স্বীকারোক্তি – শিল্পী রহমান

  •  
  •  
  •  
  •  

 186 views

গল্প 

স্বীকারোক্তি

শিল্পী রহমান

প্রথম মেয়েটা হওয়ার পর ৬ বছর পরে আবার যখন মা হবার গৌরবময় অনুভূতিটা আমার শরীরে এবং মনে এলো, মনে মনে একটা ছেলে চেয়েছিলাম ভীষণ ভাবে। একটা মেয়ে আর একটা ছেলে, সুস্থ। আর কি চাইবার আছে একজন নারী হিসেবে। সুন্দর গুছিয়ে বড় করবো ওদের মনের মতো করে। এই একটু একটু চাওয়াটাই একসময় তীব্র আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হোল। শিতের সকালে মিষ্টি রোদে বসে, স্ফীত পেটে হাত দিয়ে মনে মনে কতো কথা বলেছি ওর সাথে। আলট্রা সাউন্ড করে জানা যায় ছেলে হবে? না মেয়ে হবে? আমি জানতে চাইনি। যদিও ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় ফেটে পড়বার মতো অবস্থা, তবুও ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছি ৯ মাস। হওয়ার পরে নিজের চোখে দেখবো ছেলে না মেয়ে হোল আমার। সময়ের এক সপ্তাহ আগেই জানা গেলো আমার দ্বিতীয় সন্তান পৃথিবীর আলো দেখবে বলে।
রাত তিনটার সময় শুরু হোল ব্যথা, প্রচণ্ড ব্যথায় নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। হাসপাতালে পৌঁছুতেই নার্স বললো, যে কোন মুহূর্তে হয়ে যাবে, কিন্তু হোল না। দীর্ঘ ২০ ঘণ্টা ওই একই রকম যন্ত্রণায় ছটফট করবার পর ডাক্তার বললেন, বাচ্চার হার্ট বিট ড্রপ করছে, অপারেশন করতে হবে। খুব ইচ্ছে ছিল নর্মাল ডেলিভারি হবে। সবটুকু কষ্ট সহ্য করে মাতৃত্বের পুরো স্বাদ নিয়েই মা হতে চাই আমি। তারচেয়ে বেশিই হোল। ২০ ঘণ্টা অমন অসহ্য ব্যথা সহ্য করবার পর আবার অপারেশন করেই পৃথিবীর আলো দেখাতে হোল আমার পুত্র সন্তানকে। এপিডুরাল দিয়ে অপারেশন, তাই পুরো সময়টা আমি জেগেই ছিলাম এবং দেখেছি কি করে সমস্ত অপারেশন থিয়েটার আলোকিত করে এলো আমার অনেক আকাঙ্ক্ষিত পুত্র সন্তান। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না আমার সত্যি সত্যিই একটা ছেলে হয়েছে। বিধাতা আমার মনের ইচ্ছা পূরণ করেছেন। আনন্দে ব্যথা ভুলে গেলাম। একটি মেয়ে এবং একটি ছেলে, সম্পূর্ণ সুস্থ – মাতৃত্বের পূর্ণ সাধ মিলবে এবার, জীবনের আরেক অধ্যায় শুরু।

আমার মেয়েটা খুব লক্ষ্মী। ছোট বেলা থেকেই শান্ত স্বভাবের। কিন্তু নীরব একটা শক্তি আছে ওর, ন্যায় অন্যায় বুঝবার শক্তি। এবং অন্যায় হলে রুখে দাঁড়াবার তেজ যার খুব একটা প্রকাশ নেই কিন্তু ওর চোখে সেই জ্যোতি দেখতে পাই আমি। আমার ভালোই লাগে। যেই তেজ আমার মধ্যে নেই, ওর মধ্যে মনে হয় সেটাই আছে। ছোট ভাইকে সে খুব ভালবাসে। ওদের বয়সের পার্থক্য প্রায় ৬ বছর। আমাকে অনেক কাজে সাহায্য করে, ছোট ভাইকে দেখে রাখবার ব্যাপারেও তার তুলনা নেই।
ছেলেটাকে সবাই মিলে অনেক ভালোবাসি আমরা। খুব আদুরে একটা চেহারা, আর চোখ গুলো ভুলিয়ে দিতে পারে যে কোন পাষাণ হৃদয়। আমার স্বামী ভদ্রলোকও বেশ ভালো একজন মানুষ, তবে একটু রাগী। নিজের সবকিছু ঠিকঠাক মতো না হলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। এমনিতে সবার জন্যে অনেক মায়া, সবকিছু বেশ খেয়াল করে করতে পারেন। আর আমি সবকিছু উনার মনের মতো করতে পারি বলে আমার অনেক সুনাম আছে, অনেক আদরও আছে। মেয়েকে খুব ভালোবাসেন কিন্তু ছেলে তো ছেলেই।
আমি অবশ্য এভাবে দেখিনা, আমার কাছে আমার দুই সন্তানই সমান। প্রথমটা মেয়ের হবার পরে খুব স্বাভাবিক ভাবেই একটা ছেলে চেয়েছিলাম এর বাইরে আর কিছু নয়। ছেলে হয়ে বংশের বাতি রক্ষা করবে এসব মানসিকতা আমার নেই। ওদেরকে আলাদা করে ভাবি না কিন্তু ছেলেটার বড্ড জিদ হয়েছে আজকাল। একটুতেই মাটিতে গড়াগড়ি শুরু করে দেয়। জিদ করে বা নিপুণ কৌশলে আদায় করে নেয় সবকিছু, এটা আমার পছন্দ নয়, এই অভ্যাসটা ভালো না। কিন্তু কিছু হলেই বাবার কাছে চলে যাবে বিরাট বড় বড় দুটা চোখ দিয়ে টস টস করে পানি ঝরাতে ঝরাতে, এই দেখলে যেকোন লোকেরই মন গলে যায়। ছেলের বাবা অস্থির হয়ে বলেন, “আচ্ছা ঠিক আছে দিয়ে দাও না ও কি চায়, এতোটুকু বাচ্চার সাথে এতো কড়াকড়ি নিয়ম করতে হবে না, বড় হতে হতে ঠিকই শিখে যাবে, দেখো”। আবার অনেক সময় আছে ওর বাবা নিজেই বিরক্ত হয়ে বলবেন, আমি ঠিক মতো শাসন করছিনা।
বড় হতে হতে ওকে শেখানো হোল ছেলে মানুষদের কাঁদতে নেই। ওদের শক্ত হতে হয়। যেটা প্রয়োজন সেটা নিজের যোগ্যতা দিয়ে নিয়ে নিতে হয়। ছেলেটা ছেলে হিসেবে সেই রকম একটা ব্যক্তিত্ব নিয়েই বড় হতে লাগলো। মেয়েটা মেয়ে হিসেবে একদম মানানসই হয়েছে। চুপচাপ , এমন মেয়েকেই সবাই পছন্দ করে আমাদের সমাজে। মেয়েদের জিদ না করাই ভালো, শ্বশুর বাড়িতে যেয়ে এসব অভ্যাসের কোন মুল্য থাকে না, তখন অনেক কষ্ট হয়। কি দরকার বাবা, তারচেয়ে এই ভালো। কিন্তু কেউ না জানলেও আমি বুঝতে পারি ওর শক্তি। আমার ধারণা ও শুধু নিজের পায়ে দাঁড়াবার অপেক্ষায় আছে। একদিন ও বিরাট কিছু একটা হবে ওর মতো করে। সেদিন এই শক্তির বিকাশ ঘটবে।

আমরা কোথাও গেলে, কি করা হবে বা কি খাওয়া হবে প্রশ্ন উঠলেই দুজনের পছন্দের মধ্যে ছেলের পছন্দ প্রাধান্য পায় বেশি। মেয়েটা মুখ ফুটে কখনো প্রতিবাদ করেনা, এটা একদিক দিয়ে যেমন ভালো যে কোন ঝামেলা হয়না। আবার আরেকদিক দিয়ে আমি ওর চোখের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করি। নিশ্চয়ই মন খারাপ হয় ওর। কিন্তু যে ঝামেলা করেনা সে আড়ালেই পড়ে থাকে, তাকে নিয়ে কারো মাথা ঘামাতে হয়না। আমি ওর চোখে দেখি খুব সামান্য একটা হতাশা, বুঝা যায় কি যায়না এমন একটা অভিব্যাক্তি। ছেলেটা ছোট হলেও ততদিনে বুঝে গেছে যে, শেষ পর্যন্ত ওর সিদ্ধান্তই গ্রহন করা হবে। এই ব্যাপারটাতে ধীরে ধীরে ওর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাচ্ছে।
ছেলেটা বোন কে খুব ভালোবাসে। আপু অন্ত প্রান। বাইরে গেলে আপুর জন্যে জিনিষ কিনে আনবে। ঘরে ঢুকেই অনেক আদর করবে, মিস করেছে বলে চুমু দিয়ে ভরে দেবে। আমি বেশ খুশি আমার ছোট খাটো সুন্দর সংসার নিয়ে। টুকটাক এদিক সেদিক হলেও অনেকের চাইতে তো অনেক ভালো আছি আমি। আমার স্বামী রাগী হলেও কোনদিন আমার গায়ে হাত তোলেননি। উনি যা যা চায় সব ঠিক ঠাক মতো পেলে কোন ঝামেলাই নেই। আমি এটা বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই বুঝে গিয়েছিলাম। তাই কোনদিন তার অমতে কিছু করিনা। আমার তেমন কোন চাওয়া পাওয়াও নেই। সুখের একটা সংসার পেলেই আমি খুশি। আমার মেয়েটা আমার মতোই চুপচাপ হয়েছে কিন্তু ওর ভেতরে একটা আগুন আছে কোথাও। আমি অনুভব করতে পারি মাঝে মাঝে কিন্তু কোনদিন এর উত্তাপ আমি পাইনি।
বেড়ে উঠছে আমার ছেলে মেয়ে, দুজনেই পড়ালিখায় তুখোড় । আমার তেমন কিছুই বলতে হয়না। ওরা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে পড়ে। আমি অনেক মায়েদের দেখেছি কি কষ্ট করে বাচ্চাদের নিয়ে। কিন্তু আমার বাচ্চারা এই ব্যাপারে আমাকে একদম কষ্ট দেয়নি। মেয়েটা স্কুল পেরিয়ে কলেজে যেতে শুরু করেছে। ছেলেটা হাই স্কুলে। ‘ টিন এজ’ এই বয়সটা মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বয়স। ছেলেটা যেমন পড়ালিখায় ভালো, তেমনি খেলাধুলাও পছন্দ করে অনেক। অভিযোগ করবার কিছু নেই শুধু বাবার মতো একটু মেজাজ বেশি। নিজের পছন্দ মতো সবকিছু না হলে ভীষণ ক্ষেপে যায়। আমি ওকে বুঝি বলে বাড়িতে ওর খুব একটা অসুবিধা হয়না। কিন্তু বাইরের জগতটা তো ভিন্ন। ওখানে ওকে বুঝবে কে? ওর মন মতো চলবেই বা কেন মানুষ? সবারই যার যার পছন্দ অপছন্দ আছে, সেটা সে মানতে চায় না। এই একটা বাড়তি ঝামেলা শুরু হয়েছে আজকাল এই বয়সে এসে। স্কুল থেকে অভিযোগ আসে, রেগে কার লাঞ্চ বক্স ছুড়ে ফেলেছে, কিংবা ডেস্ক উলটে দিয়েছে। কাউকে হয়তো একটা ঘুষি মেরে দিয়েছে। প্রিন্সিপ্যালের কাছ থেকে চিঠি আসতে শুরু করলো। আর এই দোষটা এখন আমার, কারন আমি ভালো মা নই। ঠিক মতো শাসন করতে জানিনা। মানুষ করতে পারছিনা ইত্যাদি। কয়েকবার প্রিন্সিপ্যালের সাথে কথা বলতে হয়েছে এই নিয়ে। তারপর অবশ্য কলেজে উঠে তেমন কিছু শুনিনি। ভেবেছি , যাক ওই সময়টা পার হয়ে গেলো তাহলে।
এমনি করে কলেজ পেরিয়ে ইউনিভার্সিটিতে উঠলো। আইনে পড়াশুনা করবে এটা ওর অনেক আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। আমাদের বাসায় এসব নিয়ে কখনোই কোন দ্বিমত হয়নি। মেয়েটা ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স নিয়ে পড়াশুনা শেষ করে সুইডেনে একটা স্কলারশিপ নিয়ে মাস্টার্স করতে চলে গেছে।
ছেলে শুরু করলো ইউনিভার্সিটির জীবন । মা বলে বলছিনা আমার ছেলে দেখতে শুনতে কিন্তু বেশ, লম্বায় ৬ ফুটের কাছাকাছি। উজ্জল শ্যামলা, বেশ বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। মেয়েরা ওকে পছন্দ করবে এমনটাই যেন স্বাভাবিক। কলেজে থাকতে দু’একজনের সাথে বোধহয় সম্পর্কও হয়েছিলো কিন্তু বেশিদিন টেকেনি। এগুলো নিয়ে ভাবনা হয়নি কখনো আমার। ভালো ভদ্র ছেলে আমার। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, নিজের গন্তব্য নিয়ে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। যেখানে যেতে চায় সেখানে পৌঁছেই ছাড়বে। যেটা চায় সেটা নিয়েই ছাড়বে। ফেরত আসবার ছেলে নয়। আমি একজন গর্বিত মা। ছেলে মেয়ে দুজন কে নিয়েই।
একদিন খুব ভোরে কান্নাকাটির আওয়াজে খুব ভেঙ্গে গেলো। আমার বাসায় নয়, পাশের বাসায়। জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি অনেক মানুষের ভীর। আমি এবং আমার স্বামী বাইরে বেরিয়ে এলাম ব্যাপারটা জানবার জন্যে। শুনি পাশের বাসার মেয়েটা আত্মহত্যা করেছে। আহারে, কি সুন্দর তারুণ্যে ঝলমল একটা মেয়ে ছিল। বুকটা ধক করে উঠলো। এই মেয়েটাকে কয়েকদিন আগেই আমার ছেলের সাথে কথা বলতে দেখেছি। আমি সাধারণত ছেলে মেয়েদের এসব ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাই না, ওদের এখন যা বয়স তাতে প্রচুর বন্ধু বান্ধব থাকবে এটাই স্বাভাবিক। প্রেম ভালোবাসাও হতে পারে। পাড়ায় আমার খুব একটা উঠা বসা করবার সময় না হলেও মোটামুটি সবাইকে চিনি। এরা আমাদের মতোই এই পাড়ায় অনেকদিন থেকে আছে। একটাই মেয়ে, কি হোল হঠাৎ কে জানে? বাবা মা এখন কি নিয়ে বাঁচবে? আমি আমার ছেলের ঘুম ভাঙিয়ে জিজ্ঞেস বললাম ও কিছু জানে কিনা। দেখলাম অবাক হোল না বরং বিরক্ত হোল। সেটা দেখে আমি আরও বেশি অবাক হলাম। একটা অচেনা মানুষের এমন খবর শুনলেও তো মানুষ আঁতকে ওঠে অথচ এই মেয়েটাকে ও চেনে তবুও কোন বিকার নেই, উল্টো বিরক্ত! আমি হতাশ হয়ে আবার বের হলাম।

খুব অস্থির লাগছে , এমন সুন্দর তরতাজা একটা মেয়ে, কি যে আজকাল হয়েছে। ছেলে মেয়েদের মন বুঝা দায়, একটু এদিক সেদিক হলেই আত্মহত্যা। এতো ধৈর্য কম। তাও ভালো আমি আমার বাচ্চাদের জানি। দূরত্ব নেই কোন। আমি হেঁটে গেলাম, ভাবলাম মেয়েটার মা’কে একটু সান্ত্বনা দেই। এর মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স এসে গেছে, পুলিশ এসেছে। কাছাকাছি যেতেই বাসার সবাই আমার দিকে কেমন করে তাকাচ্ছে। লজ্জা পেলাম আমার যেতে দেরি হয়ে গেছে বলে। ইশ, আরও আগে আসা উচিৎ ছিল। কিন্তু এই দৃষ্টির ভাষা ভিন্ন , সবার চোখে কি ঘৃণা দেখতে পাচ্ছি আমি? কি হয়েছে? কেন ওরা আমাকে এভাবে দেখছে? আমি থেমে গেলাম , বুঝতে চেষ্টা করছি ব্যাপারটা কি? মানুষের মৃদু গুঞ্জন কানে এলো, তাতে আমার আমার ছেলের নাম শুনতে পেলাম।
মুহূর্তে আমার মুখ থেকে রক্ত সরে গেলো। কেমন হিম ঠাণ্ডা একটা অনুভূতি, হাত পা অবস হয়ে আসছে। আমি জানিও না আমার ছেলের নাম ওরা কেন বলছে কিন্তু তবুও একটা অশনি সংকেত। আমি পালিয়ে আমার বাসায় আসতে চাইলাম কিন্তু পারছি না। কে যেন মাটির সাথে আমার পা দুটোকে টেনে ধরেছে, কি অসম্ভব রকমের ভার আমার পায়ে কেউ বেঁধে দিয়েছে, যেন বিশাল আকারের দুটো পাথর। এমন অসহায় আমি কোনদিন বোধ করিনি। আর কিছু জানি না।
যখন জ্ঞান ফিরেছে, আমি ঘাসের ওপরে শোয়া, আমার ওপরে অনেকগুলো মানুষের মুখ। অ্যাম্বুলেন্সের মানুষজনও আছে সাথে। আমি উঠে বসে খুব কাছের একজন মানুষকে খুঁজছি যে আমাকে এখান থেকে বাসায় নিয়ে যাবে। আমার কেন যেন খুব ভয় হচ্ছে, আমি আর কিছু জানতে চাইনা । হয়তো আমার ছেলের সাথে মেয়েটার সম্পর্ক ছিল, এখন নেই বলে মেয়েটি দুঃখ পেয়ে এমন একটা কাণ্ড করেছে। ইশ ছেলেটা একটু বুঝলও না। কি আশ্চর্য। এখন কি হবে?

আমি উঠে বসেছি, একজন পুলিশ এসে আমার পাশে বসলেন। জিজ্ঞেশ করলেন “আপনার ছেলেকে বাসায় পেলাম না। আপনি কি জানেন, ও কোথায় আছে”, আমি বললাম , “ও তো বাসায়ই আছে, আমি ওকে একটু আগেই দেখে এসেছি”। পুলিশ বলল , “আমরা আপনার বাসা তন্ন তন্ন করে খুঁজে এসেছি। ও নেই। আপনার ছেলে এই মেয়েটিকে ধর্ষণ করেছে, আরও দুজন বন্ধু সহ। এই কথা মেয়েটি তার সুইসাইড নোটে লিখে গেছে।” কি বলছে এরা, আমি আবার চোখে অন্ধকার দেখলাম। দূরে আমার স্বামীকে পুলিশ প্রশ্ন করছে, আর আমি কিছু জানিনা। কিছু ব্যাপার আছে, জানতেও ভয় লাগে, কোথাও একটা মারাত্মক ভুল হয়েছে।
হঠাৎ খুব একা লাগছে নিজেকে, কোথাও কেউ নেই। বাসায় সোফায় বসে টিভি দেখছি, খবরে বার বার বলছে আমার ছেলের নাম। জানতে পারলাম, আমার ছেলে হাই স্কুল থেকে একটু একটু করে ড্রাগস নিতো। কখনো রেজাল্ট খারাপ করেনি বলে সন্দেহই করিনি। সব সময় ক্লাসে টপ একটা ছেলে, এরা কি সব বানানো কথা বলছে। কোথায় পেয়েছে এইসব আজগুবি কথা। আরও বলছে একবার না, সেই কলেজ থেকেই মেয়েদেরকে বিভিন্ন ভাবে অ্যাসল্ট করেছে। অসম্ভব, হতেই পারেনা। অন্য দুজন ছেলেকে ধরেছে পুলিশ, টিভিতে দেখাচ্ছে, ওদের দেখেই চিনলাম আমি। এরা আমার ছেলেরই বন্ধু, কতোবার এসেছে বাসায়, কতো রান্না করে খাইয়েছি এদের। ওরাই সব বলছে, আমার ছেলের সাথে মিলে ওরা কোথায় কোথায় গেছে, কি কি করেছে। কতো মেয়েকে জোর করে ধরে এনে ধর্ষণ করেছে। অসম্ভব, এ আমি বিশ্বাস করিনা। এটা আমার ছেলে হতেই পারে না। আমার মাথা কাজ করছে না কিছুতেই। কি করে সম্ভব। এ আমি কি করলাম?

মেয়েটা সুইডেন থেকে ফোন করে সান্ত্বনা দিচ্ছে আমাকে, আমার স্বামী যেন হঠাৎই খুব ব্যস্ত হয়ে গেলো। অফিস থেকে রোজ রাত ১০ টা ১১টায় বাড়ি ফেরে। যেন কাজে ডুবে থাকলে সত্য মুছে যাবে কোনভাবে। শুধু আমারই কিছু করবার নেই হঠাৎ করে। অনন্ত অবসর। ছেলে কোথায় গেছে কেউ জানে না। আমার খুঁজতেও ইচ্ছে করছে না, জানতেও ইচ্ছে করছে না। পুলিশ আসে রোজ, ছেলের ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজে কি কি সব পায় আমি ঘুরেও দেখি না। আমার সাথে কথা বলে, আমার ছেলের খোঁজ নিতে চায়। আমি শুধু স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। একটা বিশাল শূন্যতা। মাথাটাও খালি খালি লাগে।
তিন দিন পরে বিকেল পেরিয়ে যখন সন্ধ্যা নামছে, ঘরে বাতি জ্বালানো হয়নি। সেই আবছা অন্ধকারে পেছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকলো আমার ছেলে । উসকো খুসকো চুল। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আমার ছেলে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো “মা খেতে দাও” । খুব অচেনা লাগলো ওর স্পর্শ,অচেনা কণ্ঠস্বর, বুকের ভেতরে দম আঁটকে আসে আমার। আমার মধ্যে কেমন একটা শীতল শান্ত বোধ এসে গেলো। খুব ঠাণ্ডা কণ্ঠে বললাম “গোসল করে আয়, খাওয়া গরম করে দিচ্ছি”। খাওয়া গরম করে টেবিলে দিলাম। খুব ক্ষুধার্ত ছেলে আমার, আগে এমন দেখলে খুব মায়া লাগতো। এখন মনে হয় কোন অনুভূতি নেই, আমি ওকে দেখছি। ও গোগ্রাসে খাচ্ছে। আমি যেন ওকে প্রথম বারের মতো দেখছি। একে তো আমি চিনি না। এতদিন শুধু ব্যস্ত ছিলাম অন্য কাজে, রান্না বান্না, ওদের স্কুল কলেজের প্রয়োজন মিটাতে। কার কখন কি প্রয়োজন তার জোগাড়জন্ত করতে করতেই বছরের পর বছর পেরিয়ে গেছে। সেই ফাঁকে ছেলে আমার ২২ বছরের যুবক হয়েছে। যে এখন বন্ধুদের নিয়ে জোর করে মেয়েদের ধরে ধর্ষণ করে বেড়ায়। একবার নয় কয়েকবার করা হয়ে গেছে এই ২২ বছরে। এই ছেলেকে কি আমি চিনি?
খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে যেয়ে নেতিয়ে পড়লো বিছানায়। হয়তো ঘুম হয়নি এই কয়েকদিনে। সাদা ধবধবে বিছানায় ক্লান্ত একটা শরীর। কলঙ্কিত এবং কলুষিত ৬ ফুট লম্বা একটা মানুষ নামের অমানুষ আমার বাড়িতে এসে, আমার ছেলের ঘরে শুয়ে আছে। মনে পরে গেলো ২২ বছর আগের প্রসব ব্যথার কথা। ২০টা ঘণ্টা ব্যথায় কুঁকড়ে গেছি, কেঁদেছি কিন্তু হাল ছাড়িনি। একজন পুত্র সন্তান জন্ম দেবো বলে সমস্ত শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করেছি। আজকেও একটা ব্যথা অনুভব হচ্ছে। তীব্র ব্যথা কিন্তু সেটা পেটে নয়, বুকে। সইতে পারছিনা, কি কষ্ট, কি কষ্ট । বুকের পাঁজর ভেঙ্গে যাচ্ছে আমার। নিজের পেটের সন্তান। না না, এ হতে পারে না। আমি তো মা। আমি একজন যোগ্য সন্তান জন্ম দিয়েছিলাম। কিন্তু কিভাবে যেন কোথায় একটা ভুল হয়ে গেছে।
ভুল হয়ে গেছে, কোনদিন আমার নিজের ইচ্ছের মুল্য দেই নি বলে, তাই ও অন্যের ইচ্ছের মূল্য দিতে শেখেনি।
ভুল হয়ে গেছে, আমার স্বামীর মনের মতো সবকিছু করে গিয়েছি কিন্তু কোনদিন তার অন্যায় চাহিদার বিরুদ্ধে রুখে দাড়াইনি বলে, তাই ও মেয়েদের ইচ্ছের সম্মান করতে শেখেনি।
ভুল হয়ে গেছে আমার মেয়ের ইচ্ছের প্রাধান্য দেইনি বলে, তাই আমার ছেলে শিখেছে ওর সব চাওয়াই ঠিক।
ভুল হয়ে গেছে, ওকে হেরে যাওয়া শিখাইনি বলে।
ভুল হয়েছে “না” মেনে নিতে শিখাইনি বলে, তাই ও “না” এর প্রকৃত অর্থ শেখেনি।
ভুল হয়ে গেছে, ছেলেকে কাঁদতে দেইনি বলে, তাই ও একজন মানুষ হয়নি, শুধু ছেলে হয়েছে।

আমার একটা দড়ির প্রয়োজন। বাসাটায় কোন দড়ি নেই কেন? আমি আমার মেয়ের ঘরে যেয়ে দুটো ওড়না নিয়ে এলাম। ছেলের ঘরে যেয়ে অঘোরে ঘুমানো শরিরটার কাছে যেয়ে আরেকবার ছুঁয়ে দিলাম, ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে আমি বির বির করে ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলাম। আমি ভুল করেছি। ও যখন পৃথিবীতে এসেছিলো, তখন একদম পবিত্র একটা মানুষ হয়েই এসেছিলো। আমার কোলেই দিয়েছিলো ওকে বিধাতা। সেই পবিত্র মানুষটাকে আমিই কলুষিত করেছি। নষ্ট করেছি। আমি পারিনি, অনেক ভালোবাসা এবং শ্রম দিয়েও ওর পবিত্রতা রক্ষা করতে পারিনি। ওড়না দুটোকে টেনে টেনে চিকন বানিয়ে, একটা দিয়ে ঘুমন্ত ছেলের হাত দুটো পেছনে নিয়ে বেঁধে ফেললাম খুব শক্ত করে। এরপর আরেকটা দিয়ে গলায় প্যাঁচাতে শুরু করলাম। একটু নড়ে চড়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লো। খুব ক্লান্তি ওর, ভালো হয়েছে, কাজটা সহজ হয়েছে আমার জন্যে। আবারও পেঁচালাম, এবার খাটের হাতলে আঁটকে সোজা সিলিঙের দিকে তাকিয়ে টানতে থাকলাম ভীষণ জোড়ে। আমি দেখতে চাইনা শুধু শক্তি চাই।
অবাক হচ্ছি এতো শক্তি আমার কোথা থেকে এলো। গত তিন তিন থেকে না খাওয়া শরীরে এতো শক্তি! আমার মেয়ের মধ্যে যে আগুন দেখেছিলাম সেই আগুন আসলে আমার মধ্যেই ছিল, যার উত্তাপ আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম সংসারের শান্তির আশায়। আজ সেই উত্তাপ, সেই তেজ অনুভব করছি আমার ভেতরে। ২২ ঘণ্টা প্রসব ব্যথা সহ্য করেছি, তার আগে নয় মাস কতো স্বপ্ন দেখেছি। আমার ছেলের শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। হাত দুটো বাঁধা বলে কিছু করতে পারছে না, আর ওর ক্লান্ত শরীর আমার মতো অসুরের শক্তির কাছে কিছু না।
কিন্তু এ আমি কি করছি? দূরে রাখা আয়নায় নিজের চেহারা দেখে চমকে উঠলাম আমি। এটা কি আমি? ওমা, কি বীভৎস দৃশ্য! কি করছি আমি? না না এ আমি করতে পারি না। এটা আমি না। একটা অন্যায় থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যে আমি আরেকটা অন্যায় করছি। না , আমি এটা করতে পারি না এবং করবোও না। ওর গলা থেকে দড়ি খুলে নিয়ে বেঁধে ফেললাম ওর পা দুটো। নিস্তেজ শরীর, মেরে ফেললাম নাকি? বুকে মাথা দিয়ে বুঝে নিলাম ধক ধক হৃদস্পন্দনের শব্দ, বেঁচে আছে।
না, আমি কাঁদছি না। বুকের ব্যথাটা মনে হয় কমে গেলো একটু। সেই ওড়নায় হাত পা বাঁধা শরীরটা টেনে হিঁচড়ে বিছানা থেকে নামালাম আমি। ততক্ষণে জ্ঞান ফিরেছে ওর কিন্তু শক্তি নেই শরীরে। অন্তত আমার শক্তির কাছে কিছু না, আমার শরীরে এক আশ্চর্য রকমের শক্তি কাজ করছে। ছেলেটা করুন স্বরে জানতে চাইছে আমি কি করছি। মা মা করে ডাকছে আমায়। কিন্তু আমার ভেতরে ভালোবাসা নেই আজ, করুনাও নেই কোন, শুধু ভুল শোধরাবার নেশায় অন্ধ আমি এখন। ওর ঘর থেকে বসার ঘর, সেখান থেকে সামনের দরজা দিয়ে সোজা বাইরে। টেনে টেনে নিয়ে গেলাম পাশের বাসার সামনে। তারপর ওই মেয়েটার বাসায় যেয়ে দরজায় নক করলাম। ওর মা বেরিয়ে এলো। মেয়ে মরা মহিলার কাঁদতে কাঁদতে জল শুকিয়ে যাওয়া চোখে একটা জিজ্ঞাসা। আর আমার চোখে তখন স্বর্গীয় প্রশান্তি। আঙুল দিয়ে একজন রেপিস্টকে দেখিয়ে বললাম “এই যে নিন, আপনার ফুলের মতো পবিত্র মেয়েকে নষ্ট করে, খুন করে পালিয়ে বাঁচতে পারবে না কেউ, আর কাউকেই নষ্ট করবে না ও”। আমি ক্ষমা চাইনা। আমি কেবল আমার ব্যর্থতার মাশুল দিলাম। বাকিটা আপনি করুন , হয়তো সান্ত্বনা পেতেও পারেন। ন্যায্য বিচার না নিয়ে ছাড়বেন না কিন্তু…। একজন রেপিস্টের ন্যায্য শাস্তি হওয়া চাই।

 

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments