হিন্দু মুসলমান বন্ধুত্বের সুঘ্রাণে ভরে যাক দেশের আকাশ বাতাস-শরীফা তাসমীম টুলটুলী

982


ক্লাস ফাইভে নিখিল স্যার বলেছিলেন “বড় হয়ে তোরা কে কে ডাক্তার হতে চাস ??” সমস্ত ক্লাস সেদিন হাত তুলেছিল শুধু আমি বাদে ।জিজ্ঞেস করেছিলেন তুই কী হবি ? বলেছিলাম “আব্বার মতো প্রভাষক হতে চাই , কলেজের ছেলে মেয়েদের পড়াতে চাই । সমস্ত ক্লাস উপহাসের অট্টহাসিতে সেদিন ফেটে পড়েছিল । নিখিল স্যার সবাইকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন “তোরা সব্বাই ডাক্তার হবিনা তবে ও কিন্তু একদিন কলেজে পড়াবে “। ব্যাকবেঞ্চের সাদামাটা এক ছাত্রীকে এভাবে যিনি প্রত্যয়ী করে তুললেন তার নাম নিখিল চন্দ্র ।

অষ্টম ও নবম শ্রেণীর ছাত্র -ছাত্রীদের চোখে স্বপ্ন যতটা তীব্র থাকে আর কোন বয়সী মানুষের চোখে অতটা থাকে না । পেছনের বেঞ্চে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা ছাত্রীকে যিনি জীবনের , কল্যাণের -আলোর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন ,সেই শিক্ষিকার নাম “পঞ্চাননী সাহা “।
স্কুল জীবনে কোচিংয়ের দিনগুলোকে রঙ্গিন করেছে যে দুটো মেয়ে, কিছুদিন পরপর ১০ /১২ জন মুসলিম মেয়ে গিয়ে যাদের বাড়ির খাবারের শেলফ আর ফ্রিজ সাফা করতো সেই মেয়ে দুটোর নাম সমতা নাগ ও রত্না সাহা।

কলেজ জীবন থেকে এই অবধি সুখে-দুঃখে যে সবসময় ছায়ার মতো পাশে থাকে সেই মেয়েটার নাম শিল্পী বালা। একই রুমে আমি নামাজ পড়েছি আর ও করেছে পূজোর প্রার্থনা। এক বালিশে হিন্দু-মুসলিম দুই কন্যা রাতের পর রাত সুখ-দুঃখের, হাসি-তামাশার অট্টহাসির সময় কাটিয়েছি ,আমাদের কারোই জাত যায় নাই। ওদের বাড়ীতে বেড়াতে গিয়েছিলাম ।আমার খুব মনে আছে, শিল্পীর বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক ছিলেন, অসুস্থ ছিলেন ,ভালো করে হাঁটতে পারতেন না …তারপরে আমি যাওয়ার আনন্দে বাজার থেকে তাজা মাছ কিনে এনেছিলেন।দোতালা বাড়ির উপরের ঘরে করে দিয়েছিলেন আমার থাকার জায়গা, যেন আলো  বাতাসে সমস্যা না হয় । ওর বাড়ির প্রতি সদস্য এখনো স্নেহ করেন ।

কলেজের সাথী মুক্তা বসু, চামেলী বসু, রত্না কর, ইলোরা দাশ সবার সাথে এখনো যোগাযোগ হয় আমার নয়, ওদের ইচ্ছায় । কারণ ,আন্তরিকতায় ওরা আমার চাইতে অনেক বেশী এগিয়ে ।
ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষার সময় টনসিল ইনফেকশনে যখন প্রচণ্ড কষ্টে কাতরাতাম তখন ১৭৫ জনের গণরুমে যে আমাকে মুখে ভাত তুলিয়ে খাওয়াতো, পরীক্ষার প্রবেশ পত্র, পেন্সিল বক্স গুছিয়ে দিতো সেই মেয়েটার নাম মুনমুন সাহা। আমার কাছে প্রচণ্ড রকমের খারাপ ব্যবহার পাওয়া সত্তেও যে আমার হাতটা কখনো ছাড়ে নাই, যে মেয়েটা আমাকে ছাড়া ভার্সিটিতে ক্লাসে যেতো না, সেই খুব ভালো মেয়েটার নাম মিরা সরকার।
কাঁসা অথবা সিলভারের বড় প্লেটে ছোট ছোট বাটিতে সবজি, নাড়ু বা লুচি সাজিয়ে দিতেন আমার এক বান্ধবীর মা ।তাদের বাড়ি গেলে এক মুখ হাসি নিয়ে অপেক্ষা করতেন, তোমার জন্য রেঁধেছি যিনি বলতেন অথবা যে বান্ধবীর পরিবারের পরিচ্ছন্নতার আন্তরিকতার ঘ্রাণ আমায় এখনো খুব টানে তার নাম রেখা সীংঘানীয়া। ভার্সিটি লাইফে সব সময়ে যে সহনুভুতীর মিষ্টি হাত কাঁধে রেখেছে সেই মেয়েটার নাম আশা লতা।

এই পরবাসে এসেও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সহানুভূতি পেয়েছি। মহানুভবতা উপলব্ধি করছি প্রতিনিয়ত। কিন্তু যতটা পাচ্ছি ততটা দিতে পারছি না ।সম্পূর্ণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় বা পরিবেশে বড় হয়েও সংখ্যালঘুদের কাছে পেয়েছি এতটা। বিনিময়টা দেওয়া হয়ে ওঠেনি কখনো। শুধু নিয়েছি, দেই নি কিছুই।
আমার মেয়ের বাবা বলেন, তোমার সব রান্নায় হিন্দু হিন্দু ঘ্রাণ পাই। আমি সত্যি হিন্দু হিন্দু ঘ্রাণে রান্না করি । সম্ভবত ওদের আন্তরিকতায় আমি জড়িয়ে গেছি, তাইতো কালিজিরা, সরিষা, পাঁচফোড়নের কৌটা আমার মসলার ঝুড়ির শোভা বাড়ায়। হিন্দুদের আন্তরিকতায় সুবাস ও ভীষণ রকমের ঘ্রাণ। আমি তাদের সুবাস নিয়েছি কিন্তু আমাদের সুবাস তাদের দেওয়ার সময় হয়ে ওঠে নাই।

ছোটবেলায় নানীর সাথে মহারাজপুর যেতাম অথবা দাদীর সাথে মোচনা অথবা বড় হয়ে হিন্দু কোন পুরাতন বাড়ি যেখানে এখন মুসলমানদের বসবাস । যেখান থেকে তারা চলে গেছেন ১৯৪৭ এর আগে-পরে অথবা ১৯৭১ এর আগে-পরে অথবা এখনো তারা চলে যাচ্ছেন বডারের ওপার। ঐসব বাড়িতে গেলে মনে হয়, এককালে এখানে যে সজীব প্রাণের সঞ্চার ছিল আজ কেবল ইট কাঠ দেওয়াল ও গাছের দীর্ঘশ্বাস। দীর্ঘশ্বাস যে জানা বা অজানা অভাব বা কষ্ট থেকে সৃষ্টি হয়। সেই কষ্ট বা অভাব আর সৃষ্টি না হোক, হিন্দু মুসলমান বন্ধুত্বের সুঘ্রানে মুহুমুহু করুক নিরন্তর আমার দেশের আকাশ বাতাস।

শরীফা তাসমীম টুলটুলী
লেখক, শিক্ষক ও কমিউনিটি ওয়ার্কার
পার্থ, অস্ট্রেলিয়া।