হেফাজতী তাণ্ডব এবং অতঃপর । রণেশ মৈত্র

  •  
  •  
  •  
  •  

 178 views

হেফাজতী তাণ্ডব অথবা অনুরূপ শিরোনামে বিগত ২৯ মার্চে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সকল দৈনিক পত্রিকায় যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা যেমন নৃশংসতার চরম উদাহরণ-তেমনই আবার বাংলাদেশের রক্তার্জিত স্বাধীনতার প্রতি মারাত্মক হুমকি।
একাত্তরে পাক-সেনারা, জামায়াতে ইসলামী, আল বদর, আল শামস “ইসলাম রক্ষার” নামে বাঙালি নিধনে প্রবৃত্ত হয়েছিলো, সেই একই উদ্দেশ্য নিয়ে আজ জঙ্গী উৎপাদনকারী সর্বাধিক সংগঠিত প্রতিষ্ঠান হেফাজতে ইসলাম কয়দিন যাবত দেশব্যাপী তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। তাতে তিন দিনে ১৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে। অগ্নিদগ্ধ করা হয়েছে রেল ষ্টেশন, সরকারি নানা অফিস, থানা, ধ্বংস করা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সকল ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও কীর্তিসমূহ, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিসহ অনেক কিছু।

উপলক্ষ্য ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ আগমণ, মুজিব শতবর্ষ ও মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ জয়ন্তীতে আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে যোগদানের বিরোধিতা। নরেন্দ্র মোদি সাম্প্রদায়িক দলের নেতা, ভারতে বহু মুসলিম নিধন করেছেন-তা সত্য। কিন্তু বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবিস্মরণীয় ভূমিকা কি তাই বলে বিস্মৃত হওয়া যাবে বা তাকে অশ্রদ্ধা জানানো যাবে?
পাল্টা সঙ্গত ভাবেই এ প্রশ্নও তো করা যেতে পারে লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে নিধনকারী, নারী ধর্ষণ লুটপাট চালানো পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রীকে ঐ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে আনা হতো-তখনও কি লক্ষ লক্ষ বাঙালি মুসলিম নিধন ও বাঙালী নারী ধর্ষণের কারণে তাঁর বিরোধিতা করতে দেশপ্রেমিক হেফাজতে ইসলাম একই রূপ ভূমিকা নিত? পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা হাজার হাজার কোটি টাকা ফেরত আনার দাবি ভুলেও কি হেফাজতে ইাসলাম উত্থাপন করেছে বা সেই দাবীতে হরতাল, সমাবেশ, মিছিল করেছে?

আরও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, নরেন্দ্র মোদি গুজরাতের মূখ্যমন্ত্রী থাকাকালে যখন ঐ মুসলিম নিধন ও পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যখন বাবরি মসজিদের সাথে রামমন্দির নির্মান শুরু করে, তখন কি হেফফাজতে ইসলাম তার প্রতিবাদে কোন ভূমিকা রেখেছিল?
হেফাজতে ইসলামের ঘোষিত নীতি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই দাবী কি আদৌ বাংলাদেশের অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতাকে মেনে নেবে? আমারে মুক্তিযুদ্ধও হয়েছিল ধর্ম নিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক নীতির ভিত্তিতে। সেখানে কি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের আদৌ অবকাশ আছে বাংলাদেশকে “ইসলামী রাষ্ট্র” ঘোষণার?
কয়দিন ধরে ঢাকায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ও হাটহাজারী, নারায়নগঞ্জসহ দেশের নানা স্থানে মোদির আগমনের বিরোধিতার নামে যে তাণ্ডব চালানো হলো, অগণিত সাংবাদিককে তাঁদের কর্তব্যরত অবস্থায় গুরুতর আহত করা হলো-এগুলিই কি তাহলে তথাকথিত ইসলামী রাষ্ট্রের দাবিতে আন্দোলনের নমুনা? মানুষের জীবন ও সম্পত্তি নিয়ে ছিনিমিনি খেলাও কি ইসলাম সম্মত?

যে বার্তা দেশবাসীর কাছে ক্রমাগত পৌঁছে দিচ্ছে হেফাজতে ইসলামী তাতে তো স্পষ্টই বুঝা যায়-তারা বাংলাদেশের সংবিধান মানতে রাজী না-আইন-কানুন মানতেও রাজী নন।
হেফাজতে ঢাকায় তাদের প্রথম সমাবেশে সরকারের শিক্ষানীতি, নারী নীতিসহ রাষ্ট্রের মূলনীতি সমূহের প্রকাশ্য বিরোধিতা করে প্রকাশ্যে সরকার উৎখাতের দাবী উত্থাপন করেছিল। এবারও নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতায় আয়োজিত মিছিলগুলিতে এই সরকারের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেওয়া হয়েছে।
একই সাথে উল্লেখ না করে পারা যায় না-এত এত সন্ত্রাসী কাজ করা এবং সংবিধান-বিরোধী দাবী তোলা ও সরকার উৎখাতে নিয়োজি থাকা সত্বেও সরকার হেফাজতে ইসলামের মত বিষধর সাপকে দুধ কলা দিয়ে পুষেই চলেছে। ঢাকার প্রথম সমাবেশের পর তারা “ঢাকা অবরোধ” করে অবস্থান করাকালে রাতের গভীরে পুলিশ দিয়ে হেফাজতের সমাবেশ বা অবস্থান-অবরোধ কর্মসূচী শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ভেঙ্গে দিয়ে হেফাজতের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে বহু সংখ্যক মামলা দায়ের করা হলেও শেষ পর্য্যন্ত দেখা গেল সকল মামলাই প্রত্যাহত, হাটহাজারী মাদ্রাসা ও আল্লামা শফি হুজুরকে বিপুল পরিমাণ জমি উপহার, ফায় ফায় চিকিৎসার জন্য আল্লামা শফিকে হেলিকপ্টার যোগে ঢাকায় এনে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, ঢাকার কাছাকাছি অপর একসমাবেশে হেফাজতে ইসলামের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান, মাদ্রাসার সর্বোচ্চ উচ্চ শিক্ষার সার্টিফিকেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীর সমতুল্য বলে ঘোষণা, আল্লামা শফির বলার সাথে সাথে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গন থেকে জাষ্টিশিয়া নামক ভাস্কর্য্য আদালতের অপর পাশে অপসারণ, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য্য নির্মানেরসিদ্ধান্ত জেনে মওলানা মুমিনুল ( হেফাজাতের যুগ্ম সচিব) হুমকি দেওয়াতে আজতক সেই ভাস্কর্য্য নির্মাণ না করা এবং এত কিছু করার পরও আজতক হেফাজতের কারও বিরুদ্ধে কোন মোকর্দমা দায়ের বা কাউকে আটক না করা-এভাবেই সরকার হেফাজতনামক গোখরা সাপকে দুধ কলা দিয়ে দিব্যি পুষেই চলেছে।

২৬ মার্চ থেকে সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘এসব উচ্ছৃংখলতা বন্ধ না করলে জনগণের জানমাল ও সম্পত্তি রক্ষায় সরকার কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হবে। তিনি আরও বলেন, কয়দিন ধরে কতিপয় উচ্ছৃংখল ব্যক্তি উচ্ছৃংখলতা যারা করলো তাদের নাম বা হেফাজতের নাম অনুল্লেখিত গোষ্ঠী ও ধর্মীয় উন্মাদনায় চট্টগ্রামের হাটহাজারি উপজেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, নরাইল ও আন্তঞ্জ উপজেলায় সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করে চলছে। যার মর্ধে উপজেলা পরিষদ, থানা ভবন, সরকারি ভূমি অফিস, পুলিশ ফাঁড়ি, রেল ষ্টেশন, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বাড়ীঘর, প্রেসক্লাবসহ মানবসম্পদের ক্ষতি করে যাচ্ছেন। এ জাতীয় ক্ষয়ক্ষতি সকল প্রকার উচ্ছৃংখলতা বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছি। অন্যথায় জনগণের জানমাল, সম্পদ রক্ষার্থে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে।

অনুরূপ প্রতিক্রিয়াই দিয়েছেন আইনমন্ত্রী সহ মন্ত্রীসভার আরও কয়েকজন সদস্য।
এখন প্রশ্ন হলো, এ যাবত চারদিন যাবত যে সব অপরাধ হেফাজত করলো, যত সরকারি বেসরকারি সম্পত্তি ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টিকরে ধ্বংস করা হলো-সেগুলি কি বৈধ? আইন সম্মত? যদি তা না হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা বা কাউকে এ যাবত গ্রেফতার করা হলো না কেন? তাদেরকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে কেন?
যাঁদের জান মালের ক্ষতি হলো, কর্তব্যরত যে সকল সাংবাদিক, পুলিশ আহত হলেন-তাদেরকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হেফাজতকে বাধ্য করা হবে কি?
বাঙালী জাতি বহু সংগ্রাম বহু লড়াই, বহু ত্যাগ তিতীক্ষার মধ্য দিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছে। জাতির স্বপ্ন অনেক। সে স্বপ্নগুলি বাস্তবায়নে সরকার সাংবিধানিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তাই সরকারের নিষ্ক্রিয়তার জনগণ স্বাভাবত:ই ক্ষুব্ধ। ক্ষুব্ধ এ দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা, সাংবাদিক সমাজ ও দেশ প্রেমিক ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী সকল নাগরিক।
হেফাজত জামায়াত তোষণের নীতি তাই অবিলম্বে এবং দ্বিধাহীনভাবে পরিত্যজ্য। মনে রাখা প্রয়োজন এই হেফজাত ও জামায়াতী মতাবলম্বীরাই আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের তীব্র এবং সক্রিয় বিরোধিতা করেছে এটাই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে বাঙালির শত্রু পাকিস্তানের পক্ষে কাজই করে নি শুধু তাদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞে সহযোগিতা করেছে।
তাই নমনীয়তা পরিত্যাগ করে অবিলম্বে সকল হেফাজতী দুস্কৃতিকারী হেফাজতের সকল নেতা কর্মীকে আইনের আওতার এনে গ্রেফতার করে জেলেপাঠানো হোক। অপরাপর অপরাধের সাথে সবচাইতে বড় যে অপরাধ হেফাজত করেই চলেছে তা স্পষ্টত:ই রাষ্ট্রদ্রোহিতা। তাই রাষ্ট্র দ্রোহিতার সুনির্ধিষ্ট অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে আনা হোক।
এই নিবন্ধসংবাদ পত্রে প্রকাশ পাওয়ার আগেই জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়ে যাবে। তাই এই অধিবেশনেই সংবিধানের আর একটি সংশোধনী এনে-
এক.হেফাজতে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হোক;
দুই. জিয়াউর রহমানের কীর্তি বিসমিল্লাহির রাহমানুর রাহিম এবং এরশাকৃত রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম প্রত্যাহার করে বাহাত্তরের সংবিধান অবিকল পুনরুজ্জীবিত করা হোক।

রণেশ মৈত্র
রাজনীতিবীদ, কলামিস্ট
একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক
বাংলাদেশ।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments