আ্যশ বার্টির অস্ট্রেলিয়া ওপেন জয় : ৪৪ বছরের খরার সমাপ্তি

  
    

মিতা চৌধুরী, মেলবোর্ন থেকে : অস্ট্রেলিয়ানরা বরাবরই ক্রীড়াপ্রেমী, আর তাই সারা বছর জুড়েই ঘরোয়া বিভিন্ন খেলাধুলার পাশাপাশি আয়োজন করা হয় বেশকিছু নিয়মিত আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট যার অন্যতম বড় ও জমজমাট আয়োজন টেনিসের অস্ট্রেলিয়ান ওপেন। ১৯০৫ সালে শুরু হওয়া এই আয়োজনকে ঘিরে তাই শুধু অস্ট্রেলিয়ানদেরই নয় বরং মাতিয়ে রাখে সারা বিশ্বের ক্রীড়াপ্রেমীদের। কিন্তু ১১৭ বছরের ঐতিহ্যপূর্ণ এই আয়োজনে ১৯৭৮ সালের পর আর কোনো অস্ট্রেলিয়ান নিজ ঘরের মাঠে এই শিরোপা জয় করতে পারেনি, যা নিঃসন্দেহে অস্ট্রেলিয়ান ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়াপ্রেমীদের মানসিকভাবে পীড়ায় রাখে। সঙ্গতকারণেই প্রতিবারই তাই এই আয়োজন এলে প্রতিটি অস্ট্রেলিয়ান মুখিয়ে থাকে। অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পালা শেষ হলো গতরাতে ২৯ জানুয়ারি মেলবোর্নের রডলিভার এরেনায়।

ওয়ার্ল্ড টেনিসের বর্তমান নাম্বার ওয়ান প্রমিলা খেলোয়াড়, অস্ট্রেলিয়ান টেনিস তারকা অ্যাশ বার্টি সুদীর্ঘ ৪৪ বছর পর অস্ট্রেলিয়া ওপেন জয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময়ের এই খরার অবসান ঘটিয়েছেল। গতরাতে ২৯ জানুয়ারি মেলবোর্নের রড লিভার এরেনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ড্যানিয়েল কলিন্সকে একটি উত্তেজনাপূর্ণ মহিলাদের ফাইনালে পরাজিত করে। ১৯৭৮ সালে ক্রিস ও’নিলের পর থেকে বার্টিই প্রথম অস্ট্রেলিয়ান যিনি ৪৪ বছরে তাদের নিজ মাঠে একক কোন শিরোপা জিতেছেন।

অ্যাশ বার্টি প্রথম সেটে জয়লাভ করেছিল কিন্তু দ্বিতীয় সেটে এসে ২৫ বছর বয়সী আপাতদৃষ্টিতে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছিলো আমেরিকান কলিন্সের কাছে, আর কোলিন্সও এই মুহূর্তটা কাজে লাগিয়ে অনেকটাই আক্রমণাত্মক খেলা খেলছিল, যা বার্টিকে মানসিকভাবে অস্বস্থিতে ফেলার কৌশলও ছিল বটে। কিন্তু অ্যাশ বার্টি তার ধীর-স্থির খেলা ও ঠান্ডা মাথায় প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করার জন্য সুপরিচিত, আর ঠিক সেই মেধার সঠিক ব্যবহার করেই দ্বিতীয় সেটের মাঝামাঝি এসে আবারো ঘুরে দাঁড়ায় বর্তমান নং ১ এই টেনিস তারকা। তার এই ঘুরে দাঁড়ানো শুধু ক্রীড়া প্রেমীদের কাছেই নয় বরং সারা দুনিয়ার মানুষের মনে থাকবে, অন্তত আগামী কয়েক দশক। তিনি ড্যানিয়েল কলিন্সকে ৬-৩, ৭-৬ (৭-২) এ পরাজিত করেন।

বার্টি এমন একজন সংযমী খেলোয়াড় যিনি শুধু এই চ্যাম্পিয়নশিপ’ই নয় বরং আরও অনেক কিছু জিততে পারবেন আগামীর দিনগুলিতে। রড ল্যাভার অ্যারেনায় তার সাথে প্রতি মুহূর্ত উল্লাস, উত্তেজনায় ও কান্নাকাটিতে উপস্থিত থাকা শত শত অস্ট্রেলিয়ান জনতার সামনে বার্টি শান্তভাবে ড্যানিয়েল কলিন্সের প্রতিটি আক্রমণাত্মক খেলা ও আগুন প্রশমিত করেছিলেন। এখানে বলাই বাহুল্য যে এই ফাইনালে বার্টির উপর ছিল অভাবনীয় মানসিক চাপ, সারা দেশের লক্ষ্য লক্ষ্য অস্ট্রেলিয়ান তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে, ৪৪ বছরের এই খরার ইতি টানার যে চাপ তাঁর উপর অর্পিত হয়েছিল তা বার্টি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পূরণ করেছেন।

তিনটি গ্রান্ড স্ল্যাম শিরোপা নিজ নামের পশে যুক্ত করে বার্টি যুক্ত হয়েছেন সেরেনা উইলিয়ামসের নামের সঙ্গে যিনি টেনিসের তিন ধরণের মাঠেই শিরোপা জিতেছেন, এর পূর্বে এই বিরল কৃতিত্বের একমাত্র নারী টেনিস তারকা ছিলেন সেরেনা উইলিয়ামস ! আন্তর্জাতিক  টুর্নামেন্টে বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত করে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তার আদিবাসী ঐতিহ্যে ও পরিচয়ের কথা গর্বিতভাবে জনসম্মুখে প্রচার করা অ্যাশ বার্টি, চারবারের অস্ট্রেলিয়ান ওপেন চ্যাম্পিয়ন ইভন গলগং-কাওলির পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন বলে সকলের বিশ্বাস।

বার্টির জন্ম ২৪ এপ্রিল ১৯৯৬ ইপসউইচ, কুইন্সল্যান্ডে মা জোসি এবং বাবা রবার্ট বার্টির ঘরে। তার প্রপিতামহের মাধ্যমে, বার্টি আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ান এনগারাগু জনগণ, দক্ষিণ নিউ সাউথ ওয়েলসের আদিবাসী বা স্থানীয় জনগণ এবং উত্তর-পূর্ব ভিক্টোরিয়ার সদস্য। মাত্র ৪ বছর বয়সেই বার্টির টেনিসে হাতেখড়ি হয়ে তার দীর্ঘদিনের প্ৰশিক্ষক (সাবেক) জিম জয়েসের হাতে। ২০০৯ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে বার্টি তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা জয় করেন যা ছিল গ্রেড-৪ অস্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল। সেই থেকে এখন পর্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ উইম্বলডন, ফ্রেঞ্চ ওপেন, ইউ এস ওপেন ডাবলস্ সহ বহু শিরোপা বার্টি তার ঝুলিতে যুক্ত করেছেন যার সর্বশেষ সংযোজন বহুপ্রতীক্ষিত অস্ট্রেলিয়ান ওপেন।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments