হাওরে বৃষ্টি ও জলের গান (শেষ পর্ব) -এস এম জাকির হোসেন

  •  
  •  
  •  
  •  

শেষ পর্ব:
গানে-আড্ডায় আমাদের সময়টা আনন্দেই কাটছিলো। নৌকা ছুটে চলেছে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে। হঠাৎ মাঝিদের তৎপরতা দেখে আমরা কেউ কেউ সচকিত হয়ে উঠলাম। ব্যাপার কি? মাঝিরা নানা কসরত চালিয়েও নৌকা সামনে নিতে পারছে না। কিছুক্ষণের মধ্যে কারণ জানা গেলো। পাহাড়ি ঢলের জন্য স্রোত খুব বেড়ে গেছে। নৌকা সেই স্রোত ঠেলে সামনের খাঁড়ি পার হতে পারছে না। বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে কিন্তু যতবারই স্রোত ঠেলে ওপারে যেতে চাইছে নৌকা ঘুরে আবার আগের জায়গায় চলে আসছে। আমাদের বাউলদের দলটিকে দেখা গেলো সবাই সারিবদ্ধ হয়ে হাত উপরের দিকে তুলে কারো উদ্দেশ্যে কিছু বলছে- সেটা সৃষ্টিকর্তা না অন্য কারো উদ্দেশ্যে ঠিক বোঝা গেলো না। প্রায় বিশ মিনিট কসরত করার পর মাঝিরা সফল হলো। নৌকা খাঁড়ি পার হয়ে এলো। আমরাও অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। রাত প্রায় ন’টার দিকে আমরা টেকেরঘাট পৌঁছালাম।
অসংখ্য নৌকা ভিড়ে আছে ঘাটে। সবাই আমাদের মত ভ্রমণ পিপাসু দল। আমরা কয়েকজন পাড়ে নামলাম। একটু সামনেই ভারতের মেঘালয়, অন্ধকারে প্রহরীর মত উঁচু পাহাড়শ্রেণী দাঁড়িয়ে। তার উপরের রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে হলুদ রঙের আলো জ্বলছে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষেই বাংলাদেশী সীমান্ত সড়ক। তবে নৌকা থেকে বেশি দূরে যাওয়া হল না আমাদের, কারণ- চারিদিকে বেশ অন্ধকার। নিরাপত্তার কথা ভেবে আমরা নৌকার কাছাকাছি কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ফিরে এলাম। নৌকার ছাদে রান্নাবান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সাত্তার, আলমগীর ও তার লোকজন। ফিশ ফ্রাই, খাসী বার-বি-কিউ এর সুঘ্রাণ আসছে। একপাশে অবশ্য বাউল শিল্পীরা গানে মত্ত। কেউ কেউ নিচে কেবিনে কার্ড নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আশেপাশে নৌকা থেকেও হৈ-হল্লার শব্দ ভেসে আসছিলো। কেউ কেউ ফানুস উড়াচ্ছিলো।

টেকেরঘাটে নোঙর করা অবস্থায় নৌকার ছাদে বাউল শিল্পীদের সঙ্গীত পরিবেশনা

‘রঙের বাড়ই রঙের বাড়ইরে বেষম উন্দুরায় নাগাল পাইলো’ গানের সাথে আলমগীর আর মাঝহারের যুগলনৃত্য দর্শন করতে করতে আর ভাজা মাছ খেতে খেতে সময়টা বেশ আনন্দেই কাটছিলো আমাদের। এর মধ্যেই সাত্তার জানালো খাসী বার-বি-কিউ প্রস্তুত। আবার শুরু হলো খাসী ভক্ষণ। নিচে অবশ্য মাঝির রন্ধনশালায় চলছে পোলাও, হাওরের গলদা চিংড়ি, আইড় মাছ আর গরুর মাংস রান্না। গান-আড্ডা-খাওয়া দাওয়ায় সময় দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছিলো। আমাদের রাতের খাবার শেষ হবার কিছুক্ষণ পরই আবার বৃষ্টি নামলো। আমরা সবাই নিচে কেবিনে চলে গেলাম। নিরাপত্তার কথা ভেবে ঘাট থেকে কিছুটা দূরত্বে হাওরের পানিতে নৌকাটা নোঙর করালাম। বেশির ভাগ নৌকা দেখলাম সেভাবেই নোঙর করা।
নৌকার ভেতরে একটা ভ্যাঁপসা গরম ভাব। বদ্ধ কেবিনে এতগুলো মানুষ, গরম তো লাগবেই। যে যেভাবে পেরেছে শুয়ে পড়েছে। অনেকেই ঘুমিয়ে গেছে। কেউ আধশোয়া হয়ে, কেউ কুণ্ডুলি পাকিয়ে, আবার কেউ বা বসে বসেই। সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে হাসি পেলো। আরাম আয়েশের ঘর-বিছানা ছেড়ে এই অবস্থায়! কারো কারো তো আবার এসি ছাড়া ঘুমই আসে না, অথচ এখন এই গরমে ঠিকই ঘুমিয়ে পড়েছে! আমার ঘুমটা কেটে গেছে। মনে হয় ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়েছিলাম। রাত প্রায় দুইটা বাজে। রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। ছাদে এসে দাঁড়াতেই ঝিরিঝিরি বাতাসে প্রাণটা জুড়িয়ে গেলো। ঠিক এই মুহূর্তে হুমায়ূন আহমেদের লিলুয়া বাতাসের কথা মনে পড়ে গেলো।  লোকটা বড় জ্যোৎস্না পাগল ছিলো। চারিদিকে নিস্তব্ধ নিঝুম, কোথাও মানুষের পদচারণা, শোরগোল-হৈচৈ নেই। চারিদিকে একটা স্নিগ্ধ, শান্ত ভাব।
এবার তোমার মন ভেজাবার পালা,
মেঘলা রাতে খুব নিশীথে, জলের বুকে জলকপোতে-
এবার তোমার হারিয়ে যাবার পালা।

আমি সত্যি সত্যিই হারালাম। নক্ষত্রবিহীন এই রাতে নিবিড় নিস্তব্ধতার মাঝে নৌকার ছাদে আমি একা। চারিদিকে অসংখ্য নৌকা ভেড়ানো, দূরে- কাছে; তবে মানুষজনের সাড়া নেই। একদিকে আবছায়া অন্ধকারে মেঘালয়ের পাহাড়শ্রেণী প্রাচীরের মত দাঁড়িয়ে। অন্যদিকে বিস্তীর্ণ জলরাশি। যতদূর চোখ যায়- শান্ত, টলটলে জল। অবশ্য বিশাল এই জলাশয়ের মাঝেই গাছপালা ঘেরা ছোট ছোট দীপের মত ছায়াছায়া কিছু স্থলভূমি চোখে পড়ছে, তবে সেখানে মানুষের বসবাস আছে কি-না বোঝা গেলো না। হঠাৎ হঠাতই মেঘ সরে গিয়ে আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে, তবে তা অতি সামান্য সময়ের জন্যই। তারপর আবার সেই মেঘেদের রাজত্ব। আবার গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। আমি সামিয়ানার নিচে চেয়ার পেতে বসলাম। এমন শান্ত নির্মল পরিবেশ হয়তো আর কখনও পাবো না। বৃষ্টি হঠাৎ বেড়ে গেলো। আর ছাদে থাকা যাবে না। অনিচ্ছা সত্বেও নিচে নেমে এলাম। ভেতরে বসার জায়গা তেমন নেই। সবাই এলোপাথাড়ি শুয়ে-বসে ঘুমাচ্ছে। বাধ্য হয়ে আমিও শুয়ে পড়লাম। তবে ঘুম আসছিলো না।
এটা সেটা ভাবতে ভাবতেই কখন জানি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ফজরের আযানের ধ্বনি কানে যেতেই ঘুম ভেঙে গেলো। নৌকার বদ্ধ রুমের মধ্যে আর থাকতে ইচ্ছে করছিলো না। বাইরে বেরিয়ে খোলা ছাদে চলে এলাম। হালকা বৃষ্টির ছাঁট এসে চোখেমুখে লাগছে, গায়ে মাখলাম না। চারিদিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়লো মনে। ভোরের আলো ফোটেনি তখনো। আকাশ মেঘলা থাকায় সবকিছু স্পষ্টভাবে দেখাও যাচ্ছিলো না। তারপরও হালকা আলোয় যতটুকু চোখে পড়লো আমার কাছে তা-ই ছিল যথেষ্ট। অন্ধকারে ছাওয়া রাতের টাকেরঘাট এই প্রত্যুষে আমার কাছে ভিন্নরূপে ধরা দিলো। স্নিগ্ধ ভোরের এই নৈস্বর্গিক রূপের সৌন্দর্য যতটা অনুভব করলাম, বর্ণনা করা আমার জন্য ততটা সহজতর নয়।

একজন দু’জন করে আরও কয়েকজন উঠে এলো ছাদে। মিজান, মাকসুদ, বদরুল, শাহীন। আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে আসছে। যত আলো ফুটছে মেঘালয়ের পাহাড়শ্রেণী যেন নতুন করে জেগে উঠছে; অথৈ জলরাশির পাশে একটা সবুজ প্রাচীর, তার ভাঁজে ভাঁজে ভেসে বেড়াছে খণ্ড খণ্ড সাদা মেঘ। বেলা আরও কিছুটা বাড়লে অনেকেই উঠে পড়লো। সাত্তার আর আলমগীরের সাথে বসে আমাদের পরবর্তী করনীয় নিয়ে আলোচনা করলাম। এরপর আমরা যাদুকাটা নদীতে, নীলাদ্রি লেকে কীভাবে যাবো, নৌকা কোথায় থাকবে ইত্যাদি। তবে বৃষ্টি আমাদের ভাবনার বেশি সময় দিলো না, হুড়মুড় করে নামলো আবার। এবার মুষলধারে। কিছুক্ষণ দেখার পর ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিলো না, কারণ নীলাদ্রি লেক কিংবা যাদুকাটা নদীতে যেতে হলে আমাদের নৌকা থেকে নেমে অন্য ট্রান্সপোর্ট নিয়ে যেতে হবে। বৃষ্টির জন্য সেটা আর সম্ভব নয়। আজ বিকেলের আগেই আমাদের ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। অতএব সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হলো যাদুকাটা নদী, বারিক্কা টিলা ও নীলাদ্রি লেক দেখা হচ্ছে না আমাদের। ঠিক হলো আমরা হাওরে বেড়াবো, ওয়াচ তাওয়ারের কাছে গিয়ে গোসল করবো, তারপর ফিরে যাবো।
আমাদের নৌকা ছুটে চললো মূল হাওরের দিকে। গতকাল রাতে অন্ধকার থাকায় তেমন কিছু দেখতে পাইনি। আজ এই দিনের আলোয় হাওরের আসল রূপটা ধরা দিলো। এখন বর্ষার শেষ সময়, চারিদিকে থৈথৈ জল, খাল-বিল-নদী সব পানিতে একাকার। শীতে এই হাওরে পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে যায়। এই বর্ষায় পাখি তেমন চোখে পড়ছে না। সকাল থেকে একটা দুইটা পানকৌড়ি দেখা গেলো মাত্র। বৃষ্টি থেমে গেছে পুরোপুরি। আকাশে নীল সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, তার ছায়া পড়েছে হাওরের জলে। আলমগীর এসে জানালো- সকালের নাস্তা রেডি। খিচুড়ি আর গরুর মাংস। নৌকার ছাদে সবাইকে পরিবেশন করা হলো।
খিচুড়ি স্বাদ নিতে নিতেই শেয়ার করা যাক টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে কিছু তথ্য। টাঙ্গুয়ার হাওরের বিশালত্ব এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য সম্পর্কে আগেই শুনেছিলাম, তবে আজ নিজ চোখে দেখার সৌভাগ্য হলো। এই হাওরটি সুনামগঞ্জ জেলার দু’টি উপজেলা- ধর্মপাশা ও তাহিরপুর জুড়ে অবস্থিত। এই দুই উপজেলার পঞ্চাশটিরও বেশি হাওরের সমন্বয়ে ন’হাজার হেক্টরেরও বেশি এলাকা জুড়ে টাঙ্গুয়ার হাওর জেলার সবচেয়ে বড় জলাভূমি। এর শেষপ্রান্তে ভারতের মেঘালয় পাহাড়। পাহাড় থেকে ছোট বড় বেশ কিছু ঝর্ণা এসে মিশেছে এই হাওরে। শীত মৌসুমে পানি শুকিয়ে কমে গেলে এখানকার প্রায় ২৪টি বিলের পাড় জেগে ওঠে, যাকে  স্থানীয় ভাষায় ‘কান্দা’ বলে। তখন শুধু কান্দা’র ভিতরের অংশেই আদি বিল থাকে। তাইতো স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই হাওরটি ‘নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল’ নামেও পরিচিত। বর্ষায় থৈ-থৈ পানিতে নিমগ্ন হাওরের জেগে থাকা উঁচু কান্দাগুলোতে আশ্রয় নেয় হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি— রোদ পোহায়। তাই শীত মৌসুমে এই হাওরের রূপ সম্পুর্ণ বদলে যায়।

এ রকম সারি সারি হিজল করচের বনের মধ্য দিয়ে নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি আমরা

নাস্তা শেষ। আমাদের নৌকা সামনে এগিয়ে চলছে। সবাই গল্প আর ছবি তোলায় মশগুল। হঠাৎ সামনে তাকাতেই চোখে পড়লো পানিতে মাথা উঁচু করে থাকা হিজল-করচের দৃষ্টি নন্দন সারি। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য। সামনে ওয়াচ টাওয়ার। ধীরে ধীরে আমাদের নৌকা এগিয়ে গেলো সেদিকে। আমাদের নৌকা ভিড়লো ওয়াচ টাওয়ারের পাশে। জলের বুকে ভাসমান ছোট বড় বেশ কিছু ডিঙি আমাদের নৌকার দিকে ছুটে এলো। সাত্তার জোরে হাঁক দিলো। আমরা ওয়াচ টাওয়ারে চলে এসেছি। কে কে গোসল করবা রেডি হও। সাত্তার, আলমগীর, মান্নান, আনোয়ার, সোহেল, বেলাল, আলম সবাই হাফ প্যান্ট পড়ে পানিতে নামার জন্য তৈরি। বৃষ্টি থাকায় কিছুটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব, আমি জলে নামবো কি নামবো না ভাবতে ভাবতে শেষে নেমেই পড়লাম। এই সুযোগ হয়তো আর পাবো না। এখানে পানির উচ্চতা একেক জায়গায় একেক রকম। কোথাও বুক সমান পানি, কোথাও গলা সমান আবার কোথাও কোথাও ঠাঁই মেলে না। পানি বেশ ঠাণ্ডা তাই খুব বেশি সময় আমি জলে থাকলাম না। তবে সাত্তার, আলমগীর আর মান্নান আরও অনেকক্ষণ পানিতে দাপাদাপি করলো। আমার গোসল শেষ। সাত্তার আলমগীরের ফেরার অপেক্ষায় বসেছিলাম। ছোট ছোট শিশু কিশোররা ডিঙি নিয়ে আমাদের নৌকার আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এগারো-বারো বছরের একটি ছেলে হঠাৎ গান গেয়ে উঠলো। এখানকার আঞ্চলিক একসেন্টে নিজস্ব সুরে একেবারে মাটির গান। গানের কথা শুনে আমরা খুব মজা পাচ্ছিলাম, অবশ্য ভালও লাগছিলো। গানের কথাগুলো ছিল অনেকটা এরকম-
অন্তরে না রাখিলে, অন্তরে না রাখিলে
মনে মনে রাইকো,
আমি তো বালা না, বালা লইয়া থাইকো।

সাথে আরও কয়েকটি কিশোর এসে গলা মিলাচ্ছিলো। আমাদের মাকসুদ গানটি ভিডিও করে রাখলো। ছেলেটির গানের রেশ থাকতে থাকতেই আমাদের নৌকা ছেড়ে দিলো। আমি নৌকার ছাদে দাঁড়িয়ে চারিদিকে একবার চোখ বোলালাম। যেদিকে তাকাই সারি সারি হিজল-করচের বন, জলের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকটা রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টের মত। এটা আসলেই অসাধারণ এক দৃশ্য। ছোট ছোট স্থানীয় শিশু-কিশোর ডিঙি নিয়ে সেই গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সোয়াম্প ফরেস্টের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে করতে আমরা ফিরে চললাম তাহিরপুরের দিকে।
নৌকা চলছে তো চলছেই। পথ যেন আর শেষ হচ্ছে না। তবে আমাদের কারো খারাপ লাগার কোন কারণ নেই। এই হাওরের একেক প্রান্তে একেক রূপ। কোথাও অবারিত জলের আধার আবার কোথাও বা আঁকাবাঁকা নদীপথ দিয়ে আমরা ছুটে চলছি।

বিস্তীর্ণ জলরাশির মাঝে মাঝে দ্বীপের মতো ছোট ছোট গ্রাম কিংবা প্রায় ডুবন্ত রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো হাওরের প্রকৃতিতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। এই বহুমাত্রিক সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে আমরা পৌঁছে গেলাম তাহিরপুরে। তবে তাহিরপুরে আমরা নৌকা থেকে নামলাম না। গতকালের পানি ভাঙার অভিজ্ঞতার কথা আমরা কেউ ভুলিনি। তাই আজ নৌকা নিয়ে আরও সামনের দিকে এগিয়ে চললাম। উদ্দেশ্য গতকাল যেখানে রাস্তায় পানি ভেঙেছি সেটা পার হয়ে নৌকা নিয়ে আমাদের গাড়ির কাছে চলে যাওয়া। আরও কিছুদূর যাওয়ার পর আমি মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম- এটাও কি টাঙ্গুয়ার হাওর? মাঝি বললো- না, এটা শনির হাওর। লক্ষ্য করলাম এই হাওরে পানি কিছুটা কমে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে এখানে পানির উচ্চতা কম হলেও টোটাল এরিয়া কিন্তু কম নয়। সামনে বহুদূর পর্যন্ত শুধু পানি আর পানি। মাঝে মধ্যে ছোট বড় হিজল গাছ পানিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। লোকজন ছোট ছোট ডিঙি নিয়ে মাছ ধরছে। বর্ষা শেষে আশেপাশের বেশির ভাগ অংশই শুকিয়ে যায়, তখন এখানে চাষাবাদ হয়। আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক চলার পর নৌকা পৌঁছে গেলো আমাদের গন্তব্যে। সবাই নৌকা থেকে নেমে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইলো গাড়ির অপেক্ষায়।
আমাদের হাওর যাত্রার এখানেই ইতি ঘটছে। গত দুই দিনের এই ভ্রমণে পাওয়া না পাওয়ার হিসেব করা অর্থহীন। এই দুইদিন ২৩ জন বন্ধু একসাথে যে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিলাম সেটাই বা কম কীসে! আমরা জ্যোৎস্না রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারিনি, যাদুকাটা নদী কিংবা নীলাদ্রি লেকে যেতে পারিনি, তবে গতকাল সন্ধ্যা থেকে হাওরের যে বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য উপভোগ করলাম, হাওর-নির্ভর মানুষের জীবনযাত্রার যে রূপ দেখলাম- সেটাও এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আগামী দিনে সময় সুযোগ হলে আবার কখনও আসবো এখানে, তখন হয়তো দেখতে পারো ভিন্ন এক টাঙ্গুয়ার হাওর।
আমাদের গাড়ি চলে এসেছে। আমরা একে একে গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। আমাদের বহনকারী সেই নৌকাটি ফিরে যাচ্ছে তার চেনা গন্তব্যে। এখন আর বৃষ্টি নেই। রোদ উঠেছে, চারিদিক সোনালি আলোয় ঝলমল করছে।