নীল দরিয়ার নোনা জলে – সাদাত হোসাইন (দ্বিতীয় পর্ব)

  •  
  •  
  •  
  •  

নীল দরিয়ার নোনা জলে

সাদাত হোসাইন

 

সম্প্রতি প্রশান্তিকা ও মাসিক মুক্তমঞ্চের আমন্ত্রণে অস্ট্রেলিয়ায় সিডনি, মেলবোর্ন ও ব্রিসবেনে এসেছিলেন সাদাত হোসাইন। শুনিয়ে গেলেন তাঁর ‘জীবনের গল্প, গল্পের জীবন’ শীর্ষক আলেখ্য। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এই প্রথম ভ্রমণ কাহিনী লিখছেন সাদাত হোসাইন…

 

প্রথম পর্ব

প্রথম পর্বের শেষে….
ঠিক ১ টায় ফ্লাইট। আমি তাকিয়ে আছি এয়ারপোর্টের ডিস্প্লে’র দিকে। কত কত ফ্লাইট, কত কত দেশ, কত কত মানুষ, কত কত ঘর, সব এসে কেমন একাকার হয়ে গেছে এখানে। পেচিয়ে যাওয়া সুতোর মতোন। খানিক বাদেই সুতোগুলো আলাদা হয়ে যাবে, ছুটতে থাকবে নিজ নিজ গন্তব্যে। কেউ কেউ পেছনে ফেলে যাবে ফিরে আসবার অপেক্ষা। কেউ কেউ সামনে রেখে এসেছে ফিরে যাবার অপেক্ষা।
অপলক তাকিয়ে রইলাম। পাশাপাশি ডিসপ্লে-তে লেখা এরাইভাল আর ডিপারচার।আমার হঠাৎ মনে হলো, এ যেন আস্ত এক জীবন। জীবনেরর আখ্যান। এখানে কেবলই অপেক্ষা, এরাইভাল আর ডিপারচারের। আগমন আর প্রস্থানের…
দ্বিতীয় পর্ব: বিষণ্ণ বসতি
স্থান- ক্যাথে প্যাসিফিক এয়ারওয়েজ (ঢাকা-হংকং)
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা আমার স্বভাব। দরজায় তালা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ মনে হবে, তালা আসলেই দিয়েছিলাম তো! কিংবা ভোর আটটায় ট্রেন বা বাস ধরতে হবে, কিন্তু কোন কারণে যদি মিস করে ফেলি? এই দুশ্চিন্তায় সারারাত আর ঘুম হবেনা।
এটি ভয়াবহ মানসিক অস্থিরতা। যা একধরণের এংজাইটি ডিজঅর্ডারের মধ্যে পড়ে। মেডিকেল সায়েন্সে যা অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডারের (OCD) অন্তর্ভুক্ত। আমার ধারণা এই সমস্যা আমার আছে। ভালোভাবেই আছে। রাতে ঘুমাতে গেলেও হুট করেই আমার দুশ্চিন্তা হতে থাকে, এই বুঝি সিলিং থেকে ফ্যান ছুটে গায়ে পড়লো আমার!
আমার হাতে টিকেট। প্রথমে ঢাকা টু হংকং। তারপর হংকং টু সিডনি। ক্যাথে প্যাসিফিক এয়ারওয়েজের CX 5111 ফ্লাইটে আমার হংকং যাত্রা। ঢাকা থেকে ঠিক রাত ১ টায় প্লেন ছাড়বে। ইমিগ্রেশন ক্রস করে আমি দাঁড়িয়ে আছি। ঘড়িতে তখন বাজে দশ টার কিছু বেশি। অর্থাৎ আরও প্রায় ঘণ্টা তিনেক সময় আমার হাতে। এই সময়ে আমি টিভিতে খেলা দেখতে পারি। বাসায় ফোন করে কথা বলতে পারি। আমার পকেটে ইবিএলের ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট কার্ড আছে। এই কার্ড ব্যবহার করে আমি এয়ারপোর্টের ইবিএল স্কাইলাউঞ্জে ফ্রী বুফে খাওয়া দাওয়া করতে পারি। আয়েশ করে বিশ্রাম নিতে পারি।
কিন্তু আমি এর কিছুই করলাম না। আমি যা করলাম, তার নাম দুশ্চিন্তা! আমার বারবার মনে হতে লাগলো, এই বুঝি গেট বন্ধ হয়ে গেলো, আমি ফ্লাইট মিস করে ফেললাম। কিংবা আমার ঘড়ির টাইম ঠিক নেই। হতে পারে না এমন যে, হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলো ঘড়ি! এমন নানান দুশ্চিন্তা!
এই দুশ্চিন্তা নিয়েই আমি নির্ধারিত গেটে গিয়ে দাঁড়ালাম। দীর্ঘ সময়। তারপর আচমকা দেখি, আমার পাশে টুকটুক করে লোক জমা হচ্ছে। তাদের বেশিরভাগই বিদেশি নাগরিক। লাইনে আমার সামনের ও পেছনের, দুজনই বিদেশি। আমি ইংরেজী যতটুকু বুঝি, তাও ওই বাংলাদেশি উচ্চারণের ধীর গতির ইংরেজী। পশ্চিমা উচ্চারণের ইংরেজী বুঝতে আমার থরহরিকম্প অবস্থা। সেই আমি কোনক্রমে তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিলাম, এটি ঢাকা টু হংকং ফ্লাইট। খানিক নিশ্চিন্ত বোধ করতে লাগলাম। ভাবলাম, এই লোক নিশ্চয়ই সিডনি যাবেন। হংকং এর দুই ঘণ্টার ট্র্যানজিট নিয়ে আমার ভয়াবহ দুশ্চিন্তা। শুনেছি হংকং এর এয়ারপোর্ট নাকি ছোটখাটো শহরের সমান। এক গেট থেকে আরেক গেটে পৌঁছাতেই কুড়ি-পঁচিশ মিনিট লেগে যায়। ভেতরে ট্রেনও চলে। গেট খুঁজে পাওয়াও ভয়াবহ কঠিন কাজ! এই কঠিন কাজ আমি করব কী করে? যথারীতি দুশ্চিন্তায়  অস্থির অবস্থা। সেই অস্থিরতা কাটাতেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর ইউ গোইং টু সিডনি?’
ভদ্রলোক কী বুঝলেন কে জানে? জবাবই দিলেন না। আমি রাজ্যের সংকোচ নিয়ে দ্বিতীয়বার আবার জিজ্ঞেস করলাম। তিনি শ্রাগ করার ভঙ্গিতে ঘাড় ঘুরিয়ে নিতে নিতে বললেন, ‘নো, আই এম গোইং টু নিউইয়র্ক!’
আমি ঘটনা কিছুটা হলেও বুঝলাম। এই ফ্লাইটের অনেকের পথই হংকং থেকে  আলাদা হয়ে যাবে। কেউ সিডনি, কেউ নিউইয়র্ক, কেউ অন্য কোথাও!
মানুষের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলো। সেই সারিতে ধীরে ধীরে বাঙালি মুখও দেখা গেলো কিছু। খানিক হলেও যেন স্বস্তি ফিরে এলো মনে। আমি প্লেনে উঠলাম!
এমন আজদাহা প্লেনে এর আগে কখনো উঠিনি আমি। পূর্বের কলকাতা যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে ক্যাথে প্যাসিফিক এর এই বিশাল প্লেনের ভেতরটাকে বড় অচেনা মনে হলো আমার। যেন বিশাল এক অডিটোরিয়াম। ট্রেনের কম্পার্টেমেন্টের মতো অনেকগুলো কম্পার্টেমেন্ট  ভেতরে। পাশাপাশি বসার অনেকগুলো সারি। আমার সিট পড়েছে তৃতীয় কম্পার্টমেন্টের বাঁ দিকের সারির প্রথম আসনে। অর্থাৎ আমার সামনে আর কোন সিট নেই। ফাঁকা জায়গা অনেকটা। তারপরই দেয়াল। দেয়ালের ওপাশে অন্য কম্পার্টমেন্ট। আমি জড়সড় হয়ে সেই সিটে বসলাম। পাশেই জানালা। জানালার বাইরে ঢাকা এয়ারপোর্টের হলুদ আলো। ছোট ছোট মানুষ। বড় বড় প্লেন। আবু ইসহাকের মহাপতংগ গল্পের কথা মনে পড়লো আমার। যেন সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পেট কেটে বের করে আনা হচ্ছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানুষ। আমি সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার কেমন মন খারাপ হচ্ছে। বাড়ির জন্য, মায়ের জন্য, বাবার জন্য, নুসরাতের জন্য, ভাইয়ের জন্য, বোনের জন্য। মাত্রতো ক’টা দিন, কিন্তু এখুনি এমন মন খারাপ হচ্ছে কেন আমার?
খানিক শব্দ হতে আমি বাঁ দিকে তাকালাম। ভোঁতা নাকের এক লোক এসে বসেছেন আমার পাশে। মনে মনে ভাবলাম, তার সাথে খানিক কথা বলা যাবে হয়তো। কিন্তু বসার দুই মিনিটের মাথায় তার নাক ডাকার শব্দ শোনা গেলো। আমি হতাশ চোখে তার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কী আর করা? টিভি দেখা যায়। প্রতিটি সিটের পেছনে মনিটর লাগানো। সেখানে সিনেমা দেখা যায়। গেম খেলা যায়। অনেকে হেডফোন লাগিয়ে গানও শুনছে। আমার সে উপায় নেই। কারণ আমার সামনে কোন সিট নেই। আছে দেয়াল। সেই দেয়াল অনেকটা দূরে। সেখানে দেয়ালের গায়ে আমার জন্যও ছোট্ট একটা মনিটর রয়েছে, কিন্তু সেই মনিটর কীভাবে চালাতে হয় আমি জানি না। বা অতদূর উঠে গিয়ে বারবার কী করে সেটি অপারেট করবো, তাও আমি বুঝতে পারছি না। সবার সামনের সিটে বসার সুবিধা হচ্ছে পা প্রসারিত করে আরাম করে বসা যায়। কিন্তু সেই আরামও আমার খুব একটা পছন্দ হলো না। পাঁচ ঘণ্টার এই বিমান যাত্রার পুরোটা সময় আমি কী করবো?
আমার পাশের সারির সামনের সিটের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে একবার বোঝার চেষ্টা করলাম, ঘটনা কী? তারা কী করছে? তাদের সবার হাতেই ছোট্ট এক রিমোট কন্ট্রোল, সেই রিমোট কন্ট্রোলে তারা দূরের দেয়ালের গায়ে সাঁটা মনিটর নিয়ন্ত্রণ করছে। সিনেমা চেঞ্জ করছে। রিওয়াইন্ড করছে। আমার পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। এমনিতেই প্রবল প্রযুক্তি-ভীতি আমার। ফলে রিমোট দিয়ে আর ওই টিভি চালানোর চেষ্টা করা হলো না। আমি বরং চুপচাপ বসে রইলাম। প্লেন ছাড়ছে। কানে তব্দা লেগে যাওয়ার মতো একধরণের শব্দ। সেই শব্দে আমার আচমকা কান্না পেতে লাগলো। এবার আর বাড়ির জন্য না। মায়ের জন্য না। বাবার জন্য না। এয়ারপোর্টের ওই হলুদ আলোটুকুর জন্য। দূরের সেই ছোট ছোট মানুষগুলোর জন্য। নিচে ক্রমশই ধূসর হয়ে যেতে থাকা আলোর উৎস শহরের জন্য, বাড়িগুলোর জন্য। আমার হঠাৎ মনে হতে থাকলো, আমি দূরে কোথাও চলে যাচ্ছি। অনেক দূরে… অনেক… অনেক… সেই দূরে যেতে আমাকে পাড়ি দিতে হবে প্রশান্ত মহাসগরের নীল পানি। সেখান থেকে আবার কবে ফিরে আসবো আমি? ওই হলুদ আলোর কাছে। ওই মানুষের কাছে। ওই মাটি আর হাওয়ার কাছে! কবে ফিরে আসবো?
আমি বুঝতে পারলাম না নিচের আলো ঝলমলে শহরের অবয়বটাও ক্রমশই  কেন এমন ঝাপসা হয়ে যেতে থাকলো? সে কী এই এতোটা দূরে উড়ে উড়ে চলে আসার জন্য, নাকী আমার চোখের কোণে জল জমে জমে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে স্মৃতির শহর?
কতটা সময় গিয়েছে জানি না। পাশের ভদ্রলোক ঘুম ভেঙে উঠে বসলেন। এর মধ্যে বারকয়েক এয়ার হোস্টেস এসে কীসব জিজ্ঞেস করেছে! আমার কাছে সেসব কেবলই পাখির কিচিরমিচির শব্দ মনে হয়েছে। যার কোন অর্থ নয়। এই প্লেনের সকল এয়ার হোস্টেসই হংকং বা চীনের। ফলে তাদের ইংরেজী বোঝা মোটামুটি দুঃসাধ্য ব্যাপার। আশেপাশে সবাই যেহেতু খাচ্ছে, তা থেকে আমিও ধারণা করে নিলাম, তারা নিশ্চয়ই খাবার সংক্রান্ত কিছুই জিজ্ঞেস করছে! কিন্তু কী বলবো আমি? কী জিজ্ঞেস করবো? কী উত্তর দিবো? সে কী আমার কথা বুঝবে? বুঝবে বলে মনে হলো না, তারপরও কয়েকবারের চেষ্টায় অনেক কষ্টে তার সাথে কথা বললাম এবং বোঝাতে সক্ষম হলাম যে আমি জানতে চাইছি, ‘হোয়াট টাইপ্স অফ ফুড ডু ইউ হ্যাভ?’
সে ‘এক্সকিউজ মি’ বলে একটা মেন্যু ধরিয়ে দিলো। জনমভর ‘ভেতো বাঙালি’ হয়ে থাকা আমার সেই মেন্যুর কোন খাবারের নামের সাথে ইহ জন্মে পরিচয় নেই। আমি চুপচাপ বসে রইলাম। ভাবলাম, যেহেতু পাশের ভদ্রলোক ঘুম থেকে উঠেছেন, তিনি নিশ্চয়ই খাবারের অর্ডার করবেন। তখন তার দেখাদেখি ‘ঝোপ বুঝে কোপ মেরে’ আমিও অর্ডার করে ফেলবো!
কিন্তু আমাকে রাজ্যের হতাশা উপহার দিয়ে তিনি অনশন পালন করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। বারবার এয়ার হোস্টেসকে হাতের ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন, নো ফুড, নো ফুড! অদ্যরজনীতে তিনি কোন খাদ্য গ্রহণ করিবেন না! এয়ারহোস্টের আমার দিকে তাকাতে, আমিও তার মতোই নির্বিকার, ভাবলেশহীন ভঙ্গীতে মুখ, চোখ, ভ্রু, ঠোঁট, আঙ্গুল সহযোগে বুঝিয়ে দিলাম, ‘অদ্যরজনীতে আমিও কোন খাদ্য গ্রহণ করিবো না। অধিকন্তু এইসব খাবার জীবনে বহুবার গলধকরণ করিয়াছি। অক্ষণ আর রুচি হয়না। ফালতু! সো, নো ফুড, নো ফুড!’
ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। কিন্তু ‘নো ফুড’ কহিবার পরে আর ‘প্লিজ ফুড’ কহা যায় না। সুতরাং দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইলাম। এই চেপে বসে থাকার অন্য রহস্যও আছে। বাথরুম চেপেছে। কিন্তু প্লেনে কখনো বাথরুম ইউজ করা হয়নি। এমনিতেই চির চেনা কোন শপিং মল বা রেস্টুরেন্টে ঢোকার কাঁচের দরজায় পুল/পুশ লেখা থাকা সত্ত্বেও শতভাগ সময়ে আমি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাই, ‘ঠেলা দেবো? না টান দেবো’?
এই দ্বিধা এই জনমে আর কাটাতে পারলাম না। সেই দ্বিধাগ্রস্ত আমি এই ভীনদেশি প্লেনের বাথরুম ব্যবহার করতে গিয়ে  কী না কী বিপদে পড়ি কে জানে? তারচেয়ে ভালো হংকং অবধি অন্তত অপেক্ষা করি। সেখানে যেহেতু ঘন্টাদুয়েকের যাত্রাবিরতি। সুতরাং দেখা যাক কী হয়!

আবার চোখ বন্ধ করে ঢুলছি। সময় আর কাটে না। প্রতিটি মুহূর্ত যেন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। হঠাৎ পাশের ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, ‘হোয়ার আর ইউ গোইং?’
দেখতে চায়নিজ মনে হলেও বিশুদ্ধ আমেরিকান উচ্চারণ। আমি ঝট করে চোখ খুলে তাকালাম, ‘ইউ…আই মীন… আর ইউ … আস্কিং মি?’
‘ইয়াহ’।
‘সিডনি’।
‘ওহ, অস্ট্রেলিয়া। বিউটিফুল কান্ট্রি, বিউটিফুল পিপল’।
‘ইয়েহ। দে আর, ইনডিড’। এমন ভাবে বললাম যেন প্রতি মাসে একবার করে যাই।
তারপর আবার চুপ। ভদ্রলোকই বললেন, ‘ফার্স্ট টাইম?’
আমি ভাব ঝেরে বললাম, ‘হুম’।
‘রিলেটিভস?’
ঘাড়ের পেছনে হাত দিয়ে কলার খুঁজলাম, খাড়া করবো, কিন্তু পেলাম না। আমার পরনে গোল গলার টিশার্ট। তবে ঘাড় খানিক উঁচু করে বললাম, ‘আই হ্যাভ অ্যান ইনভাইটেশন’।
‘ইনভাইটেশন মিন্স?’
‘মানে… মানে…’। ভাবটা নেয়ার জন্য ঠিক কোন সঠিক ইংরেজীটা বলা যায়, তা-ই ভাবছিলাম। কিন্তু যুতসই কোন শব্দ খুঁজে না পেয়ে বললাম, ‘আই হ্যাভ অ্যান অফিসিয়াল ইনভাইটেশন ফ্রম অস্ট্রেলিয়া’।
‘অফিসিয়াল? আই মীন অস্ট্রেলিয়ান গভমেন্ট?’
এবার কী বলবো? ভাব নিতে গিয়ে ‘ভাব-চক্করে’ পড়ে গেলাম। শ্লেষ্মা জড়ানো কন্ঠে মিনমিন করে বললাম, ‘উহু’।
‘দেন? ইউ হ্যাভ আ জব দেয়ার?’
‘উহু’।
‘ওহ গট ইট। প্রোবাবলি ইওর অফিস সেন্ডিং ইউ দেয়ার ফর এনি পার্টিক্যুলার এসাইনমেন্টস, সেমিনার অর সামথিং লাইক দ্যাট?’
এতোক্ষণে শব্দটা খুঁজে পেলাম, সেমিনার! বললাম, ‘উহু, একচুয়ালি আই এম আ রাইটার এন্ড ফিল্ম মেকার। সো আই গট এন ইনভাইটেশন ফ্রম টু নিউজপেপারস অফ সিডনি’।
‘ইজ ইট? ওয়াও! দ্যাটস রিয়েলি গ্রেট!’ এতক্ষণে বেটার ভাব কমাতে পেরেছি ভেবে মনে মনে, সঙ্গোপনে নিজেই নিজেকে বাহাবা দিলাম। কিন্তু পরের প্রশ্নে আবার নিজের ভাব চলে গেলো আমার। সে বললো ‘সো, ফ্রম হুইচ নিউজ পেপারস? সিডনি মর্নিং হেরাল্ড? অর ট্রিবিউন?’
আমি কোনমতে ঢোক গিলে বললাম, ‘প্রশান্তিকা এন্ড মুক্তমঞ্চ’।
খানিক থমকে যাওয়া গলায় তিনি বললেন, ‘ওহ, আই ডিডিন্ট হার্ড দৌজ নেমস’।
আমি হেসে বললাম, ‘দেজ আর দ্যা বাংলা নিউজপেপারস। ভেরি রিনাউন্ড নিউজ পেপারস এমাং দ্যা বেংগলি কমুনিটি’।
‘ওয়াও! দ্যাটস রিয়েলি গ্রেট!’
আমি আমার পুরনো ভাব আবার ফিরে পেলাম। সিডনিতে বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে তাদের নিজেদের ভাষার পত্রিকা রয়েছে, এবং সেই পত্রিকা আমার মতো বয়সে তরুণ, দেখতে খানিকটা কিশোরসুলভ ছেলেকে অতদূর নিয়ে যাচ্ছে আমার জীবনের গল্প শোনাতে, বিষয়টিতে তিনি খানিক মুগ্ধই হলেন যেন।
আমাদের আড্ডা জমে উঠলো। নানান কথা, ইতিহাস, খেলা, রাজনীতি, অর্থনীতি। আমি বললাম কম, শুনলাম বেশি। ভদ্রলোকের জানাশোনা আমাকে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করলো। মুগ্ধ করেছে তার বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতাও। তার নাম জাস্টিন। হংকং এ জন্ম হলেও বেড়ে ওঠা আমেরিকার লস এঞ্জেলসে। বাংলাদেশ, হংকং, চায়নায় নানান বিজনেসও রয়েছে। জানেনও বিস্তর। কৌতূহলী ধরনের মানুষ। মানুষটাকে আমার ভালো লাগতে শুরু করলো। ক্রমশই স্বাভাবিক হয়ে যেতে লাগলাম। শুরু হলো আমাদের কথোপকথন।
আমরা ততক্ষণে হংকং এর আকাশে ঢুকে গিয়েছি। দিন-রাত্রি এবং সময়ের এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় পড়ে গেছি আমি। চোখ ধাঁধানো ঝকঝকে রোদ বাইরে। তারপর সমুদ্রের বুক চিরে হঠাৎই জেগে উঠলো আকাশ ছুঁই ছুঁই বিল্ডিং। দূরে জলে ভেসে বেড়াচ্ছে পানকৌড়ির মতো দেখতে জাহাজ, কার্গো। আরও দূরে দেখা যাচ্ছে সুউচ্চ অট্টালিকার এক শহর। সমুদ্র পেরিয়ে সেই শহরে নামতে যাচ্ছি আমরা।
তিনি বলে চললেন অনেক কথা, হংকং হলো পৃথিবীর সেই দেশ, যারা এক দেশ দুই নীতির মতো অদ্ভুত এক নিয়মে আবর্তিত। এই দেশটি স্বাধীন নয়, কিন্তু স্বায়ত্বশাসিত। চীনের দুটি প্রাদেশিক রাজধানীর একটি হংকং। অন্যটি ম্যাকাও। হংকং নিরানব্বুই বছরের ইজারা নিয়েছিলো বৃটেন। ১৯৯৭ সালে সেটি আবার চীনের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু প্রায় দুইহাজারেরও বেশি বছর আগে এই দেশটি কিং সাম্রাজ্যের সময় প্রথমবারের মতো চীনের অধীনে আসে।
তবে হংকং দ্বীপটি কী করে বৃটিশ কলোনির অন্তর্ভুক্ত হয় সেই ইতিহাস একই সাথে মজার এবং তিক্ততারও। যার মূলে রয়েছে চীনের বিশ্বখ্যাত চা এবং সেই সুপেয় চায়ের প্রতি বৃটিশদের অনুরাগ। এই চা রপ্তানীর বিনিময়ে বৃটেনের কাছ থেকে সোনা দাবী করে চীন। কিন্তু তাতে রাজী হয়নি ব্রিটেন। ফলে তৈরি হয় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। সেই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় বৃটেনের আরেক কূটকৌশলে। তারা এই চা প্রাপ্তির বিনিময়ে বৃটিশ অধিকৃত ভারতীয় উপমহাদেশের আফিমকে চীনে রপ্তানী করার প্রস্তাব দেয়। প্রথম দিকে সেটি শুরু হলেও পরবর্তিতে আফিম নেশা হিসেবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে চীনে, চীনা সেনাবাহিনিও আসক্ত হয়ে যেতে থাকে এতে। ফলে কঠোর হয় চীনারা। কিন্তু এই নিয়ে বৃটিশ খামখেয়ালি আচরণের ফলে শুরু হয় চীন – বৃটেন আফিম যুদ্ধ। যার বলি হয়ে হংকং কে দখল করে নেয় বৃটেন। যদিও নানান ঘটনা প্রবাহে বৃটেনের ‘ক্রাউন কলোনি’ হয়ে থাকা হংকং কে শেষ অবধি ৯৯ বছরের জন্য বৃটেনের কাছে ইজারা দেয় চীন। ১৯৯৭ সালে সেই ইজারার মেয়াদ শেষ হলে আবার চীনের অধীনে ফিরে যায় হংকং।

তবে কিছু শর্ত রয়েছে, তা হলো চীন হংকংকে নিয়ন্ত্রণ করবে ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ অনুযায়ী, যার ফলে হংকং শহরটি পরবর্তী ৫০ বছর (১৯৯৭ এর পর থেকে) উচ্চ পর্যায়ের স্বায়ত্ত্বশাসন উপভোগ করবে, তবে ‘পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিষয়াবলি ব্যতিরেকে’।

২০৪৭ সালে শেষ হবে এই শর্ত। কিন্তু এর পর কী হবে? হংকং কী স্বায়ত্বশাসন হারিয়ে পুরোপুরি বেইজিং এর নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে? নাকি পুরোপুরি স্বাধীন হবে? এই নিয়ে এখনই শুরু হয়েছে দ্বন্ধ।  জাতিসংঘ বলছে হংকং স্বাধীন দেশ হবে ২০৪৭ সালেই। আমেরিকাও তাই চাইছে। বলা হচ্ছে প্রস্তুতিও নিচ্ছে এই নিয়ে তারা যে হংকং এ মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট করে তুল্পতে চাইছে তারা। যা স্পষ্টতই চীনের জন্য ভয়াবহ উদ্বেগের। সেটি তারা কখনোই হতে দেবে না। কী চাইছে অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো? কী চাইছে বৃটেন? চীন সরাসরিই বলছে হংকং এর স্বাধীনতা অসম্ভব।

এতো ডামডোলের মধ্যে আসলে হংকং এর মানুষ কী চাইছে? এই প্রশ্নে যেন খানিক থমকে গেলেন জাস্টিন। এরমধ্যেই ২০১৪ সালে বেইজিং এর অতিরিক্ত খবরদারির কারণে রাস্তায় নেমে এসেছিলো হংকং এর স্বাধীনতাকামী মানুষ। সেই বিক্ষোভ কঠোর হস্তে দমন করেছে চীন। এই নিয়ে ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে হংকং এর মানুষ। এই শান্ত,স্নিগ্ধ, সুনদ্র শহরটিও কী তবে তার বুকের ভেতর পুষে রেখেছে দুঃখ কিংবা ক্ষোভ কিংবা বিদ্রোহের আগুন? যেকোন সময় তা জ্বলে উঠতে পারে দাউদাউ করে? নাকি ওই সবুজ পাহাড় আর স্নিগ্ধ সমুদ্রের মতোই শান্ত সবকিছু?

আমি আবারও জাস্টিনের চোখের দিকে তাকালাম। প্লেন নিচে নামছে। খানিক বাদেই ছুঁয়ে যাবে হংকং এর মাটি। কী সুন্দর শহর। একপাশে সবুজ পাহাড়। অন্যপাশে সমুদ্র, নদী। ছবির মতো সুন্দর বন্দরনগরী। সেই শহরের দিকে তাকিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘একজন হংকং এর মানুষ হিসেবে আপনি কী চান?’

তিনি কথা বললেন না। তবে তার চোয়াল কী খানিক দৃঢ় হলো? কে জানে? মৃদু হাসলেনও তারপর। তবে আমি তার সেই হাসির কোন অর্থ করতে পারলাম না।  ছবির মতো সুন্দর এই শহরে নামতে নামতে আমার হঠাৎ মনে হতে লাগলো, এই শহর, এই সুন্দর এয়ারপোর্ট, এই পাহাড়, সমুদ্র, এই আকাশ ছোঁয়া ভবনগুলো কোন এক অদ্ভুত যাদুমন্তরে হঠাৎ যদি হয়ে যেতো ঢাকা শহর, হয়ে যেতো বাংলাদেশ! এই এখন, এক্ষুণি।

যদি আমি প্লেন থেকে নেমেই ছুঁয়ে দিতে পারতাম বাংলাদেশের মাটি, বুক ভরে টেনে নিতে পারতাম বাংলাদেশের বাতাস!

চলবে।
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments