৩রা নভেম্বর : আমার চিন্তায় তার তাৎপর্য্য । রণেশ মৈত্র

  •  
  •  
  •  
  •  

ঘটনার পর ঘটনা। সবগুলিই প্রায় একই ধরণের। এই ঘটনাগুলি কখনও জাতীয় বা স্থানীয় নেতাদের উপর অতর্কিতে সশস্ত্র হামলার মাধ্যমে দেশটাকে নেতৃত্বশূণ্য করার লক্ষ্যে নৃশংস হত্যালীলা-আবার চলছে ধর্মের নামে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর দেশজুড়ে একের এক হামলা-যা আদৌ কোন দিন বাংলাদেশে থামবে কি না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
হামলা আবার শুধুমাত্র রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত তা ঠিক না অথবা শুধুমাত্র ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যেই সীমিত তাও না। এ মৃত্যু নানাভাবে, নানা কারণে, নানা অজুহাতে ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র।

আবার নেতৃত্বহীন করা কি উদ্দেশ্যে? এই উদ্দেশ্যটা ভাসাভাসা বুঝি আমরা। লোকেও সেভাবেই বুঝুক-তাও আমরা চাই। তাই সেদিকটার যথাযথ উল্লেখ না করে যথাযথ মর্যাদা সহকারে আমরা দিন দুটি পালন করি। যা এ উপলক্ষ্যে নতুন প্রজন্মকে বলে থাকি তা হলো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের রেকর্ড সর্বত্র বাজাও। বছরের পর বছর থেকে রেকর্ডটি যেখানে সেখানে যখন তখন বাজানো হয়। কিন্তু একটি লোককেও দেখি না-কোন চেয়ার বা বেঞ্চ বা চাটাই পেতে বসে বা দাঁড়িয়ে ভাষণটির শুরু থেকে শেষ অবধি শুনতে। আসলে কোন কিছু এক ঘেঁয়ে হয়ে গেলে যা হয়।
৩ নভেম্বরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিহত চার জাতীয় নেতার কারও তো ঐ ধরণের রেকর্ড নেই-যা প্রতি বছর নির্দিষ্ট দিনে বাজিয়ে শুনানো হবে। যা আছে তা হলো ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগরের আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রীসভার আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রদত্ত সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিনের ভাষণ যা পরদিন অবরুদ্ধ বাংলাদেশ ব্যতীত পৃথিবীর সকল দেশের সংবাদপত্রে গুরুত্ব সহকারে প্রচারিত হয়েছিল।

আজ মুজিবনগরের ঐ নয়মাসব্যাপী সরকারের মন্ত্রীরা কোথায় কি বলেছিলেন-সেগুলির সংকলন করে কোন গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ সরকারি বা বেসরকারি কোন ভাবেই তার উদ্যোগ নেই। আমরা মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশত বার্ষিকী বা সুবর্ণ জয়ন্তী বছর ব্যাপী যখন পালন করছি-তখনও সে উদ্যোগ কোথাও পরিলক্ষিত হয় না। যেন সেটার কোন ঐতিহাসিক গুরুত্বই নেই।
আরও একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হতে পারে এবং হওয়া অত্যন্ত জরুরী। তা হলো ঐ নয়মাস ধরে পৃথিবীর নানা দেশে এবং বেতার টেলিভিশনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে সকল প্রতিবেদন ও সংবাদ পর্য্যালোচনা প্রচারিত হয়েছিল-সেগুলিকেও গ্রন্থীভূত করা।
সরকারের কর্তব্য, এ ব্যাপারে অবিলম্বে উদ্যোগী হয়ে এমন সব প্রকাশনার ব্যবস্থা করা কারণ তার দ্বারাই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস চাক্ষুষ প্রতিবেদন ও মন্তব্য জানা যেতে পারে। এ ব্যাপারে বিলম্ব হয়ে গেছে অনেক।

৩ রা নভেম্বরে নৃশংস ভাবে প্রাণ হারান জাতীয় চার নেতা।

কিন্তু এখনও সময় আছে। দ্রুত এ উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য সরকারের সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমী ও অপরাপর প্রকাশনা সংস্থাগুলির প্রতি আবেদন জানাই।
মুক্তিযুদ্ধ কোন এক দলীয় ব্যাপার ছিল না। শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ করেছে তা আদৌ ঠিক না। তার সাথে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। এই ভূমিকার সাথে মুজিবনগর সরকার, ভারত সরকার, সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সরকার ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকার ফলেই নয় মাসের মধ্যেই দেশের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান-তাই গোটা জাতিকে ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভূতপূর্ব বিজয় অর্জনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। একই সাথে কর্তব্য, তিলে তিলে গড়ে তোলার এই বিশাল ঐক্য গড়ে তোলার পিছনে ন্যাপ নেতা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক পংকজ ভট্টাচার্য্য, সি.পি.বি’র সভাপতি কমরেড মনি সিংহ ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ ও ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের অসংখ্য যোদ্ধার অবদান অনস্বীকার্য্য। কিন্তু এ যাবত প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংক্রান্ত অসংখ্য পুস্তক হলেও এ বিষয় কি কোন পুস্তকে যথার্থ গুরুত্ব লাভ করেছে?
যে মর্মান্তিক হত্যালীলাগুলির কথা পূর্বাহ্নে উল্লেখ করেছি তার উদ্দেশ্য এগুলিই। এগুলিই তারা আমাদেরকে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল এবং দিব্যি আমরা সব ভুলেও গিয়েছি। তারা পেছনে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে দিব্যি তৃপ্তির হাসি হাসছে।
দেশে একটি সংবিধান অনুমোদিত হয়েছিল ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। তাতে চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছিল তাতে স্পষ্টাক্ষরে লিখিত হয়েছিল গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ। ধর্মের নামে কোন সংগঠন করা বা তার অস্তিত্ব বজায় রাখা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান ও খোন্দকার মোশতাক ক্ষমতায় এসে ধর্মাশ্রয়ী দলগুলিকে বৈধ করে দিলেন; সংবিধানের শুরুতে “বিসমিল্লাহ” বসালেন, এরশাদ এসে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম বানালেন। এসবই বঙ্গবন্ধুর চিন্তা, ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পরিপন্থী। এই সব সংশোধনী যাঁরা অনুমোদন করলেন-তাঁরা সংসদের মাধ্যমে নয়-সামরিক আইনে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে। ধর্মের প্রসারের জন্যে নয় নিজ নিজ ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার লক্ষ্যে।

এ কথা বললে বেশী বলা হবে না-যদি মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লিখিত না হয়, জাতীয় বীর হিসেবে যথাযথ মর্য্যাদায় মজলুম জননেতা মওলানা ভাষানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, কমরেড মনি সিং, কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, পংকজ ভট্টাচাপর্য্য প্রমুখ সকলকে (মনোরঞ্জন ধর সহ) যথাযথ মর্য্যাদায় স্মরণ করে নতুন করে নতুন ধরণের জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে বাহাত্তরের মূল সংবিধানকে অবিকৃতভাবে পুরুজ্জীবিত করা না হয়, জামায়াত-হেফাজতকে বে-আইনী ঘোষণা করে তাদের সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা না হয়, পাঠ্যপুস্তকগুলিকে অসাম্প্রদায়িক করা না হয়, এক কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম করা না হয়, নারী-পুরুষের সম-মর্য্যাদা যথার্থভাবে প্রতিষ্ঠা করা না হয়, পুঁজিবাদকে বিদায় জানিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে সকল সমাজতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অগ্রসর হওয়া না হয়-বঙ্গবন্ধুকে ও বাংলাদেশকে নামে না হোক, কাজে আমরা উভয়কেই হারানোর আশংকার সৃষ্টি হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু সহ সকল জাতীয় নেতা ও মুক্তিযোদ্ধাকে স্যালিউট জানাই।
( সংক্ষেপিত)

রণেশ মৈত্র
সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ
কলামিস্ট, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।
বাংলাদেশ।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments