলিব্রেশন। একদিন অনুভব করবেন,  জীবন সত্যিই উদযাপনের জন্য।  প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে ৩ টি সুখের মুহূর্ত (ভালো কিছু) স্মরণ করে ডাইরিতে লিখে ঘুমানোর অভ্যাস করুন।
বাবা মায়েদের উদ্দেশ্যে বলছি, আপনারা যদি আপনাদের জীবনের প্রাপ্তি বা ভালোলাগাগুলো আপনাদের বাচ্চাদের সামনে প্রতিনিয়ত বলতে থাকেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তাহলে ওদের মধ্যেও সেটা বলবার অভ্যাস তৈরি হবে। কৃতজ্ঞতা বা গ্র্যাটিচুড, সুখী হবার জন্য মানবজীবনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। ব্যবহার করুন, প্রতিদিন।
শুরু করুন ‘সেলিব্রেটিং লাইফ’।  আমিও করছি।

শিল্পী রহমান: গল্পকার, কবি, সংস্কৃতিকর্মী, কাউন্সেলর ও গবেষক। স্থায়ী নিবাস ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়ায়। কর্মসূত্রে রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে।